সম্পাদকীয়
দারিদ্র্যক্লিষ্ট পরিবারের সন্তানদের লেখাপড়ায় ধরে রাখতে ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে সরকার সম্প্রতি মিড ডে মিল প্রকল্প চালু করেছে। মূলত দরিদ্রদের জন্য হলেও এই প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীকে। শিক্ষা ক্ষেত্রে এটি একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ।
এই চমৎকার উদ্যোগটি যাতে বিতর্কিত না হয়, তার জন্য মন্ত্রী পর্যায় থেকে বারবার খাদ্যের মান বজায় রাখার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। তা সত্ত্বেও প্রকল্প চালুর শুরু থেকেই মানহীন, পচা-বাসি খাবার সরবরাহের অভিযোগ উঠেছে।
২০ মে দৈনিক সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদন এ উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যশোরের কেশবপুরে শিশুদের মিড ডে মিলে পচা ডিম ও ছত্রাকধরা বনরুটি সরবরাহ করেছে সুশীলন নামের একটি এনজিও। কেশবপুরে সুশীলনের সাথে প্রাণ ও আকিজ গ্রুপের মতো শীর্ষ কর্পোরেট হাউজও স্কুলে খাদ্য সরবরাহের ঠিকাদারি নিয়েছে। একই দিন প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যশোরের অভয়নগরে আকিজ গ্রুপের সরবরাহ করা প্যাকেটজাত দুধ ছিল নষ্ট। প্যাকেট খুলে দুধের মধ্যে পোকা দেখা যায়। অভিযোগ পেয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নষ্ট দুধ ফেরত নিয়ে নতুন করে সরবরাহ করলেও এটি তাদের ব্যর্থতা ও নীচু মানসিকতারই প্রকাশ।
যে তিনটি প্রতিষ্ঠান উল্লিখিত খাদ্য সরবরাহের সাথে যুক্ত, তার মধ্যে দুটি হলো দেশের শীর্ষ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান- আকিজ গ্রুপ ও প্রাণ গ্রুপ। বিভিন্ন মাধ্যমে হরেক বিজ্ঞাপন দিয়ে তারা পণ্যের মান নিয়ে বড়াই করে। আর সুশীলন হলো একটি এনজিও; যারা প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক ভাগ্যোন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত থেকে উপকূলীয় এলাকার মানুষকে রক্ষার মতো প্রভৃতি গালভরা বুলি আওড়ায়।
দেশের শীর্ষ কর্পোরেট হাউজ বা প্রতিষ্ঠিত এনজিওর কাছে মানুষ এতো নীচু মানসিকতা আশা করে না। আমরা জানি, বুর্জোয়া কালচারেরও এক ধরনের বিউটি আছে। আমাদের দেশের বুর্জোয়ারা মূলত লুম্পেন প্রকৃতির হওয়ায় তারা সেই কালচারও রপ্ত করতে পারেনি। স্মরণ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশের বড় কর্পোরেট হাউজগুলোর প্রায় সবই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় লুণ্ঠনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। দরিদ্র মানুষের জমি-জিরাত দখল করে আবাসন কোম্পানি প্রতিষ্ঠা, ব্যাংক লুটপাট, পণ্য আমদানি-রপ্তানির নামে কৌশলে বিপুল মুদ্রা বিদেশে পাচার এদের নৈমিত্তিক কাজ।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ হলো এনজিও’র লীলাক্ষেত্র। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এনজিওগুলো এই দেশে। বাংলাদেশ পৃথিবীর কোনো সূচকে শীর্ষে পৌঁছাতে না পারলেও বড় এনজিও গড়ে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার বিরল ‘কৃতিত্ব’ অর্জন করেছে। দেশের আর্থিক দারিদ্র্যকে পুঁজি করে বিদেশ থেকে খয়রাতি সাহায্য আনা ও তার একাংশ লুটপাট করাই হলো এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তবে এই লুটপাট তো সরাসরি করা যায় না! তাই তারা গালভরা বুলি আউড়ায়, রাজনৈতিক নেতৃত্ব যে কত খারাপ, তা সবিস্তার বর্ণনা করে, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে মানুষকে লক্ষ্য করে গালভরা বুলি আওড়ায়।
কার্যত কর্পোরেট বা এনজিও- যেটাই হোক না কেন- তাদের কাছে সামাজিক দায়বদ্ধতার চেয়ে মুনাফা বড় সত্য। শিশুদের খাবার সরবরাহ করতে গিয়ে তা তারা আরেকবার প্রমাণ করলো।
কেশবপুরের ঘটনায় কর্তৃপক্ষ খাদ্যের মান যাচাইয়ের জন্য প্রতিটি ইউনিয়নে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। আগাম বলে দেওয়া যায়, এই কমিটির ক্ষমতা নেই ঠিকাদারি পাওয়া কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ও এনজিওর কেশাগ্র স্পর্শ করার। ফলে কমিটি নিয়ে আমরা ভালো কিছু আশাও করছি না। দৃষ্টি আকর্ষণ করছি দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বের, যাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় একটি ভালো উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়েছে। আপনাদের সদিচ্ছা থাকলে যত ক্ষমতাশালী প্রতিষ্ঠানই হোক না কেন, তাদের চাটিবাটি উঠিয়ে দেওয়া সম্ভব।
সরকারের এ মহতী উদ্যোগ কিছু লোভী ব্যবসায়ীর কারণে ধ্বংস হতে পারে না। সময় থাকতে তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করুন।