সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
কলারোয়া উপজেলার বেত্রাবতীর নদের কোল ঘেঁষে অবস্থিত মনোরম ও শান্ত গ্রাম মুরারিকাটি। বছরের অন্য সময় গ্রামটি নিঝুম থাকলেও বৈশাখ মাসের শেষ মঙ্গলবার এলেই পাল্টে যায় এর রূপ। গ্রামের জেলেপাড়াকে কেন্দ্র করে শুরু হয় এক মহোৎসব। চারদিনব্যাপী এই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মূল আকর্ষণ হয়ে ওঠে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ ‘তাল মেলা’।
এটি কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনো ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এ যেন এক প্রাণের মিলনমেলা। এখানে যারা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন, তারা অধিকাংশই মুসলিম সম্প্রদায়ের। এতে বোঝা যায়—এ মেলা সবার জন্য। এ মেলা অনেকের কাছে জীবিকা আবার অনেকের কাছে বিনোদনের উৎস।
মেলাটি মূলত বৈশাখ মাসের শেষ মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়। স্থানীয়দের মতে, পূর্বপুরুষদের আমল থেকেই এই তিথিতে বিশেষ পূজা ও উৎসব পালিত হয়ে আসছে। জেলেপাড়ার মানুষ তাদের সারা বছরের কষ্ট ভুলে মেতে ওঠেন এই আনন্দে। চারদিনব্যাপী এই উৎসবে কলারোয়া উপজেলাসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে।
মেলার মূল প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে আশপাশে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে এই সময় উৎসবের আমেজ বিরাজ করে। দূর-দূরান্তে থাকা আত্মীয়-স্বজনরা এই মেলা উপলক্ষে বাড়িতে ফিরে আসেন।
গ্রামীণ মেলার কথা উঠবে আর সেখানে মিষ্টি থাকবে না, তা কি হয়? মেলার প্রধান আকর্ষণই হলো বাহারি সব মিষ্টির পসরা। মেলার মূল গলিতে ঢুকলেই ঘ্রাণে জিলিপি আর ছানার মিষ্টির সুবাস। রসগোল্লার আকার দেখে চোখ ছানাবড়া হওয়া ছাড়া উপায় নেই। বালুশাই, গজা, চমচম, সন্দেশ আর কলারোয়ার বিখ্যাত দইয়ের পসরা সাজিয়ে বসেন কয়েক প্রজন্মের অভিজ্ঞ কারিগরেরা। এসবের পাশাপাশি শিশুদের জন্য কদমা, বাতাসা, আর মুড়িমুড়কির স্তূপ যেনো মিষ্টির এক নতুন জগত।
ক্রেতাদের ভিড় সামলাতে দোকানিদের হিমশিম খেতে হয়। অনেক দর্শনার্থী শুধু বাড়ির জন্য মিষ্টি কিনতেই এই মেলায় আসেন।
জ্যৈষ্ঠের আগমণী বার্তায় বৈশাখের তপ্ত দুপুরে স্বস্তি নিয়ে আসে এই মেলা। এখানকার অন্যতম বিশেষত্ব হলো মৌসুমি ফলের সমারোহ। মাঠজুড়ে বসে তালের শাঁসের দোকান। এর পাশাপাশি লাল টকটকে লিচু, হিমসাগর ও গোবিন্দভোগ আম এবং পাকা কলার ঘ্রাণ।
রোদ থেকে বাঁচতে মেলায় আসা মানুষের হাতে হাতে দেখা যায় নকশা করা তালপাতার পাখা। স্থানীয় কারিগরদের নিপুণ হাতে তৈরি এই পাখাগুলো মেলার এক অনন্য উপহার। প্রযুক্তির যুগেও এই মেলায় হস্তশিল্পের কদর কমেনি একটুও।
আধুনিক বিনোদনের যুগেও মুরারিকাটি মেলা তার নিজস্ব লোকজ বৈশিষ্ট্য ধরে রেখেছে। শিশুদের জন্য এখানে রয়েছে— কাঠের তৈরি রাইডার, কাপড়ের তৈরি বিশেষ মঞ্চ—যার উপর তারা নাচতে পারে, লাফাতে পারে। শিশুদের আনন্দ আর চিৎকারে মেলা প্রাঙ্গণ মুখরিত থাকে। রঙিন মাটির ঘোড়া, হাতি আর বাঁশি বিক্রি হয় দেদারসে। মেলায় আসা শিশুদের মূল আকর্ষণ জাদুর খেলা আর বায়োস্কোপ।
রাতে কোনো অনুষ্ঠান হয় না। বিকেলে হয় ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালা। এসব যাত্রাপালায় বীরত্ব, ভক্তি আর সাম্যের কথা ফুটে ওঠে, যা সাধারণ মানুষকে এখনো সমানভাবে আকৃষ্ট করে।
মেলায় আসা দর্শনার্থী শিক্ষক নেতা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, কলেজ শিক্ষার্থী রাবেয়া সুলতানা, আসাদুজ্জামান, আমিনুল হক, মেহেদী হাসান শিমুল, মাধবী মন্ডল, চিত্রা মন্ডল, পলাশ মন্ডলসহ অনেকেই বলছিলেন, আমাদের এই মেলায় কোনো ভেদাভেদ নেই। মুসলমান বন্ধুরা এই দিনে আমাদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ খেতে আসে, আবার আমরাও তাদের উৎসবে যাই। এই মেলার মাঠটি যেন শান্তির এক ছোট রাজ্য।
মেলা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভ কুমার মন্ডল বলেন, প্রতি বছর বৈশাখ মাসের শেষ মঙ্গলবার কালিপূজার মধ্যে দিয়ে এ মেলা শুরু হয়। এরপর এখানে ধর্মীয় যাত্রাপালা, কবিগান, আবৃত্তি, অভিযোগসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। চারদিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানকে ঘিরে বিরাজ করে উৎসবমুখর পরিবেশ। সম্প্রীতির বন্ধনে শত শত বছর ধরে এখন উৎসব পালিত হচ্ছে। মেলার চতুর্থ দিনে শ্রী শ্রী শীতলা পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এদিন দেবীর বিদায় ও বিসর্জন উপলক্ষে সিঁদুর খেলাসহ গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী নানান খেলায় মেতে ওঠেন মা-বোনেরা।
কমিটির সভাপতি নির্মল মন্ডল বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যাতে উৎসবে কোনো বিঘ্ন না ঘটে। প্রতিটি দিনই শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয় মেলায় আসা লাখো মানুষের হৃদয়ে।