শিল্পকর্ম
রেজাউর রহমান
আমি কে? কেন আছি? কোন কারণে আছি? যাহা আছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে তাহা আছে এই দেহভাণ্ডে। অর্থাৎ এই পুরো মহাবিশ্বের সৃষ্টির রহস্য এবং রহস্যের সন্ধান ও স্রষ্টার সন্ধান মানুষের শরীরের ভেতরেই পাওয়া সম্ভব। সৃষ্টির শুরু থেকে মানব প্রজাতি সৃষ্টির রহস্য ভেদ করতে রত তা নানারকম নিরীক্ষা দেখলে অনুধাবন করা যায়।
এই বিশ্ব সৃষ্টি থেকে অনুজীব এবং তার গতিশীলতা এক মহাযজ্ঞ বলা চলে। হোমোসেপিয়েন্স থেকে আজ অবধি আধুনিকতার চরম উৎকর্ষের প্রান্তে এসেও মানব প্রজাতি নিজের অস্তিত্বের চলনকে প্রতিনিয়ত খুঁজে ফেরে। ফিরে পায় নানা প্রশ্ন। আমি কে? নিজের উপস্থিতিকে নানা প্রয়োগের ভেতর দিয়ে খুঁজতে থাকে। আবার মানব ও মানব-বীর খুঁজে ফেরার মধ্যেও নানা আঙ্গিক থাকে। সৃষ্টি এখানে মূলসূত্র। সৃষ্টি তা প্রকৃতির নিয়মে অথবা নিজেকে খুঁজে ফেরে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ব্যবহার করে।
অস্তিত্বের দহন থেকেই সৃষ্টির আলো জন্ম নেয়: জীবনানন্দ দাশ
এমনই নানা প্রশ্নের মুখোমুখি নবীন শিল্পী বুবলি বর্ণা। ‘বিচ্ছিন্ন অস্তিত্বে অবিচ্ছন্ন সত্তা’ শিরোনামে সংস্থাপন শিল্পকর্মগুলো দেখলে তেমনি মনে হয়। শিল্পী নবীন এবং স্বদেশে তার প্রথম প্রদর্শনী, কিন্তু শিল্পকর্মের মধ্যে আত্মঅনুসন্ধানের ধরন কিন্তু নবীনের মতো নয়, তা বেশ প্রাচীন আবহাওয়া তৈরি করে। শিল্পী বর্ণা মানবশরীরের নানা অঙ্গকে কখনো রূপক, কখনো স্পষ্ট, বা সম্পর্কের গভীরতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছেন। শিল্পীর অ্যাকাডেমিক ধারার কাজ দেখলে বোঝা যায় প্রথম থেকেই নিরীক্ষণধর্মিতা তার চিন্তার জগতকে স্বস্তি দেয়। শিল্পীর শিল্প ভাষা প্রয়োগের জন্য শুধুই প্রচলিত রং ক্যানভাসের মধ্যে আটকে রাখেননি, এবং প্রাচ্যে দাঁড়িয়ে পাশ্চাত্যের শিক্ষা গ্রহণ করলেও স্বদেশের প্রচলিত সূচিকর্মের মাধ্যমে নিজের অস্তিত্বকে জানান দিতে ভোলেননি।
যে নিজের অস্তিত্বকে বোঝে, সে আর কাউকে নকল করে না: লালন ফকির
অস্তিত্ব এবং সত্তা অভিন্ন সম্পর্কের হলেও প্রায়োগিকভাবে ভিন্নতার রূপ নেয়। নিজের উপস্থিতিকে স্থাপিত করতে সবাই ছুটছে কিন্তু শিল্পের বোধ কাজে লাগিয়ে শিল্পী বর্ণা গ্যালালি কলাকেন্দ্রের বিভিন্ন কোণকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছেন। মাধ্যম হিসেবে কাপড়, তুলা, সুই, সুতার, ব্যবহারের মধ্য দিয়ে আত্মউপস্থিতির বয়ান রচনা করছেন। শিল্পীর who is going to cook in heaven অথবা the bodz between us শিরোনামের শিল্পকর্মগুলো বেশ আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখী দাঁড় করায়। শিল্পে মাধ্যম সব সময় কিছু বক্তব্য পেশ করে, সাথে বর্ণ ও নিজের অস্তিত্বকে জানান দেয়। শিল্পীর কর্মে লাল বর্ণের আধিক্য কি কোনো সংকেত প্রদান করছে নাকি এক পুরুষশাসিত পৃথিবীকে নারী হয়ে উপস্থিতির প্রতিবাদ? নারী একটি ভিন্ন সত্তা যে কিনা বিচ্ছিন্নভাবে আবিষ্কার করে নতুন আগমনের ভেতর দিয়ে। ফলে কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে বিচ্ছিন্নতা থাকলেও শিল্পকর্মের প্রশস্ত হাত অবিচ্ছন্ন সত্তাকে খুঁজে পায় বলে মনে হয়। স্বর্গের রান্নাঘরে প্রবেশ করলে এক মায়াময়তার মধ্যে হেঁটে বেড়ানো যায়।