যশোর, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

যশোরে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে আগুন

দুই পুলিশ সদস্য বরখাস্ত # নাশকতার অভিযোগে আটক ৪১

স্টাফ রিপোর্টার

, যশোর

প্রকাশ : সোমবার, ২ নভেম্বর,২০২৬, ০৩:৩৩ পিএম
আপডেট : সোমবার, ২ নভেম্বর,২০২৬, ১০:১৭ পিএম
যশোরে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে আগুন

শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে (বকুলতলা, গরিব শাহ মাজার-সংলগ্ন) গভীর রাতে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। গত রোববার (১ নভেম্বর) গভীর রাতে সংঘটিত এ নাশকতার ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে ডিউটিরত দুই পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

এছাড়া ঘটনার পর থেকেই জেলাজুড়ে বিশেষ অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের ৪১ জন নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ।
ঘটনার পর থেকে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন, জুলাইযোদ্ধা এবং নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একটি মোটরসাইকেলে করে আসা তিন যুবক গত রোববার রাত ৪টা ৫১ মিনিট থেকে ৫২ মিনিট—মাত্র এক মিনিটের মধ্যে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের দক্ষিণ পাশে পলিথিন ও দাহ্য পদার্থ দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর তারা বাঁশপট্টি রাস্তা দিয়ে পালিয়ে যায়।

সোমবার সকালে স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে জেলা পুলিশ, ডিবি ও উচ্চপদস্থদের দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে।

সাময়িক বরখাস্ত হওয়া দুই পুলিশ সদস্যরা হলেন এএসআই জাহিদ ইসলাম ও নায়েক মুসা বিশ্বাস।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, যে তিনজন মোটরসাইকেলযোগে স্মৃতিস্তম্ভে গিয়েছিলেন, তাদের দু’জন অগ্নিসংযোগ করেন এবং একজন সেই দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করেন। পরে সেই ভিডিও নিষিদ্ধঘোষিত যুবলীগের কয়েক নেতা তাদের ফেসবুক পেজে প্রচার করেন এবং ‘স্মৃতিস্তম্ভ সম্পূর্ণ পুড়িয়ে দেওয়ার’ দাবি করেন।

তবে, পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, স্মৃতিস্তম্ভটি অক্ষত রয়েছে; কেবল দক্ষিণ পাশে আগুনে কিছু অংশ কালচে দাগ হয়ে গেছে।

যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, জুলাই চত্বরের কাছাকাছি ২৪ ঘণ্টা পুলিশের পাহারা থাকার কথা থাকলেও ঘটনার রাতে দায়িত্বে থাকা দুই পুলিশ সদস্য তাদের কর্তব্য পালনে অবহেলা করেছেন। এই গুরুতর অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় তাদের তাৎক্ষণিকভাবে সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করা হয়েছে।

অপরদিকে, গত রোববার ভোরে শহরের মাইকপট্টি ও লালদীঘিরপাড় এলাকায় ‘শেখের বেটি আইতাছে’ স্লোগান দিয়ে যশোরে নিষিদ্ধ যুবলীগের কয়েকজন মিছিল করেছে। বেশকিছু বোরকা পরা নারীর সঙ্গে যুবলীগের নেতাকর্মীরা এই মিছিলে অংশ নেন। মিছিলের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ভিডিওটিতে দেখা যায়, শহরের লালদীঘি থেকে শুরু করে মিছিলটি মাইকপট্টি প্রদক্ষিণ করছে।

মিছিলের নেতৃত্ব দেন নীলগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ও যুবলীগকর্মী শেখ শহীদ। এ ঘটনায় সোমবার শেখ শহীদসহ সন্দেহভাজন ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিষিদ্ধ সংগঠনের ব্যানারে ঝটিকা মিছিল করার অভিযোগে পুলিশ কঠোর অবস্থান নেয়। দ্রুতই জেলাজুড়ে বিশেষ অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টার বিশেষ অভিযানে নাশকতার অভিযোগে মোট ৪১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে কোতোয়ালি থানায় ১৭ জন, অভয়নগরে চার জন, চৌগাছায় দুইজন, মণিরামপুরে তিনজন, শার্শায় দুইজন, কেশবপুরে তিনজন, বাঘারপাড়ায় চারজন, বেনাপোলে চারজন এবং ঝিকরগাছায় দুইজন রয়েছেন।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নাশকতা ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে সোমবার দুপুরে আদালতে সোপর্দ করা হলে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

প্রতিক্রিয়া

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যশোরের গণঅভ্যুত্থানকালীন প্রধান সমন্বয়ক রাশেদ খান বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের জাতীয় ইতিহাসেরই একটা অংশ। ২০২৪-এর জুলাইতে যেভাবে ছাত্র-জনতা ঐতিহাসিকভাবেই এই ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছে, তা সারাবিশ্বের জন্যই নজির; যার একটা ঢেউ দেখা যাচ্ছে পৃথিবীতে। বাংলাদেশ থেকেই সেই কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা কীভাবে সরাতে হয়, তার অনুপ্রেরণা কিন্তু পাচ্ছে এই জেন-জিরা বিভিন্ন দেশে।’

তিনি বলেন, এ রকম একটা ঐতিহাসিক ঘটনা, এই ঘটনায় যাদের ইতিহাসে রক্তের দাগ লেগে আছে যাদের হাতে, তারা চাইবে এই ইতিহাসকে মুছে ফেলতে।

তিনি বলেন, ‘জুলাই কোনো রাজনৈতিক দলের একক কৃতিত্ব নয়। এটা আমাদের দেশের আপামর জনসাধারণ, ছাত্র, শ্রমিক জনতার ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের ফসল। জুলাইতে আমাদের শত শত সহযোদ্ধা শহীদ হয়েছে। হাজারের উপরে আহত হয়েছে, পুঙ্গত্ববরণ করেছে। তাদের পরিবারের যে ট্রমা, সেটা তো আর ভুলে যাওয়া যাবে না। যারা এই অপকর্মের ধৃষ্টতা যারা দেখাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি।’

জেলা যুব অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মিলন শেখ বলেন, ‘অবশ্যই আগুনের জন্য প্রতিবাদ হবে। চব্বিশ-পরবর্তী এই যে বাংলাদেশ, যেখানে কথা বলার অধিকার আছে; এই বাংলাদেশ গঠনের পেছনে সাক্ষী হলো এই বিজয়স্তম্ভ। সেই বিজয়স্তম্ভে আগুন মানে আমাদের গায়েই আগুন দেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, রোববার যশোরে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের লোকজন মিছিল করেছে, তারা মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে। জুলাই আন্দোলনের অংশীদার যারা এই যশোরের মাটিতে আছে, তারা কখনোই সেই ফ্যাসিস্টকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেবে না।

জুলাইয়ের সম্মুখসারির যোদ্ধা ফাহিম আল ফাত্তাহ বলেন, “জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ চৌদ্দশ’য়ের বেশি শহীদ, বিশ হাজারের বেশি আহত ভাই ও বোন এবং এদেশের আপামর ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ এবং একটা গৌরবের প্রতীক। এই স্মৃতিস্তম্ভে আজ আগুন দেওয়া হয়েছে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত, মাত্র ৫০ গজের ভেতরে পুলিশ বক্স, পাশেই জেলা প্রশাসন এবং সামান্য দূরে পুলিশ সুপারের কার্যালয়। এ রকম একটি স্থানে এই আগুন দেওয়ার ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”

নাশকতাকারীদের কঠোর হাতে দমন: পুলিশ সুপার

যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম জানান, ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে মোটরসাইকেল ও জড়িত দুষ্কৃতকারীদের শনাক্তের কাজ চলছে। যশোর জেলায় কোনো ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে দেওয়া হবে না। নাশকতাকারীদের কঠোর হাতে দমন করা হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

পুলিশ সুপার বলেন, ‘আগুনে জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করেছি, অ্যানালিসিস করছি। মোটরসাইকেল ও সেই দুষ্কৃতকারীদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে অভিযান অব্যাহত রেখেছি।’

তিনি জানান, ২৪ ঘণ্টা সেখানে পুলিশ পাহারা থাকে। রোববার রাতে যে দুইজনের দায়িত্ব ছিল, অবহেলার কারণে তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

‘লালদীঘির পাড়ে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠনের সদস্যরা একটা ঝটিকা মিছিল করে। এরপরেই সারা যশোরে অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ সংগঠনের ৪১ সদস্যকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি। আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ করে বা আইনশৃঙ্খলাকে রসাতলে নেওয়ার অপচেষ্টাকারীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসবো,’ বলেন এসপি।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)