সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতার সাম্প্রতিক বিতর্কিত বিয়ে, জাল-জালিয়াতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে জেলাজুড়ে চরম ক্ষোভ, অসন্তোষ ও সামাজিক আলোচনার ঝড় উঠেছে।
এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অভিযুক্ত এমপির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও সাংবাদিক নেতারা।
নৈতিক স্খলন ও দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ইতিমধ্যে এমপিকে তার নিজ দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
বহিষ্কারের বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহিন ইসলাম বলেন, ‘তৃণমূল পর্যায়ে যারা দল ও রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত, তাদের জন্য এমন ঘটনা যেমন চরম ব্যর্থতার, তেমনি অত্যন্ত কষ্টকর ও হতাশাজনক। আমরা যারা দীর্ঘদিন ধরে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে থেকেছি এবং নানা নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছি, তাদের জন্য এমন কর্মকাণ্ডে কাউকে দল থেকে বহিষ্কৃত হতে দেখা সত্যি দুঃখজনক।’
জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটির এই কঠোর সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি আরো বলেন, দল যে কঠোর ও নীতিগত অবস্থান নিয়েছে, তা প্রশংসনীয়। এই সিদ্ধান্তটি দেশের সব রাজনৈতিক দলের জন্যই একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
তিনি আরও বলেন, জনপ্রতিনিধিদের মূল দায়িত্ব জনগণের সেবা করা। তার বিনিময়ে কোনো অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা বা স্বার্থ আশা করা কখনোই কাম্য হতে পারে না। এই দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থার ফলে ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক নেতা বা জনপ্রতিনিধি এমন অনৈতিক অপকর্ম করতে গেলে দশ বার ভাবতে বাধ্য হবেন।
ঘটনাটিকে পুরো জেলাবাসীর জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক উল্লেখ করে সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আবু জাহিদ ডাবলু বলেন, ‘ঘটনাটি শোনার পর আমাদের কোনো ভাষা নেই। একজন বৃদ্ধ মানুষ হয়ে একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক বা সদ্য প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে যা করেছেন, তা পুরো সাতক্ষীরাবাসীর মান-সম্মান নষ্ট করে দিয়েছে। সাতক্ষীরার মানুষ আলেম-ওলামা ও ধর্মীয় নেতাদের প্রতি গভীর আস্থা রাখতো। কিন্তু তাদের কাছ থেকেই এমন নৈতিক স্খলনমূলক আচরণ দেখা অত্যন্ত বিস্ময়কর ও কষ্টের।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি অপরাধ ঢাকতে গিয়ে কাবিননামা, বয়স ও স্বাক্ষর জালিয়াতির মাধ্যমে একের পর এক অপরাধ করা হয়েছে, যা আজ দেশ-বিদেশের সবার কাছে পরিস্কার। এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডে সাতক্ষীরার সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে আমাদের মা-বোনেরা আজ চরম লজ্জায় পড়েছেন।’
এদিকে, শ্যামনগরের সুন্দরবন প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ বলেন, তিনি এই এলাকার তিনবারের সাবেক এমপি। তার এমন ঘটনার সাথে যুক্ত থাকার বিষয়টি সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে। প্রাথমিকভাবে ভিডিওটি এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) দিয়ে তৈরি মনে হলেও পরবর্তীতে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ঘটনাটি সত্য।
তিনি আরও বলেন, হয়তো কোনো হানি ট্র্যাপ বা প্রতারণার শিকার হয়ে পরবর্তীতে নিজের সামাজিক ভাবমূর্তি ও সুনাম বাঁচাতে তিনি কম বয়সী মেয়েটিকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছেন। না হলে এমন বয়সে মেয়েটিকে তার বিয়ে করার কথা নয়।
ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সাতক্ষীরা শহর ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি আল মামুন তার ফেসবুক আইডিতে লিখেছেন, ‘কতো ত্যাগ, কোরবানি, কষ্ট, পেরেশানি! আহা, প্রিয় কাফেলায় কালি লাগিয়ে দিলেন।’
তার এ বক্তব্যকে উদ্দেশ করে সাতক্ষীরা পৌর ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক মোহাম্মদ ইমাদুল কমেন্টে লিখেছেন, ‘সত্যতা তুলে ধরার জন্য ধন্যবাদ ভাইয়া। এ সমস্ত ব্যক্তির সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত।’
স্থানীয় মানবাধিকার কর্মী মাধবচন্দ্র দত্ত বলেন, একজন সংসদ সদস্য রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সম্মানীত ব্যক্তি। তার মতো একজন দায়িত্বশীল মানুষের বিরুদ্ধে যখন অনৈতিক সম্পর্কের ইঙ্গিত বা অভিযোগ ওঠে, তখন তা সুস্পষ্টভাবে নৈতিকতার চরম স্খলনকে নির্দেশ করে।
আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপের ওপর জোর দিয়ে তিনি আরও বলেন, এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী কী কী বিধি রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা উচিত। দেশের প্রচলিত আইন এবং বিধিমোতাবেক তার সংশ্লিষ্ট দল, সরকার এবং সংসদীয় কমিটির প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
ঘটনার আইনি তদন্ত ও বিচারের দাবি জানিয়ে সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আজাদ হোসেন বেলাল বলেন, যারা নীতি-নৈতিকতা ও ধর্মের কথা বলে, তাদের কাছ থেকে এমন অসামাজিক কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একজন সংসদ সদস্যের এমন অপকর্মের কারণে পুরো সাতক্ষীরা জেলার মুখ পুড়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান অ্যাড. আজাদ।
অন্যদিকে, এ ঘটনার বিষয়ে সাংগঠনিক অবস্থান ও বক্তব্য জানতে শ্যামনগর উপজেলা জামায়াতের আমির আব্দুর রহমান এবং জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও মিডিয়া বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা মাওলানা আজিজুর রহমানের ব্যবহৃত ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা রিসিভ করেননি।