যশোর, বাংলাদেশ || বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

নারী কেলেঙ্কারিতে জামায়াত এমপি

বিশেষ প্রতিনিধি

, যশোর

প্রকাশ : বুধবার, ২২ জুলাই,২০২৬, ১২:০১ এ এম
নারী কেলেঙ্কারিতে জামায়াত এমপি

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে কথিত দ্বিতীয় বিয়ে, ভাইরাল হওয়া ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও, কাবিননামা, বায়োডাটা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরস্পরবিরোধী বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তীব্র আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

ঘটনার বিভিন্ন পর্যায়ে এমপি, তার প্রথম স্ত্রী, দ্বিতীয় স্ত্রী পরিচয় দেওয়া নারী, ওই নারীর বাবা, জেলা জামায়াত এবং ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্যে পরস্পরবিরোধী তথ্য সামনে এসেছে। একই সঙ্গে নির্বাচনি হলফনামা ও বিভিন্ন নথির তথ্য নিয়েও নতুন প্রশ্ন উঠেছে।

গত ১৩ জুলাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজী নজরুল ইসলামের এক তরুণীর সঙ্গে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। পরে আরও কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজও ভাইরাল হয়। ভিডিও প্রকাশের পর সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের মিডিয়া সেল পরিচালিত একটি প্ল্যাটফর্ম প্রথমে দাবি করে, ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি এবং বিকৃত। তবে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল লেন্স অনুসন্ধান শেষে জানায়, ভিডিওটি এডিটেড বা এআই-নির্মিত নয়; এটি বাস্তব ফুটেজ। তাদের দাবি, প্রচারিত সিসিটিভি ফুটেজে ২০২৩ সালের ১ জুলাইয়ের তারিখ দেখা গেলেও সেটি কোথায় ধারণ করা হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

অন্যদিকে ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা দ্য ডিসেন্ট জানায়, ১৩ জুলাই থেকেই এমপিকে ঘিরে বিতর্কিত ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ভিডিও প্রকাশের পর এমপি গাজী নজরুল ইসলাম নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক বিবৃতিতে দাবি করেন, ভিডিওতে থাকা নারী তার আইনসম্মত দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়ম বেগম। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৭ জুন পারিবারিকভাবে এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ১৩ জুলাই ঢাকার মগবাজারে দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবার ব্যবসায়িক কার্যালয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে অবস্থানকালে তার গাড়িচালক এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা ওবায়দুল্লাহ ৫ থেকে ৭ জন অপরিচিত ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করেন। তারা তাকে জিম্মি করে এক লাখ টাকা আদায় করেন এবং পরে আরও কয়েক লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

এমপির দাবি, এটি পারিবারিক বিরোধ ও রাজনৈতিকভাবে তাকে হেয় করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।

দ্বিতীয় স্ত্রী পরিচয় দেওয়া মরিয়ম বেগমও এক ভিডিও বার্তায় বলেন, তাদের বিয়ে কোনো গোপন বা অনৈতিক বিষয় নয়। তার দাবি, ২০২৬ সালের ১৭ জুন শ্যামনগরে বাবার বাড়িতে উভয় পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে সম্পন্ন হয় এবং সেখানে এমপির প্রথম স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। তিনি আরও বলেন, ১৩ জুলাই মগবাজারে তাদের পারিবারিক সফরকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিতভাবে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহও একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে দাবি করেন, তার মেয়ের সঙ্গে এমপির বিয়ে হয়েছে এবং ভাইরাল ভিডিওটি তাদের সামাজিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে গোপনে ধারণ করা হয়েছে। তিনি এ ঘটনার জন্য এমপির সাবেক সহকারী ও নিজের শ্যালক ওবায়দুল্লাহকে দায়ী করেন।

এদিকে এমপির প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ সম্ভব না হলেও জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো ২৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিও বার্তায় এক নারী নিজেকে প্রথম স্ত্রী পরিচয় দিয়ে বলেন, তার স্বামীর সঙ্গে মরিয়মের বিয়ে হয়েছে এবং এ নিয়ে কুৎসা রটানো হচ্ছে। তিনি অসত্য প্রচার বন্ধ না হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন।

তবে ঘটনার পর নতুন বিতর্কের জন্ম দেয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মরিয়ম খাতুনের একটি বায়োডাটা। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, তার জন্ম ২০০৮ সালের ২২ মে এবং তিনি ২০২৬ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। একই বায়োডাটায় বৈবাহিক অবস্থার ঘরে তাকে ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ওই বায়োডাটায় ২২ জুন ২০২৬ তারিখে এমপি গাজী নজরুল ইসলামের সুপারিশ ও স্বাক্ষরও রয়েছে।

অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি কাবিননামায় কনের জন্মতারিখ ২৭ মে ১৯৯৮ এবং বিয়ের তারিখ ১৭ জুন ২০২৪ উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তিন লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করার তথ্যও রয়েছে। অথচ এমপি, কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী ও তার বাবা-তিনজনই বিয়ের তারিখ হিসেবে ১৭ জুন ২০২৬ উল্লেখ করেছেন। ফলে কাবিননামা, বায়োডাটা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে।

এছাড়া ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে বলতে শোনা যায়, মেয়েটিকে তিনি প্রথমবার সেখানে এনেছেন এবং আগে চিনতেন না; তাকে সেখানে নিয়ে এসেছেন তার গাড়িচালক। পরবর্তীতে তিনি ওই নারীকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন, যা নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে দাখিল করা গাজী নজরুল ইসলামের হলফনামায় দ্বিতীয় স্ত্রীর বিষয়ে কোনো তথ্য উল্লেখ নেই। বিষয়টি আইনগত ও রাজনৈতিক বিতর্কের নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, এমপি তাদের জানিয়েছেন, ভিডিওতে থাকা নারী তার দ্বিতীয় স্ত্রী এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিক্রমেই বিয়ে হয়েছে। তবে ২০২৩ সালের তারিখসংবলিত সিসিটিভি ফুটেজ এবং ২০২৬ সালের বিয়ের দাবির মধ্যে যে অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে, তা টেকনিক্যাল বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

জেলা জামায়াতের সূত্র জানিয়েছে, কাবিননামা ও পারিবারিকভাবে বিয়ের দাবির বিষয়টি তারা অবগত হয়েছেন। পুরো ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে এমপির নিজ গ্রাম ইসমাইলপুরের একাধিক প্রতিবেশী জানিয়েছেন, তারা কখনও তার দ্বিতীয় বিয়ের কথা শোনেননি। স্থানীয় বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বাড়ির পাশেই এমপি সাহেবের বাড়ি। দ্বিতীয় বিয়ের কথা আগে কখনও শুনিনি, ফেসবুকেই প্রথম জানলাম’।

আরেক প্রতিবেশী আব্দুল আলিম বলেন, ‘আমরা এতদিন জানতাম উনার একটিই বিয়ে হয়েছিল।’

পুরো ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে। একদিকে ভিডিওটি এআই নয় বলে ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠানের দাবি, অন্যদিকে বিয়ে, কাবিননামা, বায়োডাটা, সিসিটিভির তারিখ, নির্বাচনি হলফনামা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরস্পরবিরোধী বক্তব্য-সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন বহুমাত্রিক বিতর্কে রূপ নিয়েছে। এসব অসঙ্গতির প্রকৃত ব্যাখ্যা এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের দিকেই এখন নজর সবার।

তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সাংগঠনিক পদক্ষেপ: জামায়াত

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত অভিযোগের বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পর সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। মঙ্গলবার দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে এ কথা জানান।

বিবৃতিতে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘অতি সম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে জড়িয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের দিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নজর রাখছে। ইতোমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে গাজী নজরুল ইসলামের নিজের বিবৃতি, তার প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবার ভিডিও বক্তব্য মিডিয়াতে প্রকাশিত হয়েছে।’

বিষয়টি নিয়ে আরও খোঁজখবর নেওয়া হবে উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, প্রকৃত ঘটনার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পর দলের সাংগঠনিক বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)