যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

ভ্রমণের নেশাই কাল হলো তুহিনের

রায়হান সিদ্দিক ও আনোয়ার হোসেন

, যশোর ও মণিরামপুর

প্রকাশ : সোমবার, ১৯ অক্টোবর,২০২৬, ১২:০০ পিএম
ভ্রমণের নেশাই কাল হলো তুহিনের

‘সুখের জন্য পৃথিবীর নিয়মে নিজেকে বাঁধতে চাই না’—উক্তিটি নাহিদুর রহমান তুহিনের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের প্রোফাইলে এই বার্তা দিয়েছিলেন তিনি। তবে নিয়তি তাকে ঠিকই বেঁধে ফেলেছে। অগ্নিকাণ্ডে অঙ্গার হয়েছে দেহ। অবস্থা এমন যে, মৃত্যুর প্রায় ৩৬ ঘণ্টা পার হলেও শনাক্ত করা যায়নি মরদেহ। দুই কন্যাসন্তান রুজাইনা ইনায়া (৮) ও সুনাইনা ইহানা (৩) এবং স্ত্রী আফসানা মতিন তানজিকে নিয়ে অবসর যাপনে কক্সবাজারে গিয়েছিলেন তিনি। গত ১১ অক্টোবর ইনানী সৈকতের ‘টুপটুপ রিসোর্ট’-এ দুই দিনের জন্য রুম ভাড়া নেন। কথা ছিল ১৯ অক্টোবর ঢাকায় নিজ কর্মস্থলে ফিরবেন।

কক্সবাজারে থাকাকালে নাহিদুরের সাথে শেষ কথা হয় বাবা মতিয়ার রহমানের। শুক্রবার রাত সাড়ে আটটার দিকে বাবা মতিয়ার রহমানকে কল দিয়ে নাহিদুর বলেছিলেন, ‘সি বিচে আছি, বাচ্চারা খেলা করছে। মঙ্গলবার ঢাকায় ফিরবো, তুমি বুধবার চলে এসো।’

এরপর শুরু হয় দুঃস্বপ্নের মতো শনিবারের সকাল। কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী সমুদ্রসৈকত-সংলগ্ন ‘টুপটুপ রিসোর্টে’ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন নাহিদের পরিবারের সদস্যরা। খোঁজখবরের শতচেষ্টা ব্যর্থ হয় রাত আটটায়।

নাহিদের বড় ভাই জাহিদুর রহমান বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের কথা শোনার পর থেকেই যোগাযোগের চেষ্টা করি। কিন্তু কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারিনি। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধব সবার সাথে কথা বলি। কিন্তু যখন জানতে পারি দশজন মারা গেছে, যার মধ্যে ছয়জনকে শনাক্ত করা গেছে এবং চারজনকে শনাক্ত করা যাচ্ছে না—তখন থেকেই অস্থির হয়ে পড়ি।’

বর্তমানে মরদেহ শনাক্ত করার জন্য কক্সবাজারে রয়েছেন তিনি।

সেখান থেকে সুবর্ণভূমিকে জাহিদুর রহমান জানিয়েছেন, মরদেহ দেখে শনাক্ত করার কোনো সুযোগ নেই। এখন একমাত্র ভরসা ডিএনএ পরীক্ষা। সেটিও সময়সাপেক্ষ। আজ ঢাকায় পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা নেওয়া হবে। সবকিছু শেষ হতে অন্তত এক মাস লাগবে। এর আগে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে না।

কক্সবাজারে অবস্থানরত তুহিনের চাচা খালিদুর রহমান সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘আমরা অনেক চেষ্টা করেছি, এখন আমরা ক্লান্ত। আমাদের নাহিদের পরিবার নেই, এইটা আমরা নিশ্চিত; কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হলে মরদেহ নিয়ে ফিরতে পারবো না। এখন অপেক্ষা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই।’

আজ সকালে নাহিদুর রহমান তুহিনের বাবা এবং আফসানা মতিন তানজির স্বজনরা ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা দেবেন বলেও জানান তিনি।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৫ বছর ধরে ঢাকায় বসবাস করছিলেন নাহিদ। তিনি রাজধানীর শ্যামলীতে ‘গ্র্যান্ড পাওয়ার কোম্পানি’ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং পরিবার নিয়ে মিরপুরে থাকতেন। গ্রামের বাড়ি যশোরের মণিরামপুরের মোহনপুর গ্রামে আসতেন অবসরে।

রোববার নাহিদের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকে আত্মীয়স্বজনসহ স্থানীয়রা ভিড় করেছেন সেখানে। কথা হয় নাহিদের বাবা মতিয়ার রহমানের সাথে।

তিনি বলেন, ‘আমি দেড় মাস আগে গ্রামে এসেছি। বুধবার আবার ঢাকায় ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। ছোট ছেলে নাহিদের কাছেই আমি থাকি। শুক্রবার রাতেও কথা হলো; সবাইকে নিয়ে সৈকতে আনন্দ করছিল। ওর সাথে আর কোনোদিন কথা হবে না আমার।’

স্বজনরা জানিয়েছেন, নাহিদ পরিবার নিয়ে প্রায়ই ঘুরতে যেতেন। অবসর পেলেই তিনি পরিবারকে সময় দিতেন।

নাহিদের বন্ধু আফজাল হোসেন বলেন, ‘সে (নাহিদুর) মানুষের বিপদ শুনলে সবার আগে ছুটে যেত। সবসময় হাসিখুশি থাকতে পছন্দ করতো। ভ্রমণ ছিল ওর নেশার মতো। সেই নেশাই যে ওকে গ্রাস করে ফেলবে, আমরা ভাবতে পারছি না। একসাথে গোটা পরিবারটাই শেষ হয়ে গেল।’

সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডে নিহত দশজনের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় নিশ্চিত করা গেছে। তবে বাকি চারজনের শরীর সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাদের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ টেস্ট করা হবে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।

এদিকে, একটি পরিবার এক নিমেষে হারিয়ে যাওয়ায় মণিরামপুরের মোহনপুর গ্রামজুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। স্বজন ও প্রতিবেশীদের চোখের পানিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। সকাল থেকেই স্থানীয়রা ভিড় করেছেন নাহিদের গ্রামের বাড়িতে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)