কক্সবাজার থেকে ফেরার পথে দুর্ঘটনায় নিহত দুই বন্ধু
ঝিনাইদহ প্রতিনিধি
দুই বন্ধু একসঙ্গে আনন্দ ভ্রমণে কক্সবাজার গিয়েছিলেন। পরিবার ভেবেছিল ঘুরে এসে হয়তো নতুন গল্প শোনাবে তারা। কিন্তু সেই সফরই হয়ে উঠলো জীবনের শেষ যাত্রা। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়ে লাশ হয়ে ফিরলো ঝিনাইদহের দুই বন্ধু বিজিবি সদস্য নাইমুর ইসলাম জিহাদ (২১) ও নাঈম মিয়া (২১)।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতির ফোর সিজন রেস্টুরেন্ট এলাকায় গত শনিবার (৯ মে) মারছা পরিবহনের দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হন চারজন। তাদের মধ্যে দুজন ছিলেন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বাসিন্দা। নিহত নাইমুর ইসলাম জিহাদ বাজারগোপালপুর গ্রামের কৃষক চাঁন আলীর ছেলে এবং নাঈম মিয়া পোতাহাটি গ্রামের আনোয়ার খন্দকারের ছেলে।
নিহত বিজিবি সদস্য নাইমুর ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বছর দুয়েক আগে অনেক কষ্ট করে দুইকক্ষের একটি পাকা ঘর তুলেছেন তার বাবা কৃষক চাঁন আলী। ঘর এখনও প্লাস্টার করার সামর্থ্য হয়নি। বারান্দার এক কোণে চৌকির ওপর নিথর হয়ে শুয়ে আছেন মা আমেনা খাতুন। ছেলের শোকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। শরীরে চলছে স্যালাইন। পাশে বসে বাকরুদ্ধ বাবা চাঁন আলী ছেলের ছবি হাতে স্মৃতি আঁকড়ে ধরে আছেন। প্রতিবেশীরা এসে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও কোনোভাবেই থামছে না পরিবারের আহাজারি।
কাঁদতে কাঁদতে আমেনা খাতুন বলেন, আমার ছেলে কত আনন্দ করে বন্ধুর সঙ্গে ঘুরতে গেল, আর ফিরলো লাশ হয়ে। বড় ছেলে বিদেশে থাকে। ছোট ছেলেকে চাকরিতে পাঠিয়ে কত দুশ্চিন্তা করতাম, আবার গর্বও হতো। এখন আমার তরতাজা ছেলেকে কবরে রেখে আমি কীভাবে বাঁচবো।
বাবা চাঁন আলী বলেন, অনেক কষ্ট করে বড় ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছি। ছোট ছেলে লেখাপড়ায় ভালো ছিল। ঝিনাইদহ সরকারি কেসি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে নিজেই চেষ্টা করে বিজিবিতে চাকরি পেয়েছিল এক বছর হলো। চাকরি পাওয়ার পর মাত্র দুইবার ছুটিতে বাড়ি এসেছে। দ্বিতীয়বার এসে বন্ধুর সঙ্গে কক্সবাজার ঘুরতে গেল, কিন্তু আর ফিরে এলো না।
তিনি বলেন, ওই এলাকার বিজিবি সদস্যরা আমাকে ফোন দিয়ে আমার ছেলের মৃত্যুর সংবাদটি জানান। তারাই ছেলের লাশটি আমাদের গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসে এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে দাফন করেন।
২০২৪ সালে এইচএসসি পাস করার পর বিজিবিতে সিপাহি পদে যোগ দেন নাইমুর ইসলাম। পরিবারের স্বপ্ন ছিল, ছোট ছেলেটি সংসারের হাল ধরবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন কবরের মাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে।
একই রকম শোকের আবহ পোতাহাটি গ্রামের নাঈম মিয়ার বাড়িতেও। পরিবারের একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে দিশেহারা মা গোলাপি খাতুন। বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন তিনি। ছোট্ট একটি চায়ের দোকান চালিয়ে সংসার চালাতেন বাবা আনোয়ার খন্দকার। একমাত্র ছেলেকে ঘিরেই ছিল তাদের সব আশা।
নিহত নাঈমের চাচা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি লাশ আনতে গিয়েছিলাম। রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে দাফন করা হয়েছে। ভাই-ভাবিকে কিছুতেই শান্ত করতে পারছি না। একমাত্র ছেলেকে হারানোর কষ্ট তারা মানতে পারছেন না।’
তিনি আরও বলেন, ঘাতক বাসের অজ্ঞাত চালক ও হেলপারের বিরুদ্ধে লোহাগাড়া থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
লোহাগাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ মোবাইলে জানান, নিহত নাঈমের চাচা বাদী হয়ে থানায় মামলা করেছেন। মামলাটি বর্তমানে হাইওয়ে পুলিশ তদন্ত করছে।