যশোর, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

বিজ্ঞান

বায়ুদূষণ কমাবে ‘তরল গাছ’

জিয়াউদ্দিন সাইমুম

, ঢাকা

প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১২ মে,২০২৬, ০২:০০ পিএম
বায়ুদূষণ কমাবে ‘তরল গাছ’

শহরাঞ্চলে গাছের জন্য জমির অভাব। অথচ প্রচুর গাছ লাগানোই বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে সহজ সমাধান। এই সমস্যার মোকাবেলা করতে সার্বিয়ার বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক অভিনব এক উদ্ভাবনের কথা ভেবেছেন। প্রযুক্তিটির সাহিত্যিক নাম ‘তরল গাছ’। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমহলে এটা ‘লিকুইড ৩’ নামে পরিচিত।

এই তরল গাছ আসলে একটি ফটো-বায়োরিয়্যাক্টর, অর্থাৎ একটি বড় স্বচ্ছ ইলেকট্রিক ট্যাঙ্ক, যার মধ্যে ৬০০ লিটার জলে রয়েছে ভাসমান মাইক্রোঅ্যালগি। এই মিশ্রণ যদি নির্দিষ্ট পরিমাণে নগর-অঞ্চলে রাখা যায়, তবে তা কার্বনজনিত দূষণ অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে। এই ‘তরল গাছ’ বা এই ধরনের অ্যালগিসহ জলপূর্ণ পাত্র রাখা যায় যেকোনো জায়গাতেই। গাছের অন্যান্য ভূমিকা পালন করতে না পারলেও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের কাজটা এই ‘তরল গাছ’ ভালোভাবেই করতে পারবে বলে গবেষকরা মনে করছেন। বেলগ্রেডে কারখানা-অধ্যুষিত অঞ্চলে এই ট্যাঙ্ক স্থাপন করা হয়েছে। বেলগ্রেডে বায়ুর গুণগত মান ভয়াবহ খারাপ। সেখানে এই ‘তরল গাছ’ কতটা কাজে আসে তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন গবেষকরা। তার পরেই বৃহত্তরভাবে ব্যবহার শুরু করার কথা ভাবা সম্ভব হবে।

‘তরল গাছ’ অণুজীবের সাহায্যে কার্বন ডাই অক্সাইডকে আবদ্ধ করে এবং সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে তাজা অক্সিজেন তৈরি করে। এটি মূলত আসল গাছের মতো কাজ করে। মাইক্রোঅ্যালগি সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিবেশ থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং বিশুদ্ধ অক্সিজেন ছাড়ে। ট্যাংকটির ভেতরে আলো ধারণ করার বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে, যা আলোকে বিদ্যুতে রূপান্তরিত করে। ফলে গোটা ট্যাংকটি সবুজ দেখায় এবং মাইক্রোঅ্যালগি বছর ধরে চলতে থাকা সালোকসংশ্লেষণে সাহায্য করে।

একটি পাম্পের সাহায্যে বাইরের দূষিত বায়ু ট্যাংকের ভেতরে আনা হয়, যাতে মাইক্রোঅ্যালগি সেই কার্বন ডাই-অক্সাইডকে তাদের খাদ্য তৈরির জন্য ব্যবহার করতে পারে। এই যন্ত্রটির একটি বড় সুবিধা হলো এটি যেকোনো জায়গায় স্থাপন করা যায় এবং সেটি স্থাপনের পরই কাজ করতে শুরু করে।

সার্বিয়ার বিজ্ঞানী ইভান স্প্যাসেজেভিক এই প্রযুক্তিটি উদ্ভাবন করেছেন। তার দাবি, এই যন্ত্রটি দুটি দশ বছরের পুরনো গাছ বা ২০০ বর্গমিটার জমির ঘাসের সমান কার্ব ডাই-অক্সাইড শোষণ করতে পারে।

গাছ কেটে ফেলার ফলে যে বায়ুদূষণ বাড়ছে, তা নিরসনের একটি কার্যকরী উপায় হিসেবে তরল গাছকে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে তরল গাছ প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্য একটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উšে§াচন করেছে। যদি এটি সফলভাবে প্রয়োগ করা যায়, তবে ভবিষ্যতে বায়ুদূষণ কমানোর একটি কার্যকরী উপায় হতে পারে। তবে এর দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা এবং প্রভাব নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।

ডিভাইসটিতে একটি অন্তর্নির্মিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে; যা ট্যাঙ্কগুলোয় ইনস্টল করা সোলার প্যানেল দ্বারা চালিত হয়। এর ফলে বায়োরিয়্যাক্টরের অভ্যন্তরে একটি সবুজ আভা দেখা দেয়; যার ফলে অণু শৈবাল সারা বছর অবিরাম সালোকসংশ্লেষণ ক্রিয়া চালাতে পারে। কার্বন-ডাই অক্সাইড একটি পাম্পের মাধ্যমে মাইক্রোঅ্যালগিকে সরবরাহ করা হয়; যা দূষিত বায়ুকে ধরে রাখে। এখানে এককোষী মিঠাপানির শৈবাল ব্যবহার করা হয়, যা উচ্চ ও নিম্ন তাপমাত্রার প্রতিরোধী।

গাছের তুলনায় মাইক্রোঅ্যালগির সুবিধা হলো, এরা গাছের তুলনায় প্রায় ১০-৫০ গুণ বেশি দক্ষ। এই গাছ শীতকালেও কার্যকর থাকে। এই তরল গাছ শুধু বায়ুদূষণ প্রতিরোধে নয়, রাতে সৌন্দর্যবর্ধক হিসেবেও কাজ করবে। এখানে মোবাইল ফোনের চার্জার রাখারও ব্যবস্থা থাকে। ড. ইভান স্পাসোজেভিকের এই আবিষ্কার ইতোমধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বায়ু পরিশোধনে এটি বেশ কাজে লাগবে।

মানুষের পরম বন্ধু গাছ। বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় বেশির ভাগ উপাদান আমরা গাছ ও বিভিন্ন উদ্ভিদ থেকে সংগ্রহ করি। কিন্তু নগরায়নের ফলে শহরে গাছের দেখা মেলা ভার। ফলে শহরের বায়ুতে দূষিত কণার ঘনত্ব দিন দিন বাড়ছে। বায়ুদূষণের কারণে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে নানা রোগে। বায়ুদূষণ থেকে বাঁচতে ও সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলোর সমাধানেই সার্বিয়ান বিজ্ঞানীদের এই উদ্ভাবন।

বাতাসে ভেসে বেড়ানো কঠিন ও তরল পদার্থের মিশ্রণে গঠিত হয় এক ধরনের কণা, যা পিএম নামে পরিচিত। এসব কণা চুলের চেয়েও প্রায় ২০-৩০ গুণ সূক্ষ্ম। এসব ছোট কণার মধ্যে থাকে অনেক ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক। শ্বাসের সঙ্গে এসব কণা দেহে প্রবেশ করে।

তবে এটা মনে রাখা দরকার, তরল গাছ মোটেও প্রাকৃতিক গাছের বিকল্প নয়। কারণ, গাছ শুধু অক্সিজেন দেয় না। গাছকে ঘিরে সৃষ্টি হয় প্রকৃতির বাস্তুসংস্থান। সেটা এই তরল গাছ দিয়ে সম্ভব নয়। তবে ব্যস্ত শহরের যেসব জায়গায় গাছ লাগানো একদম সম্ভব নয়, সেখানে গাছের বিকল্প হিসেবে বসানো যেতে পারে এই লিকুইড৩। এভাবে হয়তো ভবিষ্যতে অনেকটাই দূষণমুক্ত হয়ে উঠবে শহরাঞ্চল।

ইন্টারগভার্মেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে অন্তত ৬০ শতাংশ কমাতে হবে গ্রিন হাউস গ্যাস উৎপাদন। সেই লক্ষ্যে কাজ করতে গেলে একদিকে যেমন জীবাশ্ম জ্বালানির উপর ভরসা কমিয়ে আনতে হবে, তেমনই কাজে লাগবে এমন ধরনের তরল গাছ। বনসৃজনকে গুরুত্ব দিতেই হবে।

মনে রাখতে হবে, এটি একটি বিকল্প ব্যবস্থা। যে অঞ্চলে, বিশেষত ব্যস্ত শহরে গাছ লাগানো সম্ভব নয়, অথচ দূষণের মাত্রা বেশি, সেখানে এই বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। পরিবেশ দূষণজনিত সমস্যা মোকাবেলায় স্মার্ট উদ্ভাবনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। সার্বিয়ার বিজ্ঞানীদের এই বিকল্প ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই সমাধান হিসাবে যথেষ্ট স্বীকৃতি পেয়েছে, কুড়িয়েছে প্রশংসাও।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)