স্টাফ রিপোর্টার, যশোর
যশোরসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আগামী পাঁচদিন বৃষ্টি ও বজ্রসহ বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হওয়া এবং গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত লঘুচাপের বর্ধিতাংশের প্রভাবে বৃষ্টিপাতের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার দুপুরে যশোরে আষাঢ়ের কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি নেমে আসে। টানা কয়েকদিনের ভ্যাপসা গরম, গুমোট আবহাওয়া ও অস্বস্তিকর পরিবেশে অতিষ্ঠ মানুষের জন্য এই বৃষ্টি যেন স্বস্তির বার্তা হয়ে আসে।
দুপুর দুইটার দিকে ঘন কালো মেঘে ঢেকে যায় পুরো আকাশ। দিনের বেলাতেই নেমে আসে রাতের মতো অন্ধকার। দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় শহরের বিভিন্ন সড়কে যানবাহনকে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করতে দেখা যায়। এরপর শুরু হয় বজ্রসহ বৃষ্টি, যা মুহূর্তেই বদলে দেয় যশোরের আবহাওয়া ও জনজীবনের চিত্র।
যশোর বিমানবন্দর বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান ঘাঁটিস্থ আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত জেলায় ২৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। দুপুর একটার দিকে জেলার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সময়ে বাতাসের আপেক্ষিক আর্দ্রতা ছিল ৬৪ শতাংশ। আবহাওয়াবিদদের মতে, তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রির কিছু বেশি হলেও আর্দ্রতার মাত্রা বেশি থাকায় মানুষের শরীরে অনুভূত তাপমাত্রা আরও বেশি ছিল। ফলে, প্রকৃত তাপমাত্রার তুলনায় গরম অনেক বেশি অনুভূত হয়।
গত কয়েকদিন ধরে যশোরে দিনভর রোদ এবং রাতে গুমোট পরিবেশের কারণে মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়ও অস্বস্তি অনুভব করছিলেন।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত একটি লঘুচাপের বর্ধিতাংশ বিস্তৃত রয়েছে। একইসঙ্গে মৌসুমি বায়ুও বাংলাদেশের ওপর মোটামুটি সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। এর প্রভাবে যশোরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগামী পাঁচদিন দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে বৃষ্টি ও বজ্রসহ বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনাও রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, দুপুরের পরপরই বৃষ্টি শুরু হলে শহরের বিভিন্ন এলাকায় শিশু-কিশোরদের বৃষ্টিতে ভিজে আনন্দ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকেই বৃষ্টির ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে স্বস্তির অনুভূতি ভাগাভাগি করেন। কয়েকদিনের তীব্র গরমের পর এই বৃষ্টি মানুষের মনে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে।
যশোর শহরের চাঁচড়া এলাকার রিকশাচালক ওসমান গনি বলেন, সকালে রিকশা নিয়ে বের হলেই শরীর ঘামে ভিজে যেতো। কয়েকদিন ধরে গরমে কাজ করাই কঠিন হয়ে পড়েছিল। আজ দুপুরে বৃষ্টি হওয়ার পর মনে হচ্ছে শরীরটা ঠান্ডা হয়েছে। এই বৃষ্টি আমাদের জন্য অনেক বড় রহমত।
পালবাড়ি এলাকার ব্যবসায়ী আল-আমীন বলেন, জোহরের নামাজের আগ পর্যন্ত দোকানে বসে থাকা কষ্টকর ছিল। ফ্যান চলে, কিন্তু কোনো কাজ হয় না। বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর পরিবেশ একেবারে বদলে গেছে। ব্যবসার কিছুটা ক্ষতি হলেও এই বৃষ্টি খুব প্রয়োজন ছিল।
পোস্ট অফিসপাড়ার গৃহিণী তামান্না বেগম বলেন, বাড়ির ভেতর এতো গরম যে বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্ট হচ্ছিল। রাতে ঠিকমতো ঘুমানোও যাচ্ছিল না। বৃষ্টির পর ঘরের পরিবেশ অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে।
কৃষকরাও এই বৃষ্টিকে আশীর্বাদ হিসেবে দেখছেন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন এলাকায় আমন ধান রোপণের প্রস্তুতি চলছে।
কৃষকদের মতে, আষাঢ় মাসে নিয়মিত বৃষ্টিপাত না হলে জমিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা তৈরি হয় না। ফলে, চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বৃহস্পতিবারের বৃষ্টি কৃষকদের সেই দুশ্চিন্তা কিছুটা দূর করেছে।
কৃষক জসিম উদ্দিন বলেন, আমন ধানের মৌসুম শুরু হয়েছে। কয়েকদিন ধরে বৃষ্টির অপেক্ষায় ছিলাম। এই বৃষ্টি জমির জন্য খুবই উপকারী। আরও কয়েকদিন বৃষ্টি হলে কৃষকরা অনেক বেশি লাভবান হবে।
তবে, স্বস্তির পাশাপাশি কিছু সাময়িক ভোগান্তিও দেখা দেয়। বৃষ্টির কারণে শহরের কয়েকটি নিচু এলাকায় পানি জমে যায়। অফিস ছুটির সময় বৃষ্টির মধ্যে অনেক পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহী বিপাকে পড়েন। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যানবাহনের গতি কমে যাওয়ায় যানজটেরও সৃষ্টি হয়।
যশোর বিমানবন্দর আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, বৃষ্টিপাত হলেও ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা তাৎক্ষণিকভাবে পুরোপুরি কমে যায় না। মাটি এবং নগর এলাকার কংক্রিটের স্থাপনাগুলো দ্রুত তাপ শোষণ ও বিকিরণ করে। ফলে, বৃষ্টির পরও কিছু সময় ভ্যাপসা আবহাওয়া অনুভূত হতে পারে। বর্তমানে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকায় মানুষের শরীরের ঘাম সহজে শুকাতে পারে না। এ কারণেই প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়ে বেশি গরম অনুভূত হয়।
খুলনা আবহাওয়া অফিসের সাবেক আবহাওয়াবিদ আমিরুল আজাদ বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মৌসুমি বায়ুর প্রভাব ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও বাড়ছে। এটি কৃষি, পরিবেশ ও জনজীবনের জন্য ইতিবাচক। দীর্ঘ সময়ের গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ার পর এমন বৃষ্টি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।