রায়হান সিদ্দিক, যশোর
ভূমিষ্ঠ হওয়া সন্তানের শরীরের ত্বক, মাথার চুলের রঙে ভিন্নতার কারণে ‘অপবাদ’ দিয়ে স্ত্রী মনিরা খাতুনকে (২৭) তালাক দেন মোজাফ্ফর হোসেন। বর্তমানে দুগ্ধপোষ্য সেই শিশুকে নিয়ে দিনমজুর বাবারবাড়িতে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন মনিরা। সাংবাদিকদের কাছে এমনই অভিযোগ দেন এই তরুণী গৃহবধূ।
শিশু আফিয়ার বয়স যখন আট মাস, সেইসময় ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় মোজাফ্ফর-মনিরা দম্পতির। মনিরার অপরাধ, তার গর্ভ হয়ে যে শিশুটি পৃথিবীতে এসেছে- তার ত্বক ও মাথার চুল বাংলাদেশের অন্য বাচ্চাদের মতো না। আফিয়ার ত্বক দুধসাদা, মাথার চুল ও ভ্রু হালকা ঘিয়ে রঙের। স্বামীর সন্দেহ, এই সন্তান তার ঔরসজাত না। সেকারণে তিনি স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন।
সোমবার (১০ নভেম্বর) সকালে যশোর সদরের রামনগর ইউনিয়নের বাজুয়াডাঙ্গা পশ্চিমপাড়ায় দিনমজুর শহিদ মোল্লার বাড়িতে গিয়ে এইসব তথ্য জানা গেছে। মনিরা খাতুন স্বামীর তালাক পেয়ে বাপের বাড়িতেই কষ্টে দিন পার করছেন।
ডাক্তার বলছেন, এটি কোনো অভিশাপ নয়; এই রোগের নাম অ্যালবেনিজম। জিনগত কারণে এমন হতে পারে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বছর পাঁচেক আগে যশোর সদর উপজেলার বাউলিয়া চাঁদপাড়া গ্রামের মজিদ মোল্লার ছেলে মোজাফ্ফর হোসেনের সঙ্গে বিয়ে হয় বাজুয়াডাঙ্গা পশ্চিমপাড়ার শহিদ মোল্লার মেয়ে মনিরা খাতুনের।
২০২২ সালের ১৩ নভেম্বর এই দম্পতির ঘর আলো করে আসে আফিয়া। কিন্তু সে দেখতে বাংলাদেশের আর পাঁচটা সাধারণ বাচ্চার মতো না হওয়ায় স্ত্রী ও মেয়েকে ত্যাগ করে প্রবাসী হন মোজাফফর। অপবাদ দিয়ে মনিরা খাতুনকে তালাক দেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীর।
মনিরা বলেন, ‘আফিয়া জন্মের পরপরই ওর বাবা আমাকে নানা অপবাদ দিতে শুরু করে। মেয়ে তার না। আমার অন্য কারো সাথে খারাপ সম্পর্ক ছিল। আমি বারবার বলেও তাকে বোঝাতে পারিনি। আস্তে আস্তে আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। পরে সাত থেকে আট মাস পর আমাকে তালাক দিয়ে দেয়। এরপর আমার বা আমার মেয়ের কোনো খোঁজ নেয়নি।’
‘বাবা বাড়ির এই ভাঙা ঘরে মেয়েকে নিয়ে অনিরাপদ জীবনযাপন করছি। লোকের বাড়ি কাজ করে কোনোরকম বাচ্চাটার মুখে কিছু তুলে দিতে পারছি। বাবা একজন দিনমজুর, ঘরে সৎমা। কোনো ভাই নেই। কোনো অপরাধ না করেও আমি আর আমার সন্তান শাস্তি পাচ্ছি,’ বলছিলেন মনিরা।
এই অসহায় নারী জানান, ২০২৪ সালের ২১ মে স্থানীয়দের সহযোগিতায় একটি সালিশ হয়। সেসময় স্বামী মোজাফফরের পক্ষে তার বড় ভাই আবু বক্কর আফিয়ার খরচ বাবদ প্রতি মাসে দেড় হাজার টাকা দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। কিন্তু দু’বছর পার হলেও কোনো টাকা মেলেনি। ফলে সন্তানকে নিয়ে চরম দুর্দশার মধ্যে রয়েছেন তিনি।
মনিরার কয়েকজন প্রতিবেশী সাধ্যমতো চেষ্টা করেন বাচ্চাটার পাশে থাকার।
প্রতিবেশী আসমা খাতুন বলেন, ‘মনিরা আমাদের বাসায় কাজ করে। সাধ্যমতো চেষ্টা করছি পাশে থাকার। কিন্তু অনেক কিছু করার ক্ষমতা আমাদের নেই। সরকারিভাবে সহযোগিতা পেলে তারা উপকৃত হবে।’
তিনি বলেন, ‘এখন চাইলেই নিজ সন্তানকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রয়োজনে ডিএনএ (ডি-অক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড) পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। তবে আফিয়ার বাবা সেটি করতে রাজি না। কাউকে না জানিয়ে সে বিদেশে চলে গেছে।’
বিষয়টি নিয়ে কয়েকদফা আলোচনা করেও সমাধান হয়নি বলে জানান রামনগর ইউনিয়নের সাত নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার আব্দুল গফুর মোল্লা। তিনি বলেন, ‘শুধু সন্তানের গায়ের রঙ ভিন্ন থাকায় স্ত্রী এবং মেয়েকে ত্যাগ করেন মোজাফফর। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে কয়েকদফা মীমাংসার চেষ্টা করেছি। একটা সমঝোতা হয়েছিল। কিন্তু মোজাফফরের পরিবার কথা রাখেনি।’
বিষয়টি জানার পর তাদের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন রামনগর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান রামপ্রসাদ রায়। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মনিরার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
রামপ্রসাদ রায় বলেন, ‘ঘটনাটি দুঃখজনক। বর্তমান সময়ে এসে কোনো মানুষ এমন অমানবিক কাজ করতে পারে না। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সাধ্যমতো পরিবারটিকে সহযোগিতা করবো। একইসাথে গ্রাম আদালতে অভিযোগ দিলে ভরণপোষণের বিষয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
রামনগর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি শুনেছি। তাকে একটি দরখাস্ত দিতে বলেছি। স্বামী পরিত্যক্তা ভাতা, সামাজিক সুরক্ষার ৩০ কেজি চাল কিংবা বরাদ্দ পাওয়াসাপেক্ষে তার ঘর তৈরির বিষয়ে সহযোগিতা করার চেষ্টা করবো।’
এদিকে, যোগাযোগের চেষ্টা করেও অভিযুক্ত মোজাফফরের খোঁজ পাওয়া যায়নি। তবে তার বড় ভাই আবুবক্করের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, মোজাফফর দেশে নেই। আফিয়া ও তার মায়ের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগে একবার সালিশ করে সমাধান হয়ে গেছে। কী ধরনের সমাধান জানতে চাইলে তিনি ফোনের লাইন কেটে দেন।
শিশুটির ত্বক, চুল ইত্যাদির বিষয়ে কথা হয় চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. গোলাম মোর্তুজার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘জেনেটিক্যালি ত্রুটির কারণে সাধারণত এমন হয়। আমাদের দেশে অনেক শিশুই আছে এমন। আলাদা করে চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। কেবল রোদে দৃষ্টিগত সমস্যা হয়। সান প্রটেকশান নিলেই ভালো থাকবে।’
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে যশোরের জেলা প্রশাসক মো. আজাহারুল ইসলাম বলেন, মেয়েটির জন্যে আর্থিক সহায়তা ও তার একটি ঘর তৈরিতে সহযোগিতা করা হবে।