যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৫
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

পিঠায় চলে লতার জীবন

শাহারুল ইসলাম ফারদিন

, বেনাপোল (যশোর)

প্রকাশ : বুধবার, ১৯ নভেম্বর,২০২৫, ০৯:৩৫ পিএম
পিঠায় চলে লতার জীবন
Subornovumi

শীতের সন্ধ্যায় যখন কুয়াশা ধীরে ধীরে নামতে থাকে, তখন বেনাপোলের বাহাদুরপুর রাস্তার মোড়ে চুলা থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। এই চুলায় তৈরি হয় গরম গরম ভাপা পিঠা। যার কারিগর লতা বেগম।

একটু এগিয়ে গেলেই ভাপা পিঠা থেকে মিষ্টি সুগন্ধ ভেসে আসে। ভাপার ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে।

প্রতিদিন বিকেলে মাটির চুলা, পিঠা বানানোর সরঞ্জাম আর গরম ভাপের হাড়ি নিয়ে লতা বেগম এসে বসেন রাস্তার ধারে। খেজুরের গুড়ের মিষ্টি ভাপা পিঠা তার দোকানের বিশেষত্ব। বিকেল থেকে শুরু হয় পিঠা তৈরির সময়। বেচাকেনা চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। তারপর ফেরেন বেনাপোল পৌরসভাধীন দীঘিরপাড়ের ভাড়া বাসায়।

লতা বলেন, ‘বিকেলে দোকান খুলি। মানুষ অফিস শেষ করে বাজারে আসে, তখনই বিক্রি ভালো হয়। রাত ৯টার পর দোকান গুটাই, তারপর বাসায় গিয়ে পরেরদিনের প্রস্তুতি।’
লতার স্বামী শহিদুল ইসলাম একসময় ভ্যানচালক ছিলেন। ১১ বছর আগে তিনি আরেকটি বিয়ে করে বেনাপোলের রাজাপুরে গিয়ে নতুন সংসার গড়েন। এরপর থেকে লতার খোঁজখবর নেননি আর। দুই মেয়েকে নিয়ে তখন থেকেই বেঁচে থাকার লড়াইয়ে তিনি।

‘সেই চলে যাওয়া স্বামীকে আর মনে পড়ে না। দুই মেয়েকে মানুষ করেছি, বিয়ে দিয়েছি। এখন নিজের খেয়ে পরে বেঁচে থাকাই সব,’ বলেন লতা।

প্রায় ছয় বছর ধরে শীতকালকে জীবিকার মৌসুমে পরিণত করেছেন তিনি। করেছেন পরের বাসায় কাজও।

এক সময় সংসার চালাতে তিনি ভারত থেকে পণ্য এনে বিক্রি করতেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে বন্ধ হয়ে যায় তার লাগেজ ব্যবসার সেই পথও।

গত ৯ নভেম্বর থেকে ফের এ মৌসুমে পিঠা বানাতে শুরু করেছেন। প্রথম তিনদিন দুই কেজি চাউলের গুঁড়ায় পিঠা বানাতেন। এখন প্রতিদিন ৪ কেজি পর্যন্ত লাগে। পিঠার দাম মাত্র পাঁচ টাকা, তবু সাইজে বড়, আর স্বাদে অনন্য। ক্রেতাদের কাছে এখন লতার পিঠাই বাহাদুরপুরের শীতের প্রতীক।

ভ্যানচালক মো. জিন্নাহ বলেন, ‘লতার তৈরি পিঠা খেলে মনে হয় মায়ের হাতের পিঠা খাচ্ছি। গুড়ের গন্ধে মন ভরে যায়।’

স্কুলশিক্ষিকা শারমিন সুলতানা বলেন, ‘প্রতিদিন বাসায় ফেরার পথে লতা আপার পিঠা না খেলে আর ভালো লাগে না। পাঁচ টাকায় যে এমন স্বাদ দিতে পারে, তা শুধু লতার হাতেই সম্ভব।’

কলেজছাত্র তানভীর হোসেন বলেন, ‘বন্ধুদের নিয়ে প্রায়ই এখানে বসি। লতা চাচির ভাপা পিঠা আমাদের শীতের আড্ডাকে আরও জমিয়ে তোলে। এই স্বাদ অন্য কোথাও পাই না।’

ভাপা পিঠার পাশাপাশি শিগগিরই তিনি চিতই, দুধপিঠা ও পাটিসাপটা চালু করবেন বলে জানান। দিনের শেষে যখন দোকানের ধোঁয়া মিলিয়ে যায় রাতের অন্ধকারে, তখনও লতার চোখে এক ধরনের প্রশান্তি। ক্লান্ত হাতে চুলা গুটিয়ে তিনি বলেন, ‘বেঁচে আছি নিজের পরিশ্রমে। এটা আমার গর্ব।’

বেনাপোলের বাহাদুরপুর মোড়ে এখন শীত মানেই লতার গরম পিঠার দোকান। কুয়াশায় মিশে থাকা গুড়ের গন্ধে জাগ্রত হয় এক নারীর সাহস, সংগ্রাম আর জীবনের জয়গান।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)