যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ১ ডিসেম্বর ২০২৫
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

খালিয়া কারিকরপাড়ায় তাঁত কই!

জহর দফাদার, যশোর

প্রকাশ : বুধবার, ৫ নভেম্বর,২০২৫, ০৯:৪৭ পিএম
খালিয়া কারিকরপাড়ায় তাঁত কই!
Subornovumi

আবুবকর বিশ্বাসের বয়স এখন ৭৪ বছর। গত ২০-২২ বছর ধরে তিনি ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু এক সময় তার হাতে ছিল শাড়ি, লুঙি, গামছা বোনার যন্ত্র, তাঁত। নিপুণ হাতে এসব কাপড় বুনে সংসার চালাতেন। এখন বাপ-দাদার সেই ঐতিহ্যবাহী পেশা বদলে গেছে তার।
আবুবকর বিশ্বাসের বাড়ি যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার জহুরপুর ইউনিয়নের খালিয়া গ্রামে। স্থানীয়দের কাছে এই এলাকা কারিকরপাড়া হিসেবেই পরিচিত।
শুধু আবুবকর একা নন, এই পাড়ার শতাধিক পরিবারের পেশাই ছিল তাঁতশিল্প। শ্রমমূল্যের বিপরীতে স্বল্প উপার্জনের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে এখানকার দেড় শতাধিক তাঁত। সময়ের বিবর্তনে সেই তাঁতের যন্ত্রাংশও বিনষ্ট হয়ে গেছে। একমাত্র আছিরউদ্দিন বিশ্বাসের (৫৫) বাড়িতে একখানি তাঁত কোনোরকমে টিকে আছে।
আবুবকর বিশ্বাস বলেন, বাবার দেখাদেখি খুব ছোটবেলা থেকেই তাঁতের বুনন শিখেছি। বাড়িতে ছিল পাঁচটি তাঁত। এখানে তৈরি হতো শাড়ি, লুঙি আর গামছা। আমার আরো চার ভাইয়ের ছিল তাঁত, কারো তিনটি, কারো চারটি।
মূলত সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করে দিনে ২০০-২৫০ টাকা আয় এই সময়কালে সংসার চালানো কুব কঠিন হয়ে পড়ে। বাজারে সূতার দাম বেশি, অপ্রতুল শ্রমিক, বাজারে কাপড়ের চাহিদা তুলনামূলক কম হওয়ায় মূলত এই পেশায় আর কেউ থাকতে চান না, বলেন তিনি।
কথা হয় এই পাড়ার আতিয়ার রহমানের সঙ্গে। তিনি এখন চাষাবাদে মনোযোগ দিয়েছেন। বছর ১৫ আগেও তার বাড়িতে মাকুর শব্দ শোনা যেত। তিনি বলেন, ‘এই শিল্পে আমাদের আসলে ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটেনি। খুব ছোটকাল থেকে বাবার কাছ থেকে এই কাজ শিখেছি। আমার নিজেরই ছিল তিনটি তাঁত। সব বন্ধ হয়ে গেছে। এই এলাকার দেড় শতাধিক তাঁত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। পরিশ্রম বেশি, উপার্জন কম। সেকারণে নতুন প্রজন্মের কেউই এই পেশায় থাকতে চায় না।’
কারিকরপাড়ায় আছিরউদ্দিন নামে একজনের বাড়িতে একটি তাঁত রয়েছে। তিনি মাঝেমধ্যে সেখানে গামছা বোনেন। গত এক সপ্তাহ মাঠে অনেক কাজ থাকায় তাঁতে বসতে পারেননি।
আছিরউদ্দিন বলেন, ‘‘এখন কেবল মাঝেমধ্যে গামছা বুনি। সারাদিন কাজ করলে চারটি গামছা তৈরি করা যায়। প্রত্যেকটি গামছা বিক্রি হলে ৫২০ টাকা আয়। কিন্তু সূতা, ববিনে ঢোকানোসহ খরচ পড়ে যায় তিনশ’ টাকার মতো। আর একা তো এই কাজ করা যায় না। একজন সহযোগী লাগে।’’ সারদিন খাটা-খাটুনির পরে দুইশ’ টাকায় কী হয়?- প্রশ্ন করেন তিনি।
একসময় বাড়িতে দশটি তাঁত ছিল আছিরউদ্দিনের। সেখানে দশজন বুনন শ্রমিক আর ১০-১২ জন নারী কাজ করতো। চারটা লুঙি বুনতে পারতো একজন শ্রমিক, মজুরি পেতো ৪০-৪৫ টাকা। আর সূতা গোটানো, তাতে মাড় দেয়ার কষ্টকর কাজ করতো নারীরা। তারা দিনে ২০-২৫ টাকা পেতো। এতো পরিশ্রম করে এই অল্প টাকায় আসলে আর কেউ কাজ করতে চায় না।
আছিরউদ্দিনের দুই ছেলে-মেয়ে। ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশুনা করে বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মরত, মেয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে সংসার করছেন। আছিরউদ্দিনের কোনো প্রজন্মই আর এই পেশায় আসেননি।
তার স্ত্রী ময়না বেগম বলেন, ‘বিয়ে হয়ে যখন স্বামীর বাড়ি আসি, তখন দুইটি তাঁত ছিল। পরে আস্তে আস্তে তা দশটি হয়। আমিও মাঝেমধ্যে দু-একটা গামছা বুনি। কিন্তু ছেলেমেয়েরা চায় না আমরা এসব করি।’
জানতে চাইলে জহুরপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান দিলু পাটোয়ারী বলেন, ‘বছর পনের আগে থেকেই কারিকরপাড়ার লোকজন তাদের পেশা পরিপূর্ণভাবে পরিবর্তন করেছেন। নতুন প্রজন্মের বেশিরভাগই ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি এবং বিদেশে পড়ি দিয়ে ভাগ্যের পরিবর্তন করছে। তাঁত আমাদের ঐতিহ্য হলেও আসলে আয় রোজগার না হওয়ায় তাতে আর কেউ ফিরে আসতে চান না। এখন সরকার, জনপ্রতিনিধি এবং সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর সম্মিলিত প্রয়াস, তাদের আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং পর্যাপ্ত পুঁজি বিনিয়োগ ও উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণের নিশ্চয়তা দেওয়া গেলে হয়তো তারা ফিরেও আসতে পারেন।’
এ বিষয়ে মোমিননগর সমবায় শিল্প ইউনিয়ন লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুল আলম মনা বলেন, সূতার কাজে আর কারো ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই। এখানে পরিশ্রম অধিক আর উপার্জন খুবই কম। যেখানে একজন শ্রমিক সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কাজ করে পাঁচশ’ টাকা আয় করে, সেখানে কে দেড়-দুইশ’ টাকার এই কাজ করতে আসবে? তার মতে, অধিক পরিশ্রম আয় কম, সূতার মূল্যবৃদ্ধি, যশোরের সূতার রঙ ভালো না হওয়ার কারণেই এই শিল্প বিলুপ্তির পথে।
যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র কুটির শিল্প কর্পোরেশনের (বিসিক) ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার এনাম আহমেদ বলেন, ‘মূলত তাঁত শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্তরা গ্রহণযোগ্য পারিশ্রমিক না পেয়ে টিকে থাকতে পারছেন না। পরিশ্রম অনুযায়ী তাদের বুননকৃত সামগ্রীর দামের বড় ব্যবধানই এর মূল কারণ। আমি ওইসব এলাকা পরিদর্শন করতে চাই। দেখা যাক তাদের জন্যে কিছু করা যায় কি না।’

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)