মহেশপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি
ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার যুগীহুদা গ্রামের কৃষক আব্দুর রশিদ কয়েক বছর আগেও ছিলেন প্রচলিত ফসলের চাষি। ধান, পাট কিংবা সবজির বাইরে অন্য কোনো ফসল নিয়ে খুব একটা ভাবেননি কখনো। তবে মোবাইল ফোনে ইউটিউব ঘেঁটে বিদেশি ফল আঙুর চাষের ভিডিও দেখতে দেখতে তার মনে জন্ম নেয় নতুন স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে শুরু করেন পরীক্ষামূলক আঙুর চাষ। শুরুতে পরিবার ও আশপাশের মানুষের অনেকেই বিষয়টিকে অবিশ্বাসের চোখে দেখেছিলেন। কিন্তু চার বছরের ব্যবধানে সেই ছোট উদ্যোগই এখন পরিণত হয়েছে সফল বাণিজ্যিক খামারে।
বর্তমানে তার প্রায় পাঁচ বিঘা জমিজুড়ে গড়ে উঠেছে আঙুর বাগান। সেখানে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে রয়েছে প্রায় ২২ জাতের আঙুর। বাগানের প্রতিটি গাছে ঝুলছে থোকায় থোকায় পাকা ফল। দূর থেকে দেখলে যেন বিদেশি কোনো ফলের খামারের দৃশ্য। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি আশপাশের জেলা থেকেও ক্রেতারা আসছেন সরাসরি বাগানে। প্রতি কেজি আঙুর বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা দরে। আব্দুর রশিদ জানান, শুরুতে দশ কাঠা জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে আঙুর চাষ করেন তিনি। ইউটিউব ভিডিও দেখে চারা রোপণ, মাচা তৈরি, ছাঁটাই, রোগবালাই দমনসহ বিভিন্ন বিষয়ে ধারণা নেন। পরে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরামর্শ নেন। প্রথম বছরেই ভালো ফলন পাওয়ার পর তার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। তিনি বলেন, শুরুতে প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। তখন অনেকেই বলেছিল বাংলাদেশে আঙুর হবে না। কিন্তু এখন প্রতি মৌসুমে কয়েক লাখ টাকার আঙুর বিক্রি করছেন। বিদেশি ফল হলেও এখন স্থানীয় পরিবেশেই ভালো ফলন হচ্ছে।
বাগান ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন সারিতে সাজানো আঙুর গাছের ওপর তৈরি করা হয়েছে মাচা। সেখান থেকে ঝুলছে কালো, সবুজ, লাল ও বেগুনি রঙের বিভিন্ন জাতের আঙুর। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। কেউ পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসছেন, কেউ ছবি তুলছেন, আবার কেউ আগ্রহ নিয়ে জেনে নিচ্ছেন আঙুর চাষের পদ্ধতি।
যশোর থেকে আসা দর্শনার্থী হাবিবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে এভাবে আঙুর চাষ হতে পারে, আগে ভাবিনি। নিজের চোখে দেখে খুব ভালো লাগছে। এখন আমরাও ছোট পরিসরে চাষ করার কথা ভাবছি। স্থানীয় কয়েকজন নতুন কৃষক জানান, আব্দুর রশিদের সাফল্য দেখে তারাও আঙুর চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। কেউ কেউ ইতোমধ্যে চারা সংগ্রহ করে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করেছেন।
কৃষি বিভাগ বলছে, ঝিনাইদহ অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া বর্তমানে আঙুর চাষের জন্য উপযোগী হয়ে উঠছে। সঠিক পরিচর্যা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষে ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।
মহেশপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইয়াসমিন সুলতানা বলেন, আঙুর চাষে এখন কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। ফলন বৃদ্ধি, রোগবালাই দমন এবং বাজারজাতকরণ বিষয়ে কৃষি বিভাগ থেকে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। নতুন উদ্যোক্তাদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবছর মহেশপুর উপজেলায় প্রায় ৭.০৯ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ হচ্ছে। কয়েকবছর আগেও যা ছিল শুধুই কল্পনা। কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উচ্চমূল্যের এই ফলের চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে স্থানীয় কৃষকদের আয় বাড়ার পাশাপাশি তৈরি হবে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ুর পরিবর্তন ও প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদেশি ফল চাষে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। সেই ধারাবাহিকতায় ঝিনাইদহে আঙুর চাষও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। আর সেই পরিবর্তনের অন্যতম উদাহরণ হয়ে উঠেছেন কৃষক আব্দুর রশিদ।