প্রচারের অভাবে বঞ্চিত গর্ভবতী ও প্রসূতিরা, প্রশ্নের মুখে সরকারি সুবিধা
রেকর্ডে মাত্র একজন, নির্দেশনা কতটা বাস্তব
সৈয়দ শাহ মোস্তফা হাসমী
, যশোর
সরকারের নথি বলছে, গর্ভবতী ও প্রসূতি নারীদের হাসপাতালে আনা-নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া দেওয়া লাগবে না। কিন্তু যশোরে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। হাসপাতালের রেকর্ড ঘেঁটে দেখা গেছে, গত প্রায় তিন মাসে ৫৩৮ জন গর্ভবতী নারী যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিলেও অ্যাম্বুলেন্স সেবার রেজিস্টারে মাত্র একজন প্রসূতিকে বহনের তথ্য রয়েছে। এই বৈপরিত্যই প্রশ্ন তুলছে, ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সেবা কি কেবল সরকারি কাগজেই সীমাবদ্ধ?
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশের সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গর্ভবতী ও প্রসূতি নারীদের আনা-নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া নেওয়ার কথা নয়। ২০১৪ সালের ৩ জুলাই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের হাসপাতাল-২ অধিশাখা থেকে জারি করা স্মারকে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমানো এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব বাড়ানো।
কিন্তু এক যুগ পর যশোরে সেই নির্দেশনার বাস্তবায়নের দৃশ্যমান প্রমাণ খুব কম। হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র- কোথাও নেই ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সেবা সম্পর্কে তথ্যফলক বা সচেতনতামূলক নির্দেশনা। ফলে অধিকাংশ পরিবার জানেই না যে, সরকার গর্ভবতী ও প্রসূতিদের জন্য বিনামূল্যে পরিবহন সুবিধা ঘোষণা করেছে।
সরেজমিনে যা দেখা গেল
যশোর জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, প্রসববেদনা নিয়ে বাঘারপাড়া উপজেলার চাড়াভিটা গ্রামের বাসিন্দা হালিমা বেগমকে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে আনা হয়েছে। জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে লেবার ওয়ার্ডে ভর্তি করেন। পরে তার স্বামী সেলিম হোসেন নগদ দেড় হাজার টাকা ভাড়া পরিশোধ করেন।
নীতিমালা অনুযায়ী, ওই প্রসূতিকে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে বিনাভাড়ায় হাসপাতালে আসার কথা। কিন্তু বাস্তবে ফ্রি সেবার অস্তিত্ব না থাকায় হালিমা বেগমের পরিবারের মতো অসংখ্য পরিবার অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে।
এক সপ্তাহের সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, জেলার আটটি উপজেলা থেকে প্রতিদিন গড়ে নয় থেকে ১৫ জন প্রসূতি অ্যাম্বুলেন্সযোগে যশোর জেনারেল হাসপাতালে আসছেন। সরকারি হোক বা বেসরকারি, তাদেরকে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া পরিশোধ করতে হচ্ছে।
ফোন করেও মেলেনি অ্যাম্বুলেন্স
যশোর সদর উপজেলার পুলেরহাট গ্রামের আব্দুল বাশার জানান, ২২ জুলাই তার স্ত্রী জেসমিন সুলতানার প্রসববেদনা শুরু হলে তিনি যশোর জেনারেল হাসপাতালে ফোন করে অ্যাম্বুলেন্স চান। তাকে জানানো হয়, অ্যাম্বুলেন্স রোগী আনতে বাইরে রয়েছে; ফিরে এলে পাঠানো হবে। অপেক্ষা না করে তিনি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সে স্ত্রীকে হাসপাতালে আনেন। তার অভিযোগ, ‘হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স মূলত পরিচিত লোকজন ছাড়া অন্য রোগীদের সেভাবে সেবা দেয় না। আর বিনামূল্যের বিষয়টি তো কেউ জানায়ই না।’
অ্যাম্বুলেন্স আছে, কিন্তু প্রসূতিদের জন্য নয়
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, যশোরে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে মোট ১১টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। এর মধ্যে যশোর জেনারেল হাসপাতালে তিনটি, সাতটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাতটি এবং যশোর মা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রে একটি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে।
তবে স্বাস্থ্য বিভাগের বক্তব্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তারা বলছে, প্রসূতিদের জন্য বিনামূল্যে সেবার সরকারি নির্দেশনা থাকলেও সে অনুযায়ী আলাদা কোনো অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ দেওয়া হয়নি; বিদ্যমান অ্যাম্বুলেন্সগুলো সাধারণ রোগী পরিবহনে ব্যবহৃত হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে মন্ত্রণালয়ে কোনো চাহিদাপত্রও পাঠানো হয়নি।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা কার্যত স্বীকার করে নিচ্ছেন যে, সরকারি নির্দেশনা থাকলেও তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
‘জানলে ভাড়া দিতাম না’
মণিরামপুর উপজেলার চিনাটোলা গ্রামের মিজানুর রহমান বলেন, ২৫ জুলাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্সে করে তিনি স্ত্রী সানজিদা সুলতানাকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। কিন্তু গর্ভবতী নারীদের জন্য বিনাভাড়ায় অ্যাম্বুলেন্স সেবা রয়েছে- এমন তথ্য তার জানা ছিল না। ‘জানলে চালককে কোনো ভাড়া দিতাম না,’ বলেন তিনি।
তার মতো আরও অনেক রোগীর স্বজনের দাবি, ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে হাসপাতাল পর্যন্ত কোথাও কার্যকর প্রচার না থাকায় অধিকাংশ মানুষ সরকারি এই সুবিধা সম্পর্কে অবগত নন।
এদিকে, হাসপাতাল প্রশাসনের নির্ধারিত ভাড়ার হারও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সাধারণ রোগীদের জন্য পৌর এলাকার মধ্যে কিলোমিটারপ্রতি ২০ টাকা এবং অন্যান্য স্থানের জন্য কিলোমিটারপ্রতি দশ টাকা নির্ধারণ করা থাকলেও অনেক রোগীর কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
রশিদ নেই, হিসাব নেই, প্রসূতিদের কাছ থেকে বছরে আদায় প্রায় ৬৫ লাখ টাকা
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে রোগী পরিবহনের নামে নিয়মিত অর্থ আদায়ের একটি অনিয়ন্ত্রিত চর্চা চলছে। হাসপাতালের একাধিক রোগী, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অ্যাম্বুলেন্সচালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানভেদে রোগীদের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো রশিদ দেওয়া হয় না। ফলে আদায়কৃত অর্থের কোনো সরকারি হিসাবও সংরক্ষিত হয় না। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না হয়ে সংশ্লিষ্টদের হাতেই থেকে যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যশোর শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে রোগী আনতে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই অঙ্ক এক হাজার টাকাও ছাড়িয়ে যায়। পৌর এলাকার বাইরে থেকে রোগী আনতে এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
শুধু তাই নয়, সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের জন্যও উপজেলাভিত্তিক এক ধরনের অলিখিত ভাড়ার হার নির্ধারণ করে ফেলেছেন চালকেরা। অভিযোগ অনুযায়ী, শার্শা উপজেলা থেকে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা, ঝিকরগাছা থেকে এক হাজার ৭০০ থেকে দুই হাজার টাকা এবং চৌগাছা, বাঘারপাড়া, মণিরামপুর ও কেশবপুর থেকে দেড় হাজার থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। পার্শ্ববর্তী ঝিনাইদহ, মাগুরা ও নড়াইল জেলা থেকে রোগী আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে এই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়ায় তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকায়।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের পরিসংখ্যান বলছে, গত প্রায় তিন মাসে প্রতিদিন গড়ে ১২ জন গর্ভবতী নারী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী তারা বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সেবা পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশকেই ভাড়া দিয়ে হাসপাতালে আসতে হয়েছে। সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের প্রচলিত ভাড়ার হিসাব ধরলেও প্রতিদিন গর্ভবতী ও প্রসূতিদের কাছ থেকে আদায় হয় প্রায় ১৮ হাজার টাকা। সেই হিসাবে মাসে প্রায় পাঁচ লাখ ৪০ হাজার এবং বছরে প্রায় ৬৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে শুধু হাসপাতালে আসা-যাওয়ার জন্য। সরকারি নির্দেশনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে এই অর্থের বড় একটি অংশ পরিবারের সাশ্রয় হওয়ার কথা ছিল।
অনিয়ম, নাকি সমন্বয়হীনতা
অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, কিছু ক্ষেত্রে খাতা-কলমে ভুয়া ট্রিপ দেখিয়ে সরকারি জ্বালানি বরাদ্দ উত্তোলন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, যশোর জেনারেল হাসপাতালের তিনটি অ্যাম্বুলেন্সের জন্য প্রতি মাসে প্রায় ছয় লাখ ৭৫ হাজার টাকা জ্বালানি বরাদ্দ রয়েছে। তারপরও সাধারণ রোগীদের কাছ থেকেও অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্সচালক সাদেকুর রহমান। তার দাবি, রোগীরা যোগাযোগ না করলে তাদের পক্ষে সেবা দেওয়া সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অ্যাম্বুলেন্সচালক ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, হাসপাতালে কোথাও ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সেবা সম্পর্কে প্রচার নেই। এমনকি সন্তান জন্মের পর মা ও নবজাতককে বিনামূল্যে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিও রোগীদের জানানো হয় না। ফলে সরকারি কাগজে শতভাগ বিনামূল্যের সেবা থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ পরিবার সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সচালক সুমন হোসেনও বলেন, গর্ভবতী নারীদের জন্য বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সেবার সরকারি নির্দেশনার বিষয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই। তার ভাষ্য, অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগীর স্বজনরাই নিজ উদ্যোগে হাসপাতালে নিয়ে আসেন এবং ছাড়পত্র পাওয়ার পর নিজেরাই বাড়ি ফিরে যান। ওয়ার্ড থেকেও রোগীদের এ বিষয়ে কিছু জানানো হয় না।
একই তথ্য দিয়েছেন হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডের সেবিকা শাহানাজ খাতুন। তিনি বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কখনো তাদের এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেয়নি। ফলে ওয়ার্ডেও বিনামূল্যের অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিয়ে কোনো প্রচার বা পরামর্শ দেওয়া হয় না। ফলেই সরকারি সুবিধা সম্পর্কে সেবাগ্রহীতাদের অন্ধকারে রেখে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে কার্যত বাধ্য করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সময়মতো হাসপাতালে না পৌঁছালে বাড়ে মৃত্যুঝুঁকি
সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়িত না হওয়ার প্রভাব শুধু আর্থিক নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মা ও নবজাতকের জীবনও। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ভাষ্য, প্রসববেদনা শুরু হওয়ার পর হাসপাতালে পৌঁছাতে বিলম্ব হলে জটিলতা দ্রুত বাড়তে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের প্রসূতি বিশেষজ্ঞ ও আবাসিক সার্জন ডা. নিলুফার ইসলাম এমিলি বলেন, প্রসববেদনা শুরু হওয়ার চার ঘণ্টার মধ্যেই গর্ভবতীকে হাসপাতালে নিতে হয়। দেরি হলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, পানি ভেঙে রক্তপাত শুরু হওয়া কিংবা অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। তার ভাষায়, একজন সুস্থ প্রসূতিও মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সংকটাপন্ন হয়ে পড়তে পারেন।
তিনি বলেন, সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো না গেলে রক্ত সঞ্চালন বা রক্তক্ষরণ বন্ধের জরুরি ওষুধ, যেমন অক্সিটোসিন প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না। তার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৩১ শতাংশ মাতৃমৃত্যুর জন্য অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ দায়ী। এছাড়া গর্ভাবস্থায় বা প্রসবকালে উচ্চ রক্তচাপজনিত খিঁচুনি দেখা দিলে সময়মতো ম্যাগনেসিয়াম সালফেট ইনজেকশন না দেওয়া গেলে মা ও শিশু-উভয়ের জীবনই ঝুঁকির মুখে পড়ে। এই কারণটি প্রায় ২৩ শতাংশ মাতৃমৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত।
ডা. নিলুফার ইসলাম এমিলি আরও বলেন, জরায়ুতে শিশুর অবস্থান স্বাভাবিক না থাকলে অথবা প্রসবপথ সংকীর্ণ হলে প্রসব আটকে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হলে জরায়ু ফেটে গিয়ে মা ও নবজাতক- দুজনেরই মৃত্যু ঘটতে পারে। আবার দীর্ঘসময় প্রসব বিলম্বিত হলে শিশুর মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়ে স্থায়ী ক্ষতি কিংবা জন্মের পরপরই মৃত্যুর আশঙ্কাও থাকে।
একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন যশোর মা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রের চিকিৎসক সাদিয়া রায়হান। তিনি বলেন, প্রসববেদনা শুরু হওয়ার পর সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারলে মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ৫৪ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটিকে ‘থ্রি ডিলে মডেল’ অর্থাৎ সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব, হাসপাতালে পৌঁছাতে বিলম্ব এবং চিকিৎসা পেতে বিলম্ব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই তিন ধরনের বিলম্বই মা ও নবজাতকের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।
নাগরিকের প্রশ্ন: দায়িত্ব নেবে কে
সরকারি নির্দেশনা কার্যকর না হওয়া এবং প্রসূতিদের কাছ থেকে ভাড়া আদায়ের অভিযোগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা। তাদের মতে, সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়নের অভাবে সাধারণ মানুষ যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি ঝুঁকির মুখে পড়ছে মা ও নবজাতকের জীবনও।
যশোর শহরের বাসিন্দা হাফিজুর রহমান শিলু বলেন, অধিকাংশ মানুষ জানেনই না যে গর্ভবতী ও প্রসূতি নারীদের জন্য বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু রয়েছে। এ বিষয়ে সরকারি কোনো প্রচার-প্রচারণা নেই। এমনকি হাসপাতালের সিটিজেন চার্টারেও বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। ফলে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগেই কার্যত ভেস্তে গেছে।
তিনি বলেন, ইউনিয়ন পর্যায় থেকে জেলা হাসপাতাল পর্যন্ত ব্যাপক প্রচারণা চালানো, পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা এবং একটি কার্যকর হটলাইন চালু করা এখন সময়ের দাবি।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়েত বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে গর্ভবতী ও প্রসূতিদের জন্য বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সেবা বিষয়ে নতুন কোনো নির্দেশনা পাননি। তবে প্রায় এক যুগ আগে এমন একটি নির্দেশনা ছিল বলে স্বীকার করেন তিনি। তার দাবি, আগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সেটি বাস্তবায়ন করেননি।
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা। তিনি বলেন, তার দায়িত্বকালেও এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে নতুন কোনো নির্দেশনা আসেনি।
তবে অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, নির্দেশনা নতুন না হলেও তা কখনো বাতিল করা হয়নি। তবু দীর্ঘ এক যুগ ধরে কার্যকর বাস্তবায়নের অভাবে সরকারি এই সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাজারো গর্ভবতী ও প্রসূতি নারী। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়, সরকারের ঘোষিত বিনামূল্যের অ্যাম্বুলেন্স সেবা বাস্তবে কবে পৌঁছাবে বা আদৌ পৌঁছাবে কি না।