সম্পাদকীয়
ভরা মৌসুমেও যখন জাল ফাঁকা আর আড়ত প্রায় শূন্য, তখন ‘জাতীয় মাছ’ ইলিশের নামটি হয়ে ওঠে এক ক্রমবর্ধমান বিলাসবহুল পণ্যের প্রতীক, যা গড়পড়তা মানুষের নাগালের বাইরে। সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলের ইলিশ আহরণ, বিপণন, এর সাথে সংযুক্ত পেশাজীবীদের অবস্থা তথা ইলিশভিত্তিক অর্থনীতি নিয়ে সোমবার সুবর্ণভূমি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদন দেখাচ্ছে, ভরা মৌসুমে ইলিশের সংকট কোনো কাকতালীয় ব্যাপার না, এটা আমাদের সামুদ্রিক সম্পদের প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলা, জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র প্রভাব এবং শাসনব্যবস্থায় দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।
একদিকে বৈরী আবহাওয়া এবং ঘূর্ণিঝড়-নিম্নচাপের মতো প্রাকৃতিক কারণে ট্রলারগুলো গভীর সমুদ্রে যেতে পারছে না, অন্যদিকে নদী-মোহনায় বেহুন্দি জালের মতো নিষিদ্ধ উপকরণের অবাধ ব্যবহার, উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং সমুদ্রের ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার পরিবর্তন- এই বহুমুখী সংকট ইলিশের প্রজনন ও অভিবাসনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। ফলে সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে; যা নিত্যপণ্যের বাজারে এক নতুন মাত্রার অস্বস্তি তৈরি করেছে।
এই সংকটের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, এর তীব্র নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে উপকূলের জেলে পরিবারগুলোর ওপর; যারা এই বর্ষায় ইলিশ আহরণ করে দু’পয়সার মুখ চোখে দেখতেন। খালি হাতে ফিরে আসা, জ্বালানি খরচও তুলতে না পারা- এসব এখন জেলেদের নিত্য দুঃখের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। যেকোনো উপায়ে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
প্রশ্ন হলো, শুধু মৌসুমি নিষেধাজ্ঞা ও কয়েকটি অভিযান দিয়ে কি এই সংকট নিরসন সম্ভব? সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ফিবছর মুখস্ত বুলি আওড়ায়- ‘আশ্বিনে মূল মৌসুম শুরু হলে সরবরাহ বাড়বে’। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে ইলিশ আহরণ যে কমছে, এই বিষয়ে তাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য থাকে না।
জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কীভাবে মোকাবেলা করবে মৎস্য বিভাগ? এই ক্ষমতা তো তাদের নেই, এমনকী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশেরও নেই। এটি বৈশ্বিক সংকট। এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়ে সোচ্চার। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর ফল হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য যে উন্নত বিশ্বের দায় সবচেয়ে বেশি, তারা শুধু সহানুভূতি জানায় আর সামান্য খয়রাতি সাহায্য দেয় তথাকথিত অ্যাডাপটেশনের জন্য। স্থানীয় এনজিওগুলো এই খয়রাতি সাহায্যের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে। আর দাতাদের দেওয়া খয়রাতি সাহায্য নিয়ে তাদের শিখিয়ে দেওয়া পথে মানুষকে বিরূপ প্রকৃতিতে বেঁচে থাকার ছবক দিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করার ধান্ধা করে।
আমরা যদি ইলিশকে শুধু অর্থনৈতিক পণ্য হিসেবেই দেখি, তাহলে এটি মারাত্মক অর্থনৈতিক ক্ষতি হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। আর যদি একে ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্যের অংশ হিসেবে দেখি, তবে এটি পরিবেশের চরম বিপর্যয়ের পূর্বাভাস। এই রুপালি মাছের জন্য যেমন দরকার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিত সংরক্ষণ উদ্যোগ, তেমনই প্রয়োজন অভ্যন্তরীণ নদী-মোহনার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। ডিম ছাড়ার মৌসুমে ইলিশ ধরা বন্ধে বিগত বছরগুলোতে যে কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, তা অপ্রতুল। ফলে অনেক জেলেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ সংগ্রহের চেষ্টা করেন শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে। তাই একথা বলা বাহুল্য হবে না যে, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থানের উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি নগদ সহায়তাও বাড়ানো জরুরি।
সরকার, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজকে এখন উপলব্ধি করতে হবে যে, ইলিশের অভাবে শুধু বাজারের দামই বাড়ছে না, নষ্ট হচ্ছে একটি সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্র এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে লাখ লাখ মানুষের জীবিকা। রুপালি ইলিশকে ফিরিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন দূরদর্শী, বৈজ্ঞানিক ও মানবিক উদ্যোগ; যেখানে সংরক্ষণের সঙ্গে থাকবে জীবিকার নিশ্চয়তা, এবং নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে থাকবে কার্যকর বাস্তবায়ন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে আরও উচ্চকণ্ঠ হতে হবে রাষ্ট্রকে।