যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

দালাই লামার রাজনৈতিক বক্তব্য নিষেধ, হাসিনার কেন নয়

ভরত ভূষণ

প্রকাশ : সোমবার, ১০ আগস্ট,২০২৬, ১২:০১ এ এম
দালাই লামার রাজনৈতিক বক্তব্য নিষেধ, হাসিনার কেন নয়

দুই বছর আগে ৫ আগস্ট ক্ষমতা থেকে ন্যক্কারজনকভাবে বিদায় নিতে হয়েছিল শেখ হাসিনাকে। সেই দিনটিকে সামনে রেখে নয়াদিল্লিতে তিনি আয়োজন করেছিলেন ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলন। এতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে নতুন করে অস্বস্তি যুক্ত হয়েছে।

ক্ষমতাচ্যুত একজন নেতা কেন নিজ দেশের রাজনৈতিক বয়ান বা নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করবেন, তা সহজেই বোঝা যায়। তিনি হয়তো বিশ্বাস করেন যে তিনি ফিরে আসার পথেই আছেন। আর এ কারণেই তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরবেন। বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায়সহ অসংখ্য মামলা রয়েছে। তিনি হয়তো এটাও বিশ্বাস করেন, এই ভার্চ্যুয়াল উপস্থিতি তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারবে।

এই সংবাদ সম্মেলন তাকে তার ক্ষমতাচ্যুতির বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করারও সুযোগ করে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় সহিংসতা এবং দুঃশাসনের বিরুদ্ধে তরুণদের প্রতিবাদের কারণে যে গণঅভ্যুত্থান ঘটেছিল, সেই বয়ান অস্বীকার করে তিনি এটিকে ষড়যন্ত্র, গোপন নির্দেশ, সংঘবদ্ধ সহিংসতা এবং অপপ্রচারের দ্বারা পরিচালিত সাংবিধানিক শৃঙ্খলার ওপর সমন্বিত আক্রমণ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

হাসিনা যে উসকানিমূলক কথা বলবেন তা জানা সত্ত্বেও ভারত এই ঘটনা থেকে নিজেদের দায় এড়িয়ে গেছে। তারা দাবি করেছে, এই সংবাদ সম্মেলনটি একটি বেসরকারি মিডিয়া প্রতিষ্ঠান আয়োজন করেছে, এতে সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সেখানে যেসব মতামত প্রকাশ করা হয়েছে ভারত সেগুলোকে সমর্থন করে না।

ভারতে নির্বাসিত আরেক রাজনৈতিক-ধর্মীয় নেতা দালাই লামার ওপর রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধের সঙ্গে এর তুলনা করুন। তাকে রাজনৈতিক বক্তব্য না দেওয়ার জন্য কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভারত তার সফরগুলোকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। এমনকি অরুণাচল প্রদেশের মতো সীমান্ত রাজ্যগুলোতেও তার সফরকে কেবল ধর্মীয় হিসেবে অনুমতি দেওয়া হয়। নির্বাসিত তিব্বতিদেরও কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার অনুমতি নেই। চীনের সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্যের অভাব রয়েছে ভারতের। ফলে তিব্বতিদের আশ্রয়ের ৬০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানটি নয়াদিল্লি থেকে সরিয়ে ধর্মশালায় নিতে বাধ্য হয়েছিল ভারত।

ভারত স্পষ্টতই দালাই লামাকে কেন্দ্র করে চীনের সঙ্গে সংঘাত এড়াতে চায়। কিন্তু হাসিনার ক্ষেত্রে মনে হচ্ছে, তার উসকানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে বাংলাদেশকে খোঁচা দেওয়াটাকে স্বাভাবিক খেলা হিসেবেই দেখছে ভারত। সম্ভবত বাংলাদেশকে উসকে দেওয়ার ফলে যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, তা সহজেই সামলানো যায়। তিব্বত নীতি সরাসরি ভারতের সার্বভৌমত্বকে নাড়া দেয়। অন্যদিকে হাসিনার উসকানির লক্ষ্য শুধু বিপুল ভোটে নির্বাচিত তারেক রহমানের সরকারের বৈধতাকে দুর্বল করার চেষ্টা। এটি ভারতের ভূখণ্ড বা নিরাপত্তা স্বার্থে কোনো প্রভাব ফেলে না।

এতে ভারতের লাভ কী? হাসিনার রাজনৈতিক পদচারণা নিয়ন্ত্রণ করে ভারত যে ‘সুবিধা’ পেতে পারে, তার জন্য বাস্তবে বেশ বড় মূল্য চোকাতেও হতে পারে। আপাতত ঢাকা এই অস্বস্তিকর বিষয়টি হজম করে নিয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। সম্পর্ক ছিন্নের কোনো ঘোষণা না দিয়েই তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনাটিকে ‘জনগণের অনুভূতিতে গভীরভাবে আঘাত করেছে’ এবং ‘সাদৃশ্যপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়নের জন্য ক্ষতিকর’ বলে বর্ণনা করেছে। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনটিকে কেবল একটি ছোট খোঁচা হিসেবে অবমূল্যায়ন করা বোকামি হবে, বিশেষ করে যেহেতু ঢাকা ভারতকে সতর্ক করেছিল যে এই অনুষ্ঠানের অনুমতি দিলে তা সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ক্ষতি করবে। এই পরামর্শের পরও ভারত যেভাবে পদক্ষেপ নিয়েছে, তাতে মনে হয় নয়াদিল্লি হয়তো হিসেবে ভুল করেছে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের বর্তমান প্রাসঙ্গিকতার বিষয়ে।

আওয়ামী লীগ এখনো একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে আছে, এমন কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই। এ বছরের সাধারণ নির্বাচনে দলটির ঐতিহ্যবাহী দুর্গগুলোতে ভোটার উপস্থিতি কম ছিল। এর মানে এই নয় যে ভোটাররা আওয়ামী লীগের আসন্ন প্রত্যাবর্তনে বিশ্বাস করেছে। হাসিনা ও তার দলের সম্ভাবনার প্রতি সমর্থন জুগিয়ে খুব শিগগিরই কোনো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশ হাসিনাকে ছাড়িয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। জুলাই ২০২৪ আন্দোলনের মাধ্যমে তরুণদের রাজনৈতিক সচেতনতা, জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান এবং বিএনপির রাজনৈতিক শক্ত অবস্থান একটি পরিবর্তিত বাস্তবতা। হাসিনাকে সমর্থন জুগিয়ে ভারত হয়তো কোনো সুবিধাই আদায় করতে পারবে না, বরং এটি একটি রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল সম্পদে পরিণত হতে পারে। হাসিনা একজন বয়স্ক, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নির্বাসিত নেতা, যার সংগঠন ভেতর থেকে শূন্য হয়ে গেছে, কিন্তু তারপরও তিনি ঢাকার একটি বৈধভাবে নির্বাচিত সরকারকে বিরক্ত করে চলেছেন।

ক্ষমতায় থাকার সময় হাসিনা উপকারী মিত্র ছিলেন; কিন্তু আজ তিনি কেবলই এক ডুবন্ত তরি। তার ফিরে আসার আশাও হয়তো আর বাস্তবায়িত হবে না। তাই ঢাকার সরকারকে তাকে দিয়ে বিরক্ত করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ উপায়ে কাজ করা ছাড়া ভারতের আর কোনো বিকল্প নেই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার যদি ভারত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে হাসিনা ভারতকে কোনো সুবিধাই দিতে পারবেন না। তিনি (তারেক রহমান) ইতোমধ্যেই তার প্রথম বিদেশ সফরে ভারত বাদে মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নিয়েছেন। চীন এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামো অংশীদার। তারেক রহমান চীনের সঙ্গে বেশ কয়েকটি নতুন চুক্তি সই করেছেন, যার মধ্যে ভারতের সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত তিস্তা নদীর সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করাও অন্তর্ভুক্ত।

তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারত তাকে আন্তরিকভাবে প্রলুব্ধ করে সম্পর্কের একটি নতুন পাতা উল্টানোর চেষ্টা করছিল। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের পক্ষ থেকে তার শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকে একটি ব্যক্তিগত আমন্ত্রণপত্র পাঠিয়েছিলেন।

এটা বোধগম্য ছিল যে, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি রাজ্য সরকারগুলো যখন ঢাকঢোল পিটিয়ে বাংলাভাষী মুসলিম পুরুষ, নারী ও শিশুদের সীমান্তের ওপারে ঠেলে দিচ্ছিল, তখন তারেক রহমানের জন্য দেশের ভেতরে ভারত সফরের যৌক্তিকতা প্রমাণ করা কঠিন হতো। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ নথিবদ্ধ করেছে, ১ জুন থেকে বিএসএফের ২০০ জনেরও বেশি মানুষকে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে পুশব্যাক করার ২১টি চেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি)। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, প্রায় পাঁচ হাজার অবৈধ অভিবাসীকে ইতোমধ্যেই পুশব্যাক করা হয়েছে।

তবে ছয় মাস ধরে ওই আমন্ত্রণের কোনো সাড়া না দেওয়াটাও বোঝা কঠিন। তাই হয়তো ভারতের ধৈর্যচ্যুতি ঘটছে। যদিও বিজেপি রাজ্য সরকারগুলো বাংলাভাষী ‘অভিবাসীদের’ সাথে যে আচরণ করছে, সে বিষয়ে ঢাকাকে আশ্বস্ত করতে মোদি সরকারও তেমন কিছুই করেনি। সর্বোপরি, তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বারবার ঘোষণা করা একটি নীতিই বাস্তবায়ন করছে।

ঢাকাও ইতিবাচক কোনো সংকেত দিচ্ছে না। বস্তুত তারেক রহমান প্রকাশ্যে ভারতের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক থেকে সরে এসে বলেছেন, ‘দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ’, যা স্পষ্টভাবে নয়াদিল্লি থেকে দূরত্ব বজায় রাখাকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মূলধন হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

খবরে প্রকাশ, ভারত এখন আশা করছে, ১২-১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সামিটের আউটরিচ সেশনে তারেক রহমান যোগ দেবেন এবং সেখানে মোদির সঙ্গে তার বৈঠক হবে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের নিজস্ব অগ্রাধিকারগুলো বিবেচনায় নিয়ে হাসিনাকে প্রকাশ্যে এমন ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ দেওয়ার সময়টা একেবারেই ঠিক ছিল না। ব্রিকস সফরে দেশের ভেতরের বিরূপ প্রতিক্রিয়া সামলানো লাভজনক হবে কি না, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এটি ঢাকাকে নতুন করে ক্ষুব্ধ করেছে। ভারত কোনোভাবেই আগের শাসনকালকে (হাসিনার শাসনামল) সমর্থন করছে বলে দেখাতে পারে না। আবার ঢাকার বিরোধী শক্তিগুলোকে ভারতের ক্ষতি করে তাদের নিজস্ব জাতীয়তাবাদী ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করারও সুযোগ দিতে পারে না।

তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের যে পুনর্গঠন চেয়েছিল, তা ইতোমধ্যেই ম্লান হতে বসেছে। নয়াদিল্লির নীতি-নির্ধারণী মহলে যারা এখনো অতীতের সঙ্গে আবদ্ধ, তারা সদিচ্ছা গড়ে তোলার বদলে অবিশ্বাস উসকে দেওয়ায় সম্পর্কটি আরও অবনতির দিকে যাচ্ছে। ভারত যদি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে চায়, তবে সহজেই সামলানো যায় এমন দ্বন্দ্বগুলোকে কোনোভাবেই তারেক রহমানের জন্য সত্যিকারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে দেওয়া উচিত নয়। জামায়াতে ইসলামীর উত্থানের প্রেক্ষাপটে, তার নেতৃত্বাধীন বিএনপিই এখনও একমাত্র বৈধ গণতান্ত্রিক শক্তি, যার সঙ্গে ভারত কাজ করতে পারে এবং করা উচিত।

[নয়াদিল্লিভিত্তিক এই সাংবাদিকের লেখাটি ডেকান হেরাল্ডে প্রকাশিত। অনুবাদ বাংলা স্ট্রিম]

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)