মো. হুমায়ুন কবির
, কয়রা
খুলনার উপকূলীয় উপজেলা কয়রায় চলতি বর্ষা মৌসুমে টানা অতিবৃষ্টি ও ঘেরের পানির লবণাক্ততার ভারসাম্যহীনতায় চিংড়ি চাষে দেখা দিয়েছে নতুন সংকট। কয়েক দফা ভারী বৃষ্টিতে ঘেরের পানির লবণাক্ততা দ্রুত কমে যাওয়ায় চিংড়ির স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ায় উৎপাদন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্থানীয় চাষিরা। এ পরিস্থিতিতে চলতি মৌসুমে বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা করছেন তারা।
উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কয়রায় ৪ হাজার ২০০টি বাগদা ঘেরের আওতায় রয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৮০০ হেক্টর জমি। এসব ঘের থেকে বছরে প্রায় ৩ হাজার ৮০ মেট্রিক টন বাগদা চিংড়ি উৎপাদনের তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া আধুনিক পদ্ধতিতে আরও ২১টি বাগদা ঘের রয়েছে। এসব ঘেরের আয়তন ২৫ হেক্টর এবং উৎপাদন প্রায় ১৯৬ মেট্রিক টন।
মৎস্য বিভাগের হিসাবে, কয়রায় ছোট-বড় মিলিয়ে ১৫ হাজার ৫৭৩টি চাষকৃত মাছের খামার রয়েছে। এসব খামারের মোট আয়তন প্রায় ৭ হাজার ২৯৮ দশমিক ৪০ হেক্টর। এখানে মোট মাছ উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার ৮৫৮ মেট্রিক টন। উপজেলায় মৎস্যচাষির সংখ্যা ১১ হাজার ২৫০ জন।
উপজেলার মহারাজপুর, কয়রা সদর, উত্তর বেদকাশী, দক্ষিণ বেদকাশী, আমাদী, বাগালী ও মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টানা বৃষ্টিতে অধিকাংশ ঘেরের পানির গুণগত মানে পরিবর্তন এসেছে। অনেক ঘেরে চিংড়ির খাবার গ্রহণ কমে গেছে। চিংড়ির বৃদ্ধি ধীর হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও চিংড়ি মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
চিংড়িচাষি কাজী আলাউদ্দিন বলেন, ‘এবারের টানা বৃষ্টিতে ঘেরের পানির অবস্থা একেবারেই বদলে গেছে। আগে যে হারে চিংড়ি বড় হতো, এখন তা হচ্ছে না। উৎপাদন খরচ বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যাচ্ছে না। এভাবে পরিস্থিতি চলতে থাকলে মৌসুম শেষে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।’
আরেক চাষি মামুন জানান, ঘেরের পানির ভারসাম্য ঠিক রাখতে বারবার চুন, খনিজ উপাদান ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত খরচ বাড়ছে। অন্যদিকে বাজারে চিংড়ির দামও আশানুরূপ নয়। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হলে লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
চাষিরা জানান, ঘেরের পানির গুণগত মান ঠিক রাখতে নিয়মিত পরিচর্যা, পানি পরিবর্তন এবং বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে কয়রা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সমীর কুমার সরকার বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে অনেক ঘেরে পানির লবণাক্ততা স্বাভাবিকের তুলনায় কমে গেছে। এতে চিংড়ির বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিও বাড়ে। মৎস্য বিভাগ নিয়মিত মাঠপর্যায়ে চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে। ঘেরের পানির পিএইচ, লবণাক্ততা ও দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী চুন ও খনিজ উপাদান ব্যবহার করে পানির গুণগত মান ঠিক রাখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টির সময় ঘেরের পানি ব্যবস্থাপনায় সতর্ক থাকলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। মৎস্য বিভাগ মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি করছে এবং যেকোনো সমস্যায় চাষিদের প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ঘের পরিচালনার পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।
উপজেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য থেকে কয়রার মৎস্য খাতের বিশাল পরিসরের চিত্রও পাওয়া যায়। উপজেলায় ১০ হাজার ২৫৬টি বেসরকারি পুকুর ও দীঘি রয়েছে। এসব জলাশয়ের আয়তন প্রায় ৪৯৮ হেক্টর এবং উৎপাদন প্রায় ৯৪০ মেট্রিক টন। এ ছাড়া জেলায় ৫৪০টি ঘের রয়েছে, যার আয়তন ৪৭০ হেক্টর।
চিংড়ি ও মাছ চাষের সঙ্গে কয়রার অর্থনীতির একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় ১১ হাজার ২৫০ জন মৎস্যচাষি রয়েছেন। ফলে চিংড়িঘেরে উৎপাদন ব্যাহত হলে এর প্রভাব শুধু চাষিদের ওপর নয়, স্থানীয় শ্রমিক, ব্যবসায়ী, আড়তদারসহ সংশ্লিষ্ট পুরো অর্থনীতিতে পড়তে পারে।
উপকূলীয় অঞ্চলের চিংড়িচাষ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও জলবায়ু পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি, লবণাক্ততার ওঠানামা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতিবছরই নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন চাষিরা। এ অবস্থায় চিংড়িচাষিদের নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ, পানির গুণগত মান পরীক্ষার সুযোগ, সহজ শর্তে ঋণ এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।