শাহারুল ইসলাম ফারদিন
, যশোর
গর্ভবতী মা, নবজাতক ও সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠিত যশোর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে চিকিৎসকের নিয়মিত উপস্থিতি, রোগীর তথ্য সংরক্ষণ, ওষুধ সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত নয়দিনে পাঁচ দফা সরেজমিনে গিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) ডা. সাদিয়া রায়হানকে কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি। চিকিৎসক না থাকায় দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের অসহায় অপেক্ষা করতে হয়েছে। অনেকে ফিরে গেছেন চিকিৎসা না নিয়েই ।
এই কেন্দ্রের রোগীর সিরিয়াল রেজিস্ট্রার পর্যালোচনা করে পাওয়া যায় তথ্যের ঘাটতি। চলতি আগস্টের ১ থেকে ১১ তারিখ পর্যন্ত ১১ দিনের মধ্যে মাত্র পাঁচ দিনের রোগীর সিরিয়াল নথিভুক্ত রয়েছে। ওই পাঁচদিনে ১৭১ রোগীর সিরিয়াল নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেলেও বাকি ছয় দিনের কোনো তথ্য রেজিস্ট্রারে নেই।
নথিভুক্ত পাঁচদিনের হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ৩৪ দশমিক ২ জন রোগী সিরিয়াল নিয়েছেন।
ফলে ১১ দিনে মোট কত রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন এবং প্রতিদিন প্রকৃত রোগীর চাপ কত ছিল, তা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
৩ আগস্ট বেলা ১২টার দিকে কেন্দ্রে গিয়ে ডা. সাদিয়া রায়হানকে তার চেম্বারে পাওয়া যায়নি। ৪ আগস্টও তার চেয়ার ফাঁকা ছিল। ৬ ও ৮ আগস্ট খোঁজ নিয়েও তার উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ ১১ আগস্টও কর্মস্থলে তাকে পাওয়া যায়নি।
চিকিৎসকের অনুপস্থিতির কারণ জানতে কেন্দ্রের কর্মীদের কাছে জানতে চাইলে একেকজন একেক ধরনের তথ্য দেন।
রিনা পারভীন নামে এক কর্মী জানান, ডা. সাদিয়া ডিসি অফিসে সভায় গেছেন। ইসমত আরা নামে আরেকজন বলেন, তিনি কিছুক্ষণ আগে বাসায় গেছেন।
১১ আগস্ট কর্মীরা জানান, তিনি রোববার থেকে ছুটিতে আছেন। এর আগে শনিবার তিনি কোথায় ছিলেন জানতে চাইলে কর্মীরা জানান, তিনি কেন্দ্রে এসেছিলেন, তবে কিছুটা দেরিতে। প্রতিবেদক চলে যাওয়ার পর তিনি কেন্দ্রে আসেন বলেও তারা জানান।
তবে, রোগীদের বক্তব্য ভিন্ন। চৌগাছা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর স্বজন নজরুল ইসলাম বলেন, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কেন্দ্রে অবস্থান করেও তিনি চিকিৎসকের দেখা পাননি। চিকিৎসক না থাকায় রোগীদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে এবং অনেকে চিকিৎসা না নিয়েই ফিরে যাচ্ছেন।
১১ আগস্ট সকালে সদর উপজেলার তালবাড়িয়া গ্রামের রাফেজা সুলতানা রাখি সেবা নিতে কেন্দ্রে আসেন। কিন্তু চিকিৎসকের দেখা পাননি। তাকে বলা হয়, শনিবারে যেতে।
শহরের শংকরপুর এলাকার শুকুর আলীর স্ত্রী মরিয়ম বেগম হাঁটুর ব্যথা এবং একই এলাকার সুফিয়া বেগম ব্যথাজনিত সমস্যা নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসেন। চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে ফিরে যেতে হয় তাদের।
চিকিৎসকের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন যশোরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল। তিনি বলেন, কোনো চিকিৎসক কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। রোগীরা যেনো চিকিৎসাসেবা না পেয়ে ফিরে না যান, সে বিষয়েও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
পরিবার পরিকল্পনা সেবাতেও ভোগান্তির অভিযোগ পাওয়া গেছে। চাঁচড়া চেকপোস্ট এলাকার নান্টু শেখের স্ত্রী সাথী আক্তার তিন বছরের জন্য কপার-টি ইন প্ল্যান পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন। দুই বছর পর সেটি অপসারণ করতে কয়েকদিন ধরে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে এসেও সমাধান পাননি।
পরে যশোর জেনারেল হাসপাতালে গেলে তাকে জানানো হয়, যে প্রতিষ্ঠান থেকে পদ্ধতিটি গ্রহণ করেছেন, সেখান থেকেই এটি অপসারণ করতে হবে। এরপর আবার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে এসে চিকিৎসক না থাকায় তাকেও শনিবার যেতে বলা হয়।
সাথী আক্তার বলেন, ‘কয়েকদিন ধরে ঘুরছি। একটি পরিবার পরিকল্পনার একটি পদ্ধতি অপসারণের জন্য আমাকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে হচ্ছে।’
কেন্দ্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত ১১ দিনে নরমাল ডেলিভারি হয়েছে ১০ জনের। প্রসবের পর প্রসূতি সেবা নিয়েছেন পাঁচজন, ভায়া পরীক্ষা হয়েছে চারজনের এবং টিটি টিকা নিয়েছেন ৪০ জন। জ্বর, ঠান্ডা, কাশি ও অন্যান্য রোগ নিয়ে সাধারণ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন ৩১ জন এবং শিশু চিকিৎসা নিয়েছে ১১ জন। ইনজেকশন নিয়েছেন ছয়জন এবং খাবার বড়ি নিয়েছেন নয়জন।
রোগীর তথ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি ওষুধ সরবরাহেও ঘাটতির তথ্য পাওয়া গেছে। কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, এখানে ২৬ ধরনের ওষুধ সরবরাহের কথা থাকলেও বর্তমানে দেওয়া হচ্ছে মাত্র নয় ধরনের। অর্থাৎ, নির্ধারিত ২৬ ধরনের মধ্যে ১৭ ধরনের ওষুধ সরবরাহ নেই। সরবরাহ থাকা ওষুধের ধরন নির্ধারিত তালিকার মাত্র ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ। আর ৬৫ দশমিক ৪ শতাংশ ধরনের ওষুধ বর্তমানে সরবরাহের বাইরে রয়েছে। কেন্দ্রের পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা ইসমত আরা এ তথ্য জানান।
এদিকে, ওষুধ সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত একটি ফ্রিজে ওষুধের পাশাপাশি কাঁচা মাছ রাখা দেখা যায়। নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ওষুধ সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত ফ্রিজে খাদ্যপণ্য রাখার ঘটনায় সংরক্ষণব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এক কর্মচারী জানান, কোয়ার্টারে একজন আপা উঠবেন। তিনি এখনো সব মালামাল আনতে পারেননি। এ কারণে সাময়িকভাবে ফ্রিজে মাছ রাখা হয়েছে।
ওষুধ সংরক্ষণের ফ্রিজে কাঁচা মাছ রাখার বিষয়টি স্বাস্থ্যবিধির দিক থেকে গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন ডা. নাজমুস সাদিক রাসেল। তিনি বলেন, ওষুধের সংরক্ষণব্যবস্থা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে করতে হয়। বিষয়টি সরেজমিনে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
আঞ্চলিক কার্যালয়ের অফিস সহকারী ফারুক হোসেনকে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকার চেয়ারে বসে থাকতে দেখা যায়।
কেন্দ্রের ফার্মাসিস্ট আছিয়া খাতুনের নিয়মিত উপস্থিতি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। ফার্মাসিস্টের দায়িত্বের মধ্যে ওষুধ সংরক্ষণ ও বিতরণ অন্যতম। ফলে চিকিৎসক ও ফার্মাসিস্টের অনিয়মিত উপস্থিতি রোগীদের চিকিৎসা ও ওষুধ পাওয়ার প্রক্রিয়া দুটিই ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেবা ২৪ ঘণ্টার প্রসূতি সেবা। এখানে গর্ভকালীন পরীক্ষা, প্রসবপূর্ব সেবা, নিরাপদ প্রসব, প্রসবোত্তর সেবা, নবজাতকের পরিচর্যা, পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার কথা।
তবে, অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট না থাকায় ২০২১ সালের পর থেকে এখানে সিজারিয়ান অপারেশন বন্ধ রয়েছে। ফলে, প্রসবকালীন জটিলতা দেখা দিলে কিংবা নরমাল ডেলিভারি সম্ভব না হলে রোগীকে অন্য হাসপাতালে পাঠানোর প্রয়োজন হয়।
খড়কি এলাকার রবিউল ইসলামের স্ত্রী খাদিজা খাতুন মঙ্গলবার সকালে প্রথম সন্তান প্রসবের জন্য কেন্দ্রে ভর্তি হন। তিনি বলেন, হাসপাতালের সেবার মান ভালো। মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে নরমাল ডেলিভারিতে তিন কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের কন্যাসন্তান হয়েছে। তবে, নরমাল ডেলিভারি না হলে সিজারের ব্যবস্থা না থাকায় সমস্যায় পড়তে হতো। এখানে সিজারের সুবিধা থাকলে আরও বেশি রোগী আসত।
পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা রিনা পারভীন বলেন, সিজার চালু থাকার সময় এখানে প্রচুর রোগী হতো। সিজার বন্ধ হওয়ায় রোগী কমেছে। নরমাল ডেলিভারি না হলে কোথায় যাবে- সেই ভয়ে রোগীরা এলেও আবার ফিরে যায়।
পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা ইসমত আরা বলেন, চেকআপে গেলে রোগীরা জানতে চান সিজারের ব্যবস্থা আছে কি না, শেষ মুহূর্তে সমস্যা হলে সিজার করা যাবে কি না। কিন্তু সিজারের ব্যবস্থা না থাকায় রোগীদের প্রশ্নের জবাব দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
সংকটের বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা যশোরের উপপরিচালক মো. দিলদার হোসেন বলেন, অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট না থাকায় ২০২১ সালের পর থেকে এখানে সিজারিয়ান সেবা বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে নিজস্ব অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট না থাকলেও সিভিল সার্জনের মাধ্যমে সপ্তাহে একজন অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি আগস্ট মাসের মধ্যেই সপ্তাহে অন্তত এক দিন সিজারিয়ান সেবা চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে।
চিকিৎসকের কর্মস্থলে অনুপস্থিতির অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ৯ থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত পরীক্ষার কারণ দেখিয়ে ডা. সাদিয়া রায়হান ছুটি নিয়েছেন।
৩ থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত চিকিৎসকের কর্মস্থলে অনিয়মিত উপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো চিকিৎসক নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকলে বিষয়টি অবশ্যই খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।
তিনি জানান, অফিসের ফ্রিজে মাছ রাখার বিষয়টি তার জানা ছিল না। অফিসের ফ্রিজ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের সুযোগ নেই। সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) ডা. মোছা. সাদিয়া রায়হানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
প্রসঙ্গত, যশোর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে বর্তমানে মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ডা. সাদিয়া রায়হান। চারজন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা, চারজন মিডওয়াইফ, সহকারী এটেনডেন্ট নার্স, ফিমেল মিডওয়াইফ এটেনডেন্ট, ফার্মাসিস্ট, আয়া, পিয়ন ও ড্রাইভার কর্মরত রয়েছেন।
কর্মীদের আবাসনের জন্য দুটি দুইতলা কোয়ার্টার রয়েছে। একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) ডা. সাদিয়া রায়হান থাকেন। নিচতলা বর্তমানে ফাঁকা। অন্য ভবনে পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা শিরিনা খাতুন ও রিনা পারভীনের থাকার কথা রয়েছে। এছাড়া, জরাজীর্ণ একটি ভবনে পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা শিরিনা খাতুন পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।