ইমরান হোসেন রাজ
, যশোর
চোখে নেই বিলাসী কোনো স্বপ্ন, নেই ঝলমলে জীবনের রঙ। আছে দু’চোখ ভরা করুণ আকুতি আর বেঁচে থাকার তীব্র লড়াই।
যশোরের শার্শা উপজেলার কায়বা ইউনিয়নের রাড়ীপুকুর গ্রামে গেলেই দেখা মেলে এই কষ্টের করুণ দৃশ্যপট।
দীর্ঘ ১৭টি বছর ধরে শারীরিক প্রতিবন্ধী দুই সন্তানকে পরম মমতায় আগলে রেখে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন অসহায় দিনমজুর শরিফুজ্জামান মিলন ও তাসলিমা আক্তার।
জন্ম থেকেই যমজ দুই ভাই সাজেদুল ইসলাম মাহি ও সাকিবুল ইসলাম রাফি শারীরিকভাবে অক্ষম। নিজের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানোর শক্তি নেই তাদের। এখান থেকে ওখানে যেতে হলেও নির্ভর করতে হয় বাবা-মায়ের ওপর। গত ১৭ বছর ধরে সন্তানদের টেনে নিতে নিতে ক্লান্ত মা-বাবার শরীরে জমেছে বয়সের ছাপ, কিন্তু ভালোবাসায় একটুও ভাটা পড়েনি।
কিন্তু শুধু মমতা দিয়ে কি আর পেটের ক্ষুধা আর নিষ্ঠুর বাস্তবতা ঠেকানো যায়? পেশায় দিনমজুর বাবার সামান্য উপার্জনে যেখানে চারজনের সংসারের দু’বেলা ভাত জোগানোই দুষ্কর, সেখানে প্রতিবন্ধী দুই সন্তানের চিকিৎসা করানো যেনো আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো অলীক স্বপ্ন। অর্থের অভাবে একটা হুইল চেয়ারও কিনতে পারেননি তারা। ফলে, চার দেয়ালের ছোট্ট বন্দিশালাই যেনো দুই কিশোরের পুরো পৃথিবী।
জরাজীর্ণ একটি দোচালা টালির ঘরে বাস পরিবারটির। বর্ষায় ঘরের চালা দিয়ে ঝরে বৃষ্টির পানি, আর ঝড়-তুফানে ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্কে কাটে নির্ঘুম রাত। মানবেতর জীবনের গল্প বলতে গিয়ে ছলছল চোখে বাবা শরিফুজ্জামান মিলন বলেন, দিনমজুরি করে যা আয় করি, তা দিয়ে ঠিকমতো সংসারই চলে না। ছেলেদের চিকিৎসা করানো আমার পক্ষে সম্ভব নয়। একটি বসবাসযোগ্য ঘর পেলে সন্তানদের নিয়ে অন্তত কিছুটা স্বস্তিতে নিঃশ্বাস ফেলতে পারতাম।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পরিবারটির দীর্ঘদিনের এই নীরব হাহাকার আর কষ্ট সহ্য করার মতো নয়। প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানদের প্রতি তাদের আকুল আবেদন—একটু সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিলে এই অসহায় পরিবারটি হয়তো বেঁচে থাকার নতুন আলো পাবে।
এ বিষয়ে কায়বা ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক অশোক কুমার ঘোষ জানান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বরাবর পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করার পর বিষয়টি দ্রুত নজরে নেয় উপজেলা প্রশাসন।
আবেদনের প্রেক্ষিতে উপজেলা পরিষদের বিশেষ বরাদ্দ থেকে ওই দুই প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য দু’টি হুইলচেয়ার বরাদ্দ দেওয়া হয়। ইতিমধ্যেই হুইলচেয়ার দুটি পরিবারটির হাতে বিতরণ করা হয়েছে।
বাবা-মায়ের চোখে আজ কোনো বড় প্রাপ্তির আশা নেই। দীর্ঘ ১৭ বছরের ক্লান্তিকর সময় শেষে তাদের আকুল আকুতি-সন্তানদের জন্য এক চিলতে নিরাপদ মাথার গোঁজার ঠাঁই।