বিশেষ প্রতিনিধি
, যশোর
কৃষক হজরত আলী এবার পাঁচ বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছেন। সাব-ডিলারদের কাছ থেকে খুচরা সার কিনতে গেলে কেজিতে পাঁচ টাকা বেশি দরে কিনতে হচ্ছে। সেকারণে সরের দাম বেশি পড়ছে বলে জানান তিনি।
হজরত আলী প্রায় ২৪ বছর ধরে চাষাবাদ করছেন, তার বাড়ি যশোর সদরের চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের বাগডাঙ্গা গ্রামে। তিনি বলেন, ইউরিয়ার সরকারি দাম ১৩৫০ টাকা হলেও কিনেছি ১৫শ’ থেকে ১৬শ’ টাকা বস্তা। পটাশের দামও বেশি।
সদর উপজেলার চাঁচড়া এলাকার কৃষক আবুল কাশেম বলেন, ‘‘আমার ১৫ বিঘা আমন চাষের জন্যে প্রয়োজন প্রতি দুই বিঘায় এক বস্তা করে ইউরিয়া আর টিএসপি। যেখানে প্রয়োজন সাত বস্তার, কিন্তু পেয়েছি চার বস্তা। বস্তাপ্রতি পাঁচ থেকে ছয়শ’ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। ডিলাররা বলছেন, চাহিদামতো সার তারাও তুলতে পারেননি।”
ঝিকরগাছার নারাঙ্গালী গ্রামের কৃষক আব্দুল আলিম বলেন, “চার বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছি। অনেক কষ্ট করে ঘুরে ঘুরে খোলা বাজার থেকে ৫২ টাকা কেজি দরে ২০ কেজি টিএসপি কিনেছি। আর দেড় হাজার টাকা করে দুই বস্তা ইউরিয়া কিনেছি। ক্ষেতে টিএসপি সার দিতে হবে, কিন্তু পাচ্ছি না।”
মণিরামপুর উপজেলার বেড়েলা গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ শাহিন বলেন, “পাঁচ বিঘা জমিতে আমন চাষ করেছি। সার পেয়েছি কমবেশি। কিন্তু দাম বেশি। প্রতি বস্তা ইউরিয়া ১৬শ’ টাকা, টিএসপি ১৮শ’ টাকা এবং ডিএপি কিনেছি ১৪শ’ টাকা করে।”
সদরের আরবপুর ইউনিয়নের পতেঙ্গালি গ্রামের কয়েকজন কৃষক অভিযোগ করেন, এখন যেসব সার দরকার সেগুলো তারা ঠিকমতো পাচ্ছেন না। যার দরকার দুই বস্তা ইউরিয়া, দুই বস্তা টিএসপি- অনেক ঘুরেফিরে যোগাড় করতে পারছেন এক বস্তা, তাও দাম বেশি দিয়ে। আর সার কিনতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে তাদের। তারা জানায়, ডিএপি সার তো মোটেও মিলছে না সাব-ডিলারদের কাছে। তাদের অভিযোগ, খুচরা সার কিনতে হলে তাদের কেজিপ্রতি পাঁচ টাকা করে বেশি দিতে হচ্ছে।
কৃষকদের দাবি, আগের মতো সার খোলামেলা বিক্রি করুক সরকার। কেননা প্রয়োজন মতো সার দিতে না পারলে, ফলনও ভালো হবে না। একজন কৃষক বললেন, অল্প অল্প সার দিলে আগে যদি বিঘায় ২০ মণ উৎপাদন হতো, তাহলে এবার তা ১২-১৩ মণ সর্বোচ্চ উৎপাদন হতে পারে।
এদিকে, চৌগাছার কয়েকজন কৃষক সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, তারা প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না। বিষয়টি পত্রিকায় প্রকাশিত হলে কৃষি দপ্তরের লোকজন সেইসব কৃষকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে লিখিতভাবে তাদের কাছ থেকে নিয়েছেন যে, তারা চাহিদা অনুযায়ী সার পেয়েছেন। কৃষি বিভাগের লোকজন তাদের বুঝিয়েছেন, তারা যদি এই লিখিত না দেন পরবর্তীতে সার পেতে বিম্বনা হতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চৌগাছা উপজেলা কৃষি অফিসার মোশাব্বির হোসেন যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি যেভাবে বলা হচ্ছে, আসলে তা ঠিক না। আমরা সেইসব কৃষকদের কাছে গেছি, ভাউচার অনুযায়ী তারা যে সার পেয়েছেন, সেটি লিখে নেওয়া হয়েছে। জোরজবরদস্তি নয়, তারা সার পেয়েছেন- সেটিই লিখেছেন।
সার নিয়ে নানা বিভ্রান্তির বিষয়ে একজন ডিলার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘দেশে ৪৪ হাজার খুচরা সার বিক্রেতা ছিল। অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের সময়ে তাদের সেই লাইসেন্স বাতিল করা হয়। আর আমরা যারা ডিলার আছি, তারাও ভয়ে আছি- কখন লাইসেন্স বাতিল হয়। এখন বাজারে আমাদের টাকা পড়ে আছে, আবার সার তুললে বাকি পড়বে। এছাড়া ডিলারশিপ বাতিল হলে বড় ধরনের ধাক্কায় পড়তে হবে।’
সারের কোনো সঙ্কট নেই দাবি করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মো. আবুল হোসেন বলেন, যশোরে সারের কোনো সঙ্কট নেই। হয়তো কোনো কোনো জায়গায় কৃষকরা সাব-ডিলারদের কাছ থেকে সার কিনতে একটু বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি বাঘারপাড়া উপজেলার কয়েকটি স্থানে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেছি, সার ডিলারদের সঙ্গেও কথা বলেছি। তারা নিশ্চিত করেছেন প্রয়োজনীয় সারের সরবরাহ রয়েছে।’
যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে (২০২৬-২৭) যশোরে ইউরিয়া ৬৮ হাজার ৯০৩ মে.টন, টিএসপি ১৭ হাজার ৫৯৮ মেটন, ডিএপি ৪৩ হাজার ২২৫ মে. টন এবং এমওপি ২৫ হাজার ৫১১ মে. টনের চাহিদা দেওয়া হয়েছিল। বরাদ্দও ততটুকুই পাওয়া গেছে।
এদিকে, সম্প্রতি (২ আগস্ট) সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে টিএসপি বিক্রির অভিযোগে অভয়নগর উপজেলার মরিচা বাজারে মেসার্স মাসুদ-মামুন ট্রেডার্সের মালিক মাসুদ মোল্যাকে দশ হাজার টাকা এবং শুভরাড়া বাবুরহাট বাজারের মেসার্স ভাই ভাই কৃষি স্টোরের মালিক রিয়াজ উদ্দীনকে ৫০০ টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। আদালতটি পরিচালনা করেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আশীষ কুমার বসু। এক ৩৫০ টাকা মূল্যের এক বস্তা টিএসপি সার কৃষকদের কাছে দুই হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছিল।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, যশোর কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলায় এবার আমন ধানচাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এক লাখ ৩২ হাজার ৬৯২ হেক্টর জমি।