যশোর, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সম্পাদকীয়

বিভ্রান্তিকর তথ্য নয়, সত্য উদ্ঘাটন হোক অগ্রাধিকার

প্রকাশ : শুক্রবার, ২৮ আগস্ট,২০২৬, ০৯:০০ এ এম
বিভ্রান্তিকর তথ্য নয়, সত্য উদ্ঘাটন হোক অগ্রাধিকার

যশোরের শার্শা উপজেলার সোনামুখী বিলের একটি মাছের খামারে বিপুলসংখ্যক মাছের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল, জেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদনে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মাছের মৃত্যুর সঙ্গে লোডশেডিংয়ের সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। বরং মাছের অতিরিক্ত ঘনত্ব, পানির গুণগত সমস্যা, অপর্যাপ্ত এয়ারেশন এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাকেই মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ঘটনাটি তাই শুধু একটি খামারে মাছ মারা যাওয়ার ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তথ্যের যথার্থতা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের দায়িত্বশীলতা এবং সাংবাদিকতার নৈতিকতার প্রশ্ন।

সুবর্ণভূমিতে প্রকাশিত প্রথম প্রতিবেদনে খামার কর্তৃপক্ষের ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার মাছ মারা যাওয়ার দাবি এবং এর জন্য লোডশেডিংকে দায়ী করার বক্তব্য সামনে আসে। একই সঙ্গে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ও প্রশাসনের ভিন্নমতও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছিল। অর্থাৎ অভিযোগের পাশাপাশি পাল্টা বক্তব্যও ছিল।

তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। খামারটির প্রকৃত আয়তন ৪১ দশমিক ৮২ একর বা ১২৬ বিঘা, যেখানে মাছের ঘনত্ব ছিল খামারের সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি। পানিতে পিএইচের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের আধিক্য এবং অ্যামোনিয়ার মাত্রাও সহনীয় সীমার ওপরে ছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এত বড় জলাশয়ের বিপরীতে মাত্র পাঁচটি দুই হর্সপাওয়ারের এয়ারেটর ব্যবহার করা হচ্ছিল, যেখানে প্রয়োজন ছিল অন্তত ৩০টি। এসব তথ্য মাছ চাষের ব্যবস্থাপনায় গুরুতর ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।

অন্যদিকে, তদন্তে ঘটনার রাতে ৪৪ মিনিট এবং আগের রাতে মোট এক ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। আশপাশের আরও বড় খামারগুলোতে একই সময়ে মাছ মারা না যাওয়ার বিষয়টিও লোডশেডিংকে একমাত্র বা প্রধান কারণ হিসেবে দেখার যুক্তিকে দুর্বল করে।

এখানে সাংবাদিকতার জন্য একটি বড় শিক্ষা রয়েছে। কোনো ঘটনা নিয়ে অভিযোগ উঠলে অভিযোগটি প্রকাশ করা সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বের অংশ। কিন্তু অভিযোগ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়। বিশেষ করে কোটি কোটি টাকার ক্ষতি, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা কিংবা সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দায় আরোপের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ‘একপক্ষ বলেছে’- এটিই সংবাদ হওয়ার শেষ কথা হতে পারে না; সত্য অনুসন্ধান করাই সাংবাদিকতার মূল কাজ।

একই সঙ্গে বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও শেষ সত্য হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ কোনো ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পথ। এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে বিদ্যুৎ, মৎস্য, পুলিশ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি গঠন এবং ঘটনাস্থলে গিয়ে অনুসন্ধান করা ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। বিশেষ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির প্রতিনিধিকে কমিটিতে না রাখার সিদ্ধান্ত তদন্তের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তদন্ত প্রতিবেদনের আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। মাছের মৃত্যু ঘটেছে- এ সত্য অস্বীকার করা হয়নি। অর্থাৎ মূল ক্ষতির ঘটনা বাস্তব; প্রশ্ন ছিল তার কারণ ও ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে। এই পার্থক্যটি সংবাদ পরিবেশনে স্পষ্ট থাকা দরকার। কোনো পক্ষের দাবি ভুল প্রমাণিত হলেই পুরো ঘটনাকে মিথ্যা বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি একটি বাস্তব ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনুমাননির্ভর দায় চাপানোও গ্রহণযোগ্য নয়।

সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে তার তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতার ওপর। ভুল তথ্য প্রকাশ হয়ে গেলে পরবর্তী তদন্তের ফলাফলও সমান গুরুত্বে প্রকাশ করা উচিত। কারণ সংশোধন ও ফলোআপ সংবাদ শুধু দায়মুক্তির বিষয় নয়; এটি পাঠকের প্রতি সংবাদমাধ্যমের জবাবদিহির অংশ।

এই ঘটনার পর সংবাদমাধ্যমের জন্য শিক্ষা আরও স্পষ্ট: দাবি সংবাদ হতে পারে, কিন্তু যাচাই ছাড়া দাবি সত্য হয়ে যায় না। দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতার চেয়ে সত্য উদঘাটনের প্রতিযোগিতাই সাংবাদিকতার জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)