এনবিআরের দুই কর্মীর কাছে প্রশ্নপত্র, বিক্রি ৮-১০ লাখ টাকায়; গ্রেপ্তার ৭
সুবর্ণভূমি ডেস্ক
ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি আসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদের ফোনে। পৌনে দুই ঘণ্টা পর সকাল সোয়া ৬টার দিকে একই প্রশ্নপত্রের স্পষ্ট ছবি পান এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর।
এরপর প্রশ্নের উত্তর তৈরি করে তা ছড়িয়ে দেওয়া হয় চক্রের সদস্যদের কাছে। তাদের মাধ্যমে প্রশ্ন ও উত্তর পৌঁছে যায় সম্ভাব্য পরীক্ষার্থীদের হাতে। এই প্রশ্নপত্র বিক্রি করা হতো আট থেকে দশ লাখ টাকায়।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ফোনের বার্তা আদান-প্রদানের তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পেয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।
গত ১৪ থেকে ১৬ অক্টোবর ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অভিযান চালিয়ে এ ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে এনবিআর, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মচারী রয়েছেন।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ (৩০), কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর (৩৮) ও এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫), প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম (৩৩), পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর রুবেল ইসলাম (৩৩) এবং মফিজুল ইসলাম (২৩) ও হাসিনুর রহমান ওরফে সুজন।
এসআরবি জানায়, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে ১০০ টাকার ১১৬টি ও ৫০ টাকার চারটি স্ট্যাম্প, এক সেট প্রশ্নপত্র, বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ১৯ পাতা, বিভিন্ন ক্যাটাগরির ১০টি সনদ, বিভিন্ন শ্রেণির আরও ১৫টি সনদ, বিভিন্ন ব্যাংকের চেকের ৪৮ পাতা, একটি ব্যাংকের চেকবই, ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র ও চার হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে।
প্রশ্নপত্রের উৎস খুঁজছে এসআরবি
এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক ফায়েজুল আরেফীন বলেন, ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে ২৪২ জন নিয়োগের বাছাই পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল।
এ পরীক্ষায় আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ১৯ হাজার চাকরিপ্রার্থী। বেলা ১১টায় পরীক্ষা শুরুর কথা থাকলেও সকাল ১০টা ৩ মিনিটে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।
ঘটনার পর এসআরবি ছায়া তদন্ত শুরু করে। ১১ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মতিঝিল থানায় মামলা করা হয়।
প্রশ্নপত্রের উৎস, সরবরাহকারী, মধ্যবর্তী বিতরণকারী ও গ্রাহকদের শনাক্ত করতে অনুসন্ধান শুরু করেন গোয়েন্দারা। একপর্যায়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার পর অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর রুবেল ইসলামের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। ভর্তি-বাণিজ্যসংক্রান্ত অর্থ লেনদেনের সময় মতিঝিল এলাকা থেকে তাকে আরও দুজনের সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়।
তাদের মধ্যে মফিজুল ইসলাম একজন চাকরিপ্রার্থী। চক্রের এক সদস্যকে ১৭ লাখ টাকা দিয়ে প্রতারিত হওয়ার পর আরও অর্থ উপার্জনের আশায় তিনি ওই চক্রে যুক্ত হন বলে জানিয়েছে এসআরবি।
তাদের দেওয়া তথ্য ও মুঠোফোনের কথোপকথন বিশ্লেষণ করে পরে উত্তরখান থেকে এনবিআরের কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম এবং মিরপুর-১০ এলাকা থেকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মুঠোফোনের চ্যাটের তথ্যের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার সাভার থেকে নূর মোহাম্মদকে গ্রেপ্তার করে এসআরবি-৪। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে শুক্রবার মোহাম্মদপুর থেকে জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বিভিন্ন শ্রেণির চাকরির প্রশ্ন ফাঁস
এসআরবির ভাষ্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর ভোরে নূর মোহাম্মদ একটি সূত্র থেকে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি পান। পরে জাহাঙ্গীর তাকে একই প্রশ্নপত্রের আরও স্পষ্ট ছবি পাঠান।
নূর মোহাম্মদ প্রশ্নের উত্তর তৈরি করে জাহাঙ্গীর ও তার সহকর্মী ইমদাদুল ইসলামের কাছে পাঠান।
এরপর চক্রের সদস্যদের নিজস্ব প্রার্থী এবং প্রশ্নপত্র বিতরণের কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের কাছে সেগুলো পৌঁছে দেওয়া হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
এ ঘটনায় আসাদুল ইসলাম, রুবেল ইসলাম, মফিজুল ইসলাম ও হাসিনুর রহমান সুজনের সম্পৃক্ততার তথ্যও পেয়েছে এসআরবি।
চক্রের সদস্যরা হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে যোগাযোগ ও লেনদেন করতেন। তাদের পরিচিত প্রার্থীদের কাছে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকায় প্রশ্ন ও উত্তরপত্র বিক্রি করা হতো।
তবে কতজনের কাছে প্রশ্ন বিক্রি করা হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে সে বিষয়ে তারা কিছু জানাননি।
এসআরবির কর্মকর্তারা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা জানিয়েছেন।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা এবং দ্বিতীয় শ্রেণির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হতো।
তবে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নূর মোহাম্মদ ও জাহাঙ্গীর কার কাছ থেকে পেয়েছিলেন, জিজ্ঞাসাবাদে তারা এর সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কেউ এ ঘটনায় জড়িত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ফায়েজুল আরেফীন বলেন, তদন্ত শেষ হলে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে বলা যাবে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় পরীক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে।
অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত ওই কমিটি এখনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি। এর মধ্যে শুক্রবার আবারও সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।