সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ফেসবুক লাইভ ও পোস্টের মাধ্যমে উসকানি ছড়িয়ে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ যুবক ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে।
নিহত শামীমের বড় ভাই আব্দুল জলিল বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে দেবহাটা থানায় হত্যা মামলাটি করেন। মামলায় পারুলিয়া এলাকার ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করে দশজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এ ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে এজাহারভুক্ত ছয় নম্বর আসামি মোক্তার হোসেন এবং অন্য আসামি আসাদুল মোল্লাকে গ্রেপ্তার করেছে।
মামলার এজাহার ও স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার সন্ধ্যায় স্ত্রীর সঙ্গে পারিবারিক বচসায় জড়িয়ে গালিগালাজ করেন মানসিক রোগাক্রান্ত ওয়াহিদুজ্জামান শামীম।
এ সময় স্থানীয় এক ব্যক্তি সেই কথাবার্তার অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। অডিওতে ধর্মের ব্যাপারে কটূক্তি রয়েছে দাবি করে স্থানীয় ফজলুল হক আমিনী ফেসবুক লাইভ করে জনতাকে একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানান।
এরপর উত্তেজিত জনতা শামীমের বসতবাড়ির গেট ভাঙচুর করে তাকে বাজারে এনে মারধর করে। পরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বাড়িতে ফিরে তিনি বিষপান করেন। রাতে স্থানীয় কুলিয়া এলাকার এক গ্রাম্য চিকিৎসকের চেম্বারে নিয়ে তার পাকস্থলী পরিষ্কার (ওয়াশ) করানোর পর তিনি সুস্থ হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে ফজলুল হক আমিনী ও তার অনুসারীরা চিকিৎসাধীন শামীমকে চেম্বার থেকে বের করে আবারও পেটায়।
খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সখীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। তবে এরপরও হামলা থামেনি; আমিনীর নেতৃত্বে এক হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে গিয়ে হামলা চালায় এবং চিকিৎসাধীন শামীমকে দেয়ালে আছাড় মেরে বাইরে এনে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকে। পরবর্তীতে পুলিশ তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের ছোট ভাই জেলা রেফারি অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য তাহসিভ রহমান সাগরের অভিযোগ, এই অডিও প্রথমে স্থানীয় জামায়াত অফিসে নিয়ে শোনানো হয়। এরপর স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর একদল নেতাকর্মী লোক জড়ো করে প্রথম 'মব' সৃষ্টি করেছিল।
তবে এই অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন স্থানীয় জামায়াত নেতা কামরুল ইসলাম গাজী। তিনি বলেন, চিকিৎসকের চেম্বারের পাশে সাধারণ মানুষ উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল। এতে জামায়াতের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না, এলাকাবাসীই সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
একই সঙ্গে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে জড়িয়ে অপপ্রচারের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন দলটির দেবহাটা উপজেলা শাখার সেক্রেটারি এইচ এম এমদাদুল হক। এক প্রতিবাদলিপিতে তিনি উল্লেখ করেন, শামীমের মৃত্যুর ঘটনায় জামায়াতে ইসলামী বা এর কোনো নেতাকর্মীর কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জামায়াতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তিনি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে শামীমের মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং দোষীদের শাস্তির দাবি জানান।
এদিকে মামলার প্রধান অভিযুক্ত ফজলুল হক আমিনী সামাজিক মাধ্যমে লাইভ করে জনতা জড়ো করার কথা স্বীকার করলেও এবং প্রশাসনকে খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ জানালেও পুলিশ এখনও তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, পুলিশ ইতিমধ্যেই দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
তিনি বলেন, প্রধান অভিযুক্ত ফজলুল হক আমিনীসহ অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে একাধিক টিম মাঠে নেমেছে। ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে দ্রুতই বাকিদের আইনের আওতায় আনা হবে।