খুলনা অফিস
খুলনার আন্ডারওয়ার্ল্ডে এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করেছে রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর গ্রুপ। মুম্বাইয়ের মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিমের ‘ডি-কোম্পানি’র আদলে তিনি গড়ে তুলেছেন ‘বি-কোম্পানি’। খুলনা মহানগরীসহ জেলার রূপসা, বটিয়াঘাটা, তেরখাদা ও দিঘলিয়ায় এ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। এছাড়া বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, সাতক্ষীরা এবং নড়াইলেও এ গ্রুপের বিচরণ রয়েছে। খুলনার মানুষের কাছে এখন এক আতঙ্কের নাম গ্যাংস্টার গ্রেনেড বাবু।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি এবং কন্টাক্ট কিলিং বা চুক্তিতে হত্যাকাণ্ড বি-কোম্পানির আয়ের প্রধান উৎস। ইদানীং টেন্ডারবাজি এবং জমি দখলেও তাদের সম্পৃক্ততা দেখা যাচ্ছে। এসব এলাকার মাদক ব্যবসার একক নিয়ন্ত্রক তারা। এই চক্রের কাজে বাধা দিলেই চালানো হয় গুলি। গত দুই বছরে এ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে শতাধিক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর স্থানীয় প্রশাসনের একটি অংশের ছত্রছায়ায় বি-কোম্পানি আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে এবং একের পর এক হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
দাপুটে এই গ্যাংপ্রধান রনি চৌধুরীকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। পুলিশের ধারণা, তিনি বিদেশ থেকে এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠী পরিচালনা করছেন।
তবে অনেকের মতে, গ্রেনেড বাবু দেশের ভেতরেই আত্মগোপনে আছেন। তিনি নিজেকে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক দাবি করলেও তার নিকটাত্মীয়রা, যারা দলটির বিভিন্ন পদে রয়েছেন, তারা দীর্ঘদিন বাবুর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত শতাধিক ক্যাডার রয়েছে বি-কোম্পানির। ফিল্মি কায়দায় মোটরসাইকেল বহর নিয়ে গুলি চালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে তারা আবার নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বি-কোম্পানির সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে পরিচিত তাওহিদুল ইসলাম তুহিন ওরফে কালা তুহিন (৩৫)। এছাড়া শামীম সরদার ওরফে ডিকে শামীম, সৌরভ গাজী, মিরাজ ওরফে কাউয়া মিরাজ, সাদ্দাম, সাহেল ওরফে সোহেল, কসাই লিটন, মো. শাকিল, সাব্বির শেখ, আসাদুজ্জামান রাজু ওরফে বিল রাজু এবং বিকুল বিভিন্ন এলাকায় গ্রুপ লিডার হিসেবে কাজ করেন। তাদের অধীনে ডালিম, রাজু মোড়ল, মিঠু, টুন্ডা শামীম, মাসুম, আল আমিন, তুষার শিকদার, আসিফ, আবরার ফয়সাল রাফিন, দিন ইসলাম ওরফে দিনু, হাসিব হাওলাদার, আবিদ হাসান ওরফে আবুজার, রাসেল, ইমন মোল্লা, সজল আকন, শেখ আসাদুজ্জামান মিথুন, হাবিব শেখ (৩২), এম মিজানুর রহমান সুজন (৪৫), সাজ্জাদ, সাইদুর ওরফে সাইদুল, ইয়াসিন আরাফাত, কামাল, সুমন হাওলাদার, রানা ও নয়নসহ আরও অনেক সন্ত্রাসী এসব গ্রুপে কাজ করছে। এদের প্রত্যেকের নামেই একাধিক মামলা রয়েছে।
২০২৩ সালের ২৭ মার্চ জাহাঙ্গীর হোসেন কচি হত্যা মামলায় রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন খুলনার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক এস এম আশিকুর রহমান। ২০১০ সালের ২ নভেম্বর গ্রেনেড বাবু পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলেও জামিনে মুক্তি পেয়ে গা ঢাকা দেন।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখার উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, খুলনা মহানগরীতে কোনো অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ বা মাদক কারবারিকে ছাড় দেওয়া হবে না। নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তবে পুলিশ কমিশনারের এই আশ্বাস সত্ত্বেও খুলনায় একের পর এক খুন-খারাবির ঘটনা ঘটছে। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও গুলি চালানোর খবর পাওয়া যায়। এতে কেউ নিহত, কেউ আহত হচ্ছেন। কিন্তু অভিযুক্তরা ধরা পড়েন কমই।