শাহারুল ইসলাম ফারদিন
, যশোর
শীত আসার আগেই খেজুরগাছের ডালপালা পরিষ্কার করছেন আব্দুল আলিম। কোথাও গাছের মাথা ছেঁটে রস নামানোর উপযোগী করা হচ্ছে, কোথাও প্রস্তুত করা হচ্ছে পুরনো গাছ। কয়েক দিনের মধ্যে গাছে গাছে ঝুলবে মাটির হাঁড়ি। ভোরে সেই হাঁড়িতে জমবে মিষ্টি রস। এরপর বাড়ির উঠানে চুলায় জ্বাল দিয়ে তৈরি হবে গুড়-পাটালি। চৌগাছার এই গাছির কাছে শীত মানে শুধু ঋতু পরিবর্তন নয়, বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপার্জনের সময়।
গত মৌসুমে ১১৭টি খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় ও পাটালি তৈরি করেছিলেন আলিম। মান ভালো হওয়ায় ক্রেতাদের কাছ থেকে অর্ডারও পেয়েছিলেন। সব মিলিয়ে বিক্রি করেছিলেন প্রায় ৯০ হাজার টাকার গুড়-পাটালি। এবারও একই প্রত্যাশা নিয়ে গাছ প্রস্তুত করছেন তিনি। তবে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানেন, শুধু গাছ থাকলেই এই পেশা টিকিয়ে রাখা যায় না। দরকার দক্ষ গাছি, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম এবং খাঁটি গুড়ের বাজার নিশ্চিত করা।
আব্দুল আলিমের মতো যশোরের হাজারো গাছির কাছে খেজুরের রস ও গুড় শীতকালীন আয়ের অন্যতম ভরসা। জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এই শিল্পের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কয়েক মাসের উৎপাদন ও বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন গাছি পরিবার, জ্বালানি সরবরাহকারী, হাঁড়ি (ঠিলে) প্রস্তুতকারক, ব্যবসায়ী ও পরিবহনের সাথে যুক্ত মানুষ।
কিন্তু ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের সম্ভাবনার পাশাপাশি বাড়ছে নানা সংকট।
চৌগাছা উপজেলার চাকলা গ্রামের আবদুল কুদ্দুসের কাছে খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির কাজ নতুন কিছু নয়। তার দাদা হবিবুর মণ্ডল এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে তার বাবাও একই
কাজ করেছেন। পারিবারিক পুরনো পেশা ধরে রাখতে এখন নিজেই রস সংগ্রহ ও গুড়-পাটালি তৈরিতে যুক্ত হয়েছেন কুদ্দুস। তার মতো কেউ কেউ পেশা ধরে রাখলেও নতুন প্রজন্মের বড় একটি অংশ এই শ্রমসাধ্য কাজে আগ্রহী নয়। শীতের ভোরে গাছে ওঠা, নিয়মিত গাছ পরিচর্যা, রস সংগ্রহ এবং দীর্ঘ সময় চুলায় রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করা সহজ কাজ নয়।
অন্যদিকে, বছরের কয়েক মাসের আয় দিয়ে পরবর্তী সময়ের সংসার চালানোর হিসাবও রয়েছে। ফলে অভিজ্ঞ গাছিরা এই কাজে অনুপযুক্ত হয়ে পড়লেও তাদের জায়গায় পর্যাপ্ত নতুন গাছি তৈরি হচ্ছে না। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
যশোরের খেজুরের গুড়ের সুনাম দেশজুড়ে। ‘যশোরের যশ, খেজুরের রস’ প্রবাদটি এঅঞ্চলের সঙ্গে পণ্যটির সম্পর্কের কথাই মনে করিয়ে দেয়। সম্প্রতি ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ায় যশোরের খেজুরের গুড়ের পরিচিতি ও বাজার সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, যশোরে রস আহরণের উপযোগী খেজুরগাছের সংখ্যা তিন লাখ ১২ হাজার ৯৬১টি। এসব গাছ থেকে চলতি মৌসুমে তিন কোটি ৮৮ লাখ ছয় হাজার ৫৬৫ লিটার রস সংগ্রহ এবং তিন হাজার ৯০ মেট্রিক টন গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
যশোরে উৎপাদিত গুড়ের বড় অংশ স্থানীয় হাটবাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়। শীতকালে শহরের বাসাবাড়ি, মিষ্টি তৈরির প্রতিষ্ঠান ও পিঠার দোকানে খেজুরের গুড়ের চাহিদা বাড়ে। অনলাইনভিত্তিক ব্যবসার মাধ্যমেও অনেক উদ্যোক্তা সরাসরি ক্রেতার কাছে গুড় ও পাটালি পৌঁছে দিচ্ছেন। এতে প্রচলিত বাজারের বাইরে নতুন ক্রেতা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গুড়-পাটালি উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী হলেও বাজারের প্রতিযোগিতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে জেলার অন্যতম বাণিজ্যিক খেজুর বাগানের মালিক মামুন কাউছারের। তার মতে, খাঁটি গুড় তৈরিতে যে পরিমাণ রস, শ্রম ও জ্বালানি প্রয়োজন, তাতে উৎপাদন খরচ অনেক বেশি পড়ে। অথচ বাজারে তুলনামূলক কম দামে গুড় পাওয়া যায়। এসব গুড়ের প্রকৃত উপাদান ও মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মামুন কাউছার বলেন, এক কেজি গুড় তৈরি করতে প্রায় দশ লিটার রস প্রয়োজন হয়। উৎপাদনের বিভিন্ন খরচ বিবেচনায় খাঁটি গুড়ের বাণিজ্যিক ব্যয় অনেক বেশি। গত মৌসুমে তিনি প্রতি কেজি গুড় সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা দরে বিক্রি করেছেন। অথচ বাজারে ২৫০ টাকা কেজি দরেও গুড় পাওয়া যায়। তার মতে, দামের এতো পার্থক্যের কারণ বুঝতে হবে ক্রেতাদের। কেনার আগে অবশ্যই তা ‘খাঁটি গুড়’ কি না, যাচাই করে দেখা জরুরি।
মামুন কাউছার আরও বলেন, খেজুরগাছের বাগান সম্প্রসারণে সরকারি উদ্যোগ ও সহায়তা প্রয়োজন। প্রদর্শনী প্লট, আধুনিক উৎপাদনপ্রযুক্তি এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় সহায়তা পাওয়া গেলে এই শিল্প আরও এগিয়ে যেতে পারে। তার দাবি, খেজুরের গুড় রপ্তানির ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় সুযোগ ও অনুমোদনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। বাজারে ভেজাল গুড়ের অভিযোগ শুধু ক্রেতাদের জন্যই উদ্বেগের নয়, খাঁটি গুড় উৎপাদনকারীদের জন্যও বড় সমস্যা। কম দামের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে প্রকৃত উৎপাদকরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হলে এই পেশায় আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষি বিভাগের মতে, গাছিদের জন্য আধুনিক ও নিরাপদ গাছে ওঠার সরঞ্জাম, রস সংগ্রহের পরিচ্ছন্ন পদ্ধতি, উন্নত চুলা এবং গুড় তৈরির প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। নিরাপদ রস উৎপাদন নিশ্চিত করতে নিপাহ ভাইরাসের ঝুঁকি সম্পর্কেও গাছি ও ক্রেতাদের সচেতন করা জরুরি। খেজুরের কাঁচা রস বাদুড়ের মাধ্যমে নিপাহ ভাইরাসে দূষিত হতে পারে। তাই কাঁচা রস পান না করা এবং নিরাপদভাবে রস সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো দরকার।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, যশোরের খেজুরের গুড়ের ঐতিহ্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও রয়েছে। জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। নিরাপদ খেজুরের রস ও গুড় উৎপাদনে গাছিদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণ ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমেও তাদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। তবে গাছিদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।