রাসেল মাহমুদ
, যশোর
একসময় ঘন জঙ্গলে ঢাকা জনমানবহীন এক উঁচু ঢিবি। স্থানীয় মানুষের কাছে স্থানটি ছিল রহস্যময়। জিন-পরীর বিচরণ, সাধক দমদম পীরের অলৌকিক ক্ষমতা কিংবা ঢিবির ওপর দিয়ে হাঁটলে পায়ের নিচে ‘দমদম’ শব্দ শোনার গল্প ছড়িয়ে ছিল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। লোকবিশ্বাসের আড়ালে চাপা পড়ে থাকা সেই ঢিবির মাটির নিচেই যে লুকিয়ে আছে প্রাচীন স্থাপত্য ও জনবসতির ইতিহাস, তা জানা যায় প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে।
যশোরের মণিরামপুর উপজেলার ভোজগাতি ইউনিয়নের দোনার গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক এই স্থানটির নাম ‘দমদম পীরের ঢিবি’। স্থানীয় লোককথা, অলৌকিক বিশ্বাস আর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন—সব মিলিয়ে স্থানটি ধারণ করে আছে অতীতের এক বিস্মৃত অধ্যায়ের স্মৃতি। খননে পাওয়া স্থাপত্য ও প্রত্নবস্তু প্রাচীন বাংলার জৈন, বৌদ্ধ ও হিন্দু সংস্কৃতির ধারাবাহিক উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।
লোককথার আড়ালে ইতিহাসের সন্ধান
দমদম পীরের ঢিবিকে ঘিরে স্থানীয় প্রবীণদের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে নানা কাহিনি। একসময় এলাকাটি ছিল ঘন জঙ্গলে ঘেরা। জনসাধারণের চলাচলও ছিল সীমিত। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ঢিবির ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পায়ের নিচে ‘দমদম’ শব্দ অনুভূত হতো। সেই শব্দ থেকেই কালক্রমে স্থানটির নাম হয় ‘দমদম পীরের ঢিবি’।
ঢিবির পাশেই রয়েছে কুমারী দিঘি ও একটি রহস্যময় পুকুর। এসব জলাশয় ও গাছপালাকে ঘিরেও প্রচলিত ছিল নানা লোকবিশ্বাস। মানত করতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসতেন বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। ফলে জায়গাটি একদিকে যেমন লোকবিশ্বাসের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল, অন্যদিকে তেমনি আড়ালে থেকে গিয়েছিল এর প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব।
মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসে প্রাচীন স্থাপত্য
স্থানীয় বাসিন্দা লুৎফর মোল্লাসহ প্রবীণদের সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৬ সালের দিকে ঢিবিসংলগ্ন জমিতে মাটি কাটার সময় প্রথম ইটের গাঁথুনি চোখে পড়ে। এই আবিষ্কার প্রাচীন স্থাপনার অস্তিত্ব সম্পর্কে কৌতূহল তৈরি করে।
পরবর্তী সময়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সেখানে খননকাজ শুরু করে। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, ২০০৪-২০০৫ সাল থেকে শুরু হয়ে ২০০৬-২০০৭ সময়কালেও খনন কার্যক্রম চলে। খননের ফলে মাটির স্তরের নিচ থেকে বেরিয়ে আসে একের পর এক প্রাচীন স্থাপত্য ও প্রত্নবস্তু।
উন্মোচিত হয় ছাদবিহীন ১৮টি পূর্ণাঙ্গ কক্ষ। পাওয়া যায় পোড়ামাটির অলংকৃত ফলক, পদ্মপাপড়ির নকশা খচিত বিশেষ ধরনের ইট, প্রাচীন মৃৎপাত্র, ধাতব গহনা এবং বৌদ্ধ দেব-দেবীর ছোট ছোট ভাস্কর্য। এসব নিদর্শন স্থানটির ঐতিহাসিক গুরুত্বকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে আসে।
একসময় যে ঢিবিকে ঘিরে মানুষের মনে জন্ম নিয়েছিল নানা অলৌকিক ধারণা, প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মধ্য দিয়ে সেই স্থানই হয়ে ওঠে অতীতের স্থাপত্য ও সংস্কৃতির পরিচয় অনুসন্ধানের ক্ষেত্র।
জৈন, বৌদ্ধ ও হিন্দু সংস্কৃতির ছাপ
দমদম পীরের ঢিবির গুরুত্ব কেবল প্রাচীন ইটের স্থাপনা কিংবা প্রত্নবস্তুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, এখানকার নিদর্শনে জৈন, বৌদ্ধ ও হিন্দু সংস্কৃতির ধারাবাহিক ছাপ রয়েছে। নকশাদার ইট, মৃৎপাত্র ও অন্যান্য প্রত্নবস্তু পর্যালোচনা করে গবেষকদের ধারণা, খ্রিস্টীয় অষ্টম থেকে দশম শতকে, কিংবা তারও আগে, এখানে উন্নত কোনো ধর্মীয় ও প্রশাসনিক অবকাঠামো গড়ে উঠেছিল।
খননে পাওয়া বৌদ্ধ দেব-দেবীর ক্ষুদ্র ভাস্কর্যসহ অন্যান্য নিদর্শন অতীতের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এসব নিদর্শনের ভিত্তিতে স্থাপনাটির সুনির্দিষ্ট পরিচয়, নির্মাণকাল কিংবা বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপস্থিতির পর্যায়ক্রম নির্ধারণে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে নদীবিধৌত বদ্বীপ অঞ্চলের জনবসতি, ধর্মীয় চর্চা ও স্থাপত্যের বিকাশ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দমদম পীরের ঢিবির প্রত্নবস্তু সেই ইতিহাস অনুসন্ধানের একটি উল্লেখযোগ্য সূত্র। এর মাধ্যমে মণিরামপুর অঞ্চলের অতীত জনবসতি ও সাংস্কৃতিক বিকাশ সম্পর্কে নতুন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্ব
বর্তমানে দমদম পীরের ঢিবি সরকার ঘোষিত সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হিসেবে পরিচিত। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণ, সেগুলোর যথাযথ পরিচিতি তুলে ধরা এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে স্থানটির গুরুত্ব রয়েছে।
তবে শুধু খননের মাধ্যমে মাটির নিচ থেকে নিদর্শন বের করে আনাই যথেষ্ট নয়; সেগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ, গবেষণা এবং ইতিহাসভিত্তিক তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াও জরুরি। স্থানীয় লোককথা ও প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যের পার্থক্য স্পষ্ট রেখে স্থানটির ইতিহাস তুলে ধরা গেলে নতুন প্রজন্মের কাছে এর গুরুত্ব আরও অর্থবহ হয়ে উঠবে।
একসময় যে ঢিবি ছিল রহস্য আর অলৌকিক বিশ্বাসের আবরণে ঢাকা, প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান তার সামনে খুলে দিয়েছে অতীতের এক নতুন জানালা। মণিরামপুরের দমদম পীরের ঢিবি তাই কেবল একটি প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ নয়; এটি এ অঞ্চলের সুদূর অতীত, ধর্মীয় সংস্কৃতির বৈচিত্র্য এবং হারিয়ে যাওয়া জনবসতির ইতিহাস অনুসন্ধানের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। মাটির গভীরে চাপা পড়ে থাকা সেই ইতিহাসকে যথাযথভাবে জানা ও সংরক্ষণ করাই এখন সময়ের দাবি।