মামুন-উর-রশিদ সাজু
জাতীয় ফুল শাপলা দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি এর কাণ্ড সবজি হিসেবেও খাওয়া হয়। কেউ শখের বশে খায়, আবার কেউ খায় অভাবের তাড়নায়। অভাবগ্রস্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ বর্ষা মৌসুমে বিল থেকে শাপলা তুলে ভাজি, চচ্চড়ি বা ভর্তা বানিয়ে আহার করেন। অন্যদিকে, শহুরে মধ্যবিত্ত শখের বশে এই মৌসুমে দু-চার দিন সবজি হিসেবে শাপলা খেয়ে থাকেন।
ভবদহকে ‘যশোরের দুঃখ’ বলা হয়। যশোরের মণিরামপুর, কেশবপুর, অভয়নগর ও সদর উপজেলা ছাড়াও খুলনার ডুমুরিয়া এবং সাতক্ষীরার তালা ভবদহ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এই এলাকা বছরের একটি বড় সময় জলাবদ্ধ থাকে। পাকিস্তান ওয়াপদার অপরিণামদর্শী প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বাংলাদেশ আমলে পানি উন্নয়ন বোর্ড তা বহাল রাখায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
যেহেতু ভবদহ এলাকায় স্বাভাবিক ফসল ফলানো সম্ভব হয় না, তাই বিকল্প হিসেবে মাছ চাষ ও বিল থেকে নানা জলজ উদ্ভিদ সংগ্রহ করে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ ও তা বাজারে বিক্রির মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক মানুষ জীবনধারণ করছেন। বর্ষা মৌসুমে বিলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো শাপলা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন এলাকাটির বহু মানুষ। তাদের মধ্যে রয়েছে মণিরামপুর উপজেলার নিম্ন আয়ের শত শত পরিবার। যশোর শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে এখন হরহামেশাই মিলছে শাপলা বিক্রির দৃশ্য।
ঢাকুরিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ও হাট-বাজারে ভ্যানগাড়িতে করে শাপলা বিক্রি করেন আসলাম শেখ। সুবলকাটি ডুমুর বিল ও সম্বলডাঙ্গা বিল থেকে প্রতিদিন ভোররাতে শাপলা তুলে উপজেলার বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করে তিনি জীবন-জীবিকা চালাচ্ছেন।
উপজেলার ভোমরদহ গ্রামের বাসিন্দা আসলাম শেখ জানান, প্রতিদিন তিনি ৫০ থেকে ৬০ মুঠো (দশ পিস শাপলায় এক মুঠো) শাপলা সংগ্রহ করেন। প্রতি মুঠো দশ টাকা দরে বিক্রি হয়। দৈনিক বিল থেকে শাপলা সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করে তার ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় হয়।
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘বর্ষার পানিতে আমাদের ধানের জমি তলিয়ে গিয়ে ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। ভবদহ অঞ্চলের মানুষ বড্ড কষ্টে আছে। ভবদহের জলবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হলে আমাদের এই দুঃখ-দুর্দশার শেষ হবে না। আমরা এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি চাই।’
একই কাহিনি হাজরাইল গ্রামের পরিমল দাসেরও। তিনি বলেন, ‘পানিতে আমাদের মাঠ তলিয়ে গেছে, আমরা কষ্টে আছি। এখন আমাদের পেশাই হয়ে দাঁড়িয়েছে শাপলা তুলে বিক্রি করা। এক আঁটিতে ১০-১২টি শাপলা বেঁধে যশোর শহরে এনে বিক্রি করি। ১০ টাকা করে আঁটি বিক্রি করে যা পাই, তা দিয়েই সংসার আর ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালাচ্ছি। আমাদের এলাকার বহু লোক এখন শাপলা সংগ্রহ ও বিক্রি করে বেঁচে আছে।’
আরেক শাপলা বিক্রেতা আক্তার হোসেন জানান, তিনি বিল থেকে শাপলা তুলে পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায় আঁটি বাঁধেন। এরপর বিভিন্ন বাজারে গিয়ে দোকানিদের কাছে প্রতি আঁটি ৫-৬ টাকা পাইকারি দরে বিক্রি করেন। এতে দিনে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা উপার্জন হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘বিলে পানি জমে থাকার কারণে মাঠে কেউ ধানের আবাদ করতে পারেনি। চরম কষ্টের মধ্য দিয়ে আমাদের সংসার চালাতে হচ্ছে। মাঠে ধান না হওয়ায় আমার মতো শত শত মানুষ এখন শাপলা বিক্রি করেই জীবন ধারণ করছে।’
শাপলার ক্রেতা আমেনা খাতুন বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। বাজারে বর্তমানে সবজির অনেক দাম। এতো দাম দিয়ে পছন্দের শাপলা কেনা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। অন্য সময় আশেপাশের শাকপাতা তুলেই রান্না করে দিন চালিয়ে নিই। এখন এলাকায় শাপলা বিক্রি করতে লোক আসে। তাদের কাছ থেকে শাপলা কিনে রান্না করে খাই। খেতে ভালো, আবার দামও সস্তা। মাত্র দশ টাকায় এক আঁটি শাপলা পাওয়া যায়।’