মসলা
জিয়াউদ্দিন সাইমুম
, ঢাকা
লবঙ্গ এক প্রকারের মসলা। লবঙ্গ গাছের ফুলের কুঁড়িকে শুকিয়ে লবঙ্গ মসলা তৈরি করা হয়। খাদ্যদ্রব্যে মসলা হিসাবে এটি ব্যবহার করা হয়। লবঙ্গের আদি নিবাস ইন্দোনেশিয়ায়। তবে বর্তমানে মসলাটি পৃথিবীর সব জায়গায় ব্যবহৃত হয়। আর জাঞ্জিবার, ইন্দোনেশিয়া, মাদাগাস্কার ও তাঞ্জানিয়ায় ব্যাপক ভিত্তিতে লবঙ্গ চাষ করা হয়। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায়ও লবঙ্গের চাষ হচ্ছে।
জাতিসংঘের খাদ্যবিষয়ক সংস্থা ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশনের (ফাও) এক উপাত্ত অনুসারে ইন্দোনেশিয়ায় পৃথিবীর ৮০ শতাংশ লবঙ্গ উৎপাদিত হয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে মাদাগাস্কার ও তাঞ্জানিয়া।
লবঙ্গকে আস্ত অথবা গুঁড়ো অবস্থায় রান্নায় ব্যবহার করা হয়। এর গন্ধ কড়া বলে অল্প পরিমাণে দিলেই চলে। ইন্দোনেশিয়াতে ‘ক্রেটেক’ নামের সিগারেটে সুগন্ধি হিসেবে লবঙ্গ ব্যবহার করা হয়। চীনা ও জাপানিরা ধূপ হিসেবে লবঙ্গ ব্যবহার করে।
ভারতীয় উপমহাদেশের খাদ্যে দীর্ঘকাল ধরে লবঙ্গ ব্যবহার হয়ে আসছে। মেক্সিকোর খাদ্যেও এর ব্যবহার রয়েছে। এসব এলাকায় জিরা ও দারুচিনির সঙ্গে লবঙ্গকে ব্যবহার করা হয়।
লবঙ্গের সুগন্ধের মূল কারণ ‘ইউজেনল’ নামে যৌগ। এটি লবঙ্গ থেকে পাওয়া তেলের মূল উপাদান। এই যৌগটির জীবাণুনাশক ও বেদনানাশক গুণ রয়েছে। লবঙ্গ তেলের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো অ্যাসিটাইল ইউজেনল, বেটা-ক্যারোফাইলিন, ভ্যানিলিন, ক্র্যাটেগলিক অ্যাসিড, ট্যানিন, গ্যালোট্যানিক অ্যাসিড, মিথাইল স্যালিসাইলেট, ফ্ল্যাভানয়েড, ইউজেনিন, র্যাম্নেটিন, ট্রি-টেরপেনয়েড, ক্লিনোলিক অ্যাসিড, স্টিগমাস্টেরল, সেস্কুইটার্পিন।
লবঙ্গ খুবই ঝাঁঝালো, উপাদেয়, ঘ্রাণময় একটি মসলা। এর রয়েছে পর্যাপ্ত পুষ্টিগুণ। সাধারণত রান্নার সময় এই মসলাটি ফোড়ন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শুধু মসলা নয়, ওষুধ হিসেবেও লবঙ্গের বেশ গুরুত্ব আছে। এতে ২০-২৫ শতাংশ ক্লোভ তেল এবং ১০-১৫ শতাংশ টাইটারপেনিক অ্যাসিড থাকে, যার ফলে এটা খেতে ঝাঁঝালো।
মার্চ থেকে জুন মাসের ভেতরে লবঙ্গের ফুল থেকে ফল হয়। পাকার আগেই বৃতিসহ ফুলের কুঁড়ি সংগ্রহ করা হয়। আর তা রোদে শুকিয়ে আমাদের পরিচিত লবঙ্গ তৈরি হয়।
লবঙ্গ গাছ ৩০ থেকে ৪০ ফুট উঁচু হতে পারে। চিরসবুজ, বহুসংখ্যক নরম ও নিম্নগামী ডাল চারদিক ছড়িয়ে পড়ে। ছাল ধূসর বর্ণ ও মসৃণ। পাতা সরল ও বিপরীত। উপবৃত্তাকার, পাঁচ ইঞ্চির মতো লম্বা। কচি পাতা লালচে। ফল মাংসল, প্রায় এক ইঞ্চি লম্বা।
বলা হয়, লবঙ্গ কফ ও কাশি দূর করে। খিদে বাড়ায়, রুচির পরিবর্তন আনে। এটা কৃমি জাতীয় রোগ প্রতিরোধ করে। এটা পচনরোধক। জানা যায়, এটা শরীরে উদ্দীপক হিসাবে কাজ করে। গলার সংক্রমণরোধক হিসাবেও এটার ভূমিকা রয়েছে। দাঁতের ব্যথা নিরাময়েও এটা কার্যকর বলে শোনা যায়। লবঙ্গ বমিভাব কমাতে পারে।
প্রাচীন মিসরে মমি তৈরির সময় যেসব জীবাণুনাশক উপাদান ব্যবহার করা হতো, তার মধ্যে একটি উপকরণ ছিল লবঙ্গের গুঁড়ো। প্রাচীন ভারতে চরকসংহিতায় লবঙ্গের ভেষজ গুণাবলির ভূয়সী প্রশংসা রয়েছে।
মার্কোপলো লবঙ্গের সুখ্যাতি ও সেই সঙ্গে এটি ইউরোপে প্রবর্তন করেছিলেন ১৩ শতকে। তখন ইউরোপে লবঙ্গের ব্যবসা ছিল অত্যন্ত লাভজনক। পর্তুগিজ, ওলন্দাজ ও ফরাসিদের মধ্যে লবঙ্গের ব্যবসা নিয়ে ভীষণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়। এটা নিয়ে বেশ কটি যুদ্ধও হয়েছিল তাদের মধ্যে।
চীনের ভেষজ তালিকায় লবঙ্গ সুগন্ধি দ্রব্য হিসেবে পরিচিত। চীনা খাবারে লবঙ্গের ব্যবহার হয় না। তবে ভেষজ হিসেবে, দাঁতের ব্যথা ও পেটের অসুখে এটার ব্যবহার প্রচলিত।
ইন্দোনেশিয়ার বেকান, মেকিয়ান, মুটি, টার্নেট দ্বীপে সবচেয়ে বেশি লবঙ্গ জন্মায়। এগুলো মেলুকু দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত। এই মেলুকু দ্বীপপুঞ্জ, জাঞ্জিবার, ক্যারিবিয়ান দ্বীপ আর গ্রানাডা মূলত মসলা দ্বীপ নামে পরিচিত।
উইকিপিডিয়ার এক তথ্যে দেখা যায়, প্রত্নতাত্ত্বিক খননে সিরিয়ায় একটি সিরামিকের পাত্রে লবঙ্গ পাওয়া যায়। পাত্রটি যিশুখ্রিস্টের জšে§রও ১৭২১ বছর আগের তৈরি। বোঝা যাচ্ছে এশিয়া আর ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের লবঙ্গের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের পরিচয় ঘটে অনেক আগেই।
ইতিহাসে পাওয়া যায়, রোমান সাম্রাজ্যে জায়ফল আর মরিচের পাশাপাশি লবঙ্গের কদর ছিল আকাশছোঁয়া। ইতিহাসবিদ ও বিজ্ঞানী প্লিনি দ্য এলডারের একটি বিখ্যাত অনুযোগ হচ্ছে, ‘এমন কোনো বছর নেই, যেই বছর ভারতবর্ষ রোমান সাম্রাজ্যে ৫০ মিলিয়ন লবঙ্গ ঢেলে দিচ্ছে না’।
এতেও প্রমাণিত হয়, ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যে আরবদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অনেক আগেই ইউরোপবাসী লবঙ্গের স্বাদ পেয়েছে। পরে মসলা বাণিজ্যের হাল ধরে উপনিবেশবাদী ইউরোপিয়ানরা। তবে এই কর্তৃত্ব সব সময় এক জাতির হাতে থাকেনি। পর্যায়ক্রমে এই বাণিজ্যের হাতবদল হয়। পর্তুগিজ, স্পেনিশ, ডাচ, ফ্রেঞ্চ আর ইংরেজরা দৃশ্যপটে চলে আসে।
ইউরোপের শীতপ্রধান দেশগুলোতে দীর্ঘদিন মাংস সংরক্ষণ করা সম্ভব হলেও এক ধরনের বাজে গন্ধ সৃষ্টি হয়। এশিয়ান মসলা এই গন্ধ ঢেকে দিতে পারে। আবার রান্না করা মাংসে লবঙ্গ, জায়ফল, দারুচিনি আর এলাচ দিলে মুখেও রুচি বাড়ে। এই কারণে মসলা ছিল সোনার মতো দামি। বৈশ্বিক লাভও ছিল মসলা যুদ্ধের একটি কারণ।
পয়মন্ত এই মসলাটির কথা ইবনে বতুতা তার ভ্রমণকাহিনিতে লিখেছেন। আরব্য উপন্যাসেও মসলাটি ঠাঁই করে নিয়েছে। ইতিহাসে রয়েছে, লবঙ্গবাণিজ্যে নিজেদের প্রাধান্য ধরে রাখতে সবচেয়ে বেশি হীন কৌশল অবলম্বন করেছিল ডাচরা। তারা তাদের আয়ত্তের বাইরের লবঙ্গ গাছগুলো পুড়িয়ে ফেলতো ছলে-বলে-কৌশলে।
লবঙ্গ গাছ লাগানো ও অর্ধ পাকা অবস্থায় লবঙ্গ ফুল তোলাকালে এখনো ইন্দোনেশিয়ানরা কিছু সামাজিক রীতিনীতি মেনে চলে। এক সময় তারা সন্তান জš§ নিলেই একটি লবঙ্গ গাছ লাগাতো।
যিশুখ্রিস্টের জšে§রও তিনশ’ বছর আগে চীনের হান রাজবংশের শাসনামলে রচিত এক সাহিত্যকর্মে লবঙ্গকে ‘চিকেন-টাঙ স্পাইস’ বা মুরগির ছানার জিহবা আকৃতির মসলা বলা হয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ চারটি মসলার মাঝে লবঙ্গ অন্যতম। বাকি তিনটি মসলা হচ্ছে দারুচিনি, জায়ফল ও মরিচ।
বায়ুরোধী পাত্রে দীর্ঘদিন লবঙ্গ সংরক্ষণ করা যায়। কিন্তু গুঁড়ো লবঙ্গ শিগগির গন্ধ হারায়, এটার ওষধি গুণও কমে যায়।
লবঙ্গে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যালসিয়াম, হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড, আয়রন, ফসফরাস, সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ভিটামিন এ ও ভিটামিন সি।
লবঙ্গ দিয়ে ইন্দোনেশিয়ানরা এক ধরনের সিগারেট বানায়। এটার মাধ্যমে তারা একটি ভুল সাংস্কৃতিক প্রপঞ্চ তৈরি করে নিয়েছে। আর তা হচ্ছে ‘এই সিগারেটের ওষধি গুণ রয়েছে। এতে নেই কোনো ক্ষতিকর দিক।’ আসলে সাধারণ সিগারেটের মতো এটাও ক্ষতিকর।