শাহারুল ইসলাম ফারদিন
, যশোর
শুক্রবার সকাল হতেই শহরের হাজি মুহম্মদ মহসিন (এইচএমএম) রোডের ফুটপাতের চিত্র বদলে যায়। অন্যদিন পথচারী আর যানবাহনের চাপ, শুক্রবার সেখানে পসরা সাজিয়ে বসেন বিভিন্ন এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। কারও সামনে জুতা, কারও কাছে শার্ট-প্যান্ট, কোথাও শাড়ি-থ্রিপিস, আবার কোথাও শিশুদের বই-খাতা, মশারি, পর্দা, প্রসাধনী কিংবা ঘরের প্রয়োজনীয় নানা পণ্য।
দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে ক্রেতার ভিড়। বড় মার্কেটের ঝকঝকে দোকান কিংবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিপণিবিতান নয়, খোলা আকাশের নিচে ফুটপাতেই পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে আসেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।
এই বাজারের মূল আকর্ষণ পণ্যের দাম। অন্য বাজারে তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হলেও এখানে দরদামের সুযোগ থাকায় ক্রেতাদের বড় একটি অংশের কাছে বাজারটি হয়ে উঠেছে সাশ্রয়ের জায়গা।
যশোর শহরের একটি কারখানায় কাজ করেন কামরুল হাসান। সীমিত আয়ে সংসারের খরচ সামলে পরিবারের পোশাক কেনা তার জন্য সহজ নয়। তাই শুক্রবার ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে চলে আসেন এই বাজারে।
অপর ক্রেতা ইমদাদুল হক বলেন, বড় দোকানে গিয়ে পরিবারের সবার জন্য কেনাকাটা করলে খরচ অনেক বেড়ে যায়। এখানে পছন্দমতো জিনিস দরদাম করা যায়। কম টাকায় প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা যায়।
এখানে ক্রেতার সংখ্যা কম নয়। আফরোজা বেগম, নজরুল ইসলামসহ কয়েকজন ক্রেতা জানান, বড় মার্কেটে নির্ধারিত দামের কারণে অনেক সময় প্রয়োজনের তুলনায় কম পণ্য কিনতে হয়। ফুটপাতের বাজারে একই পণ্যের বিভিন্ন মান ও দামের বিকল্প পাওয়া যায়।
এ বাজারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক ডজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জীবিকা। সপ্তাহের ছয় দিন তারা বিভিন্ন জায়গায় বসেন। শুক্রবার অনেকেই পসরা নিয়ে চলে আসেন এই রোডে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিক্রি হওয়া পণ্যই তাদের আয়।
ব্যবসায়ী এখলাছুর রহমান জানান, শুক্রবার এখানে ক্রেতার চাপ বেশি। অন্য জায়গায় সারাদিনে যে পরিমাণ বিক্রি হয়, এখানে বিকেলেই সেই পরিমাণ হয়ে যায়।
বিক্রেতা বিধানচন্দ্র সাহা ও ইলিয়াস হোসেনের কাছেও শুক্রবারের বাজারের গুরুত্ব একই। তাদের দোকানে দেশি পণ্যের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের জিন্স, শার্ট ও টি-শার্ট থাকে। কম দামে পণ্য বিক্রি করেই ক্রেতা ধরে রাখার চেষ্টা করেন তারা।
এখানে শুধু পোশাকই নয়, সংসারের নানা প্রয়োজনীয় সামগ্রীও পাওয়া যায়। কোথাও জুতা, কোথাও কাপড় মিটারে বিক্রি হচ্ছে। শিশুদের বই-খাতা, মশারি, পর্দা, চশমা, প্রসাধনী ও সুগন্ধিও রয়েছে। ফলে নির্দিষ্ট কোনো পণ্যের জন্য নয়, অনেকেই পরিবারের প্রয়োজনীয় নানা ধরনের পণ্য একসঙ্গে কিনতে এখানে আসেন।
এই বাজারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক জুতা ব্যবসায়ী আদিত্য দাসের। বসুন্দিয়া এলাকার এই ব্যবসায়ী গত ১৬ বছর ধরে প্রতি শুক্রবার এইচএমএম রোডে জুতা বিক্রি করছেন।
একসময় আদিত্য দাসের দুই ছেলেও বাবার সঙ্গে ফুটপাতে জুতা বিক্রি করতেন। এখন তারা আলাদা ব্যবসা করছেন। বড় ছেলে তাপস দাস সারা সপ্তাহ নওয়াপাড়ার ফুটপাতে জুতা বিক্রি করেন, শুক্রবার বাবার সঙ্গে এইচএমএম রোডে বসেন।
তাপস দাস বলেন, ‘এই বাজার ছাড়তে পারিনি। ক্রেতাদের অনেকেই চেনে। নতুন ক্রেতার পাশাপাশি পুরনো ক্রেতারাও আসে।’
যশোর পৌরসভার পশ্চিম হাটবাজারের একজন খাজনা আদায়কারী জানান, নির্দিষ্ট টিকিটের মাধ্যমে স্থানভেদে ১০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত খাজনা নেওয়া হয়। তবে, নিজের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি তিনি।
শহরের বড় মার্কেটের বাইরে এই অস্থায়ী বাজারটি দীর্ঘদিন ধরে একটি আলাদা ক্রেতাগোষ্ঠী তৈরি করেছে। দরদাম করার সুযোগ, কম দামে পণ্য পাওয়া এবং পরিবারের প্রয়োজন অনুযায়ী কেনাকাটা- এই তিন বাস্তবতায় শুক্রবার এলেই এইচএমএম রোডমুখী হন অনেক মানুষ।