যশোর, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

ঐতিহ্য

পরিবেশবান্ধব গাড়িটি বিপন্ন

জিয়াউদ্দিন সাইমুম

, ঢাকা

প্রকাশ : বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১২:০০ পিএম
পরিবেশবান্ধব গাড়িটি বিপন্ন

দুই বন্ধুর কথোপকথন:
প্রথম বন্ধু: ফোর্ড কী, জানিস?
দ্বিতীয় বন্ধু: অবশ্যই জানি, এটা মোটর গাড়ি।
প্রথম বন্ধু: আর অক্সফোর্ড?
দ্বিতীয় বন্ধু: নিশ্চয়ই গরুর গাড়ি!

এটা হয়তো এই জমানার কৌতুক। কিন্তু সংস্কৃতির সোঁদা গন্ধ জড়ানো নিচের গানটি এখনও আমাদের আকুল করে:
‘ওকি গাড়িয়াল ভাই
কত রব আমি পন্থের দিকে চায়া রে।
যেদিন গাড়িয়াল উজান যায়
নারীর মন মোর ঝুরিয়া রয় রে।
ওকি গাড়িয়াল ভাই
হাঁকাও গাড়ি তুই চিলমারীর বন্দরে রে...’।

ওই সময় গ্রামের যেখানে নৌকা চলতো না, সেখানে গরুর গাড়ি চলতো। বিশেষত গ্রামের কুলবধূরা গরুর গাড়ির ছইকে পর্দায় ঘিরে বাপের বাড়ি নাইওর যেতেন অথবা বাপের বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ি ফিরতেন। এক গঞ্জ থেকে আরেক গঞ্জে মাল আনা-নেওয়ায় গরুর গাড়ি ছিল অন্যতম অবলম্বন। এটা ছিল পল্লিবাংলার এক ধরনের লোকশিল্প; যাকে কুটির শিল্পও বলা যায়।

গরুর গাড়ির উপযোগিতা থাকার বিশেষ কারণ হচ্ছে এটা চালানোর জন্য বিশেষভাবে নির্মিত রাস্তার দরকার নেই। উঁচুনিচু, বালুচর, কাদায় ভরা মেঠো পথেও এটা দিব্যি চলতে পারে। এটি পরিবেশবান্ধব গাড়ি। কোনো জ্বালানি এতে লাগে না। তাই পরিবেশের কোনো ক্ষতি হয় না।

গরুর গাড়িতে দুটো কাঠের চাকা থাকে। কাঠের চাকায় কায়দা করে পরানো হয় লোহার চাকতি। বাঁশ আর কাঠ দিয়ে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হয় গরুর গাড়ি। বলা যায়, কাঠমিস্ত্রি আর কামারের যৌথ প্রচেষ্টার ফল এটি। কারণ গরুর গাড়ির চাকা তৈরিতে কামারেরও ভূমিকা থাকে। আবার বিশেষ শ্রেণির কারিগরও গরুর গাড়ির চাকা বানাতো।

চাকা তৈরি হয় সাধারণত বাবলা কাঠ দিয়ে। চাকার কেন্দ্রে থাকে বিয়ারিং। দুটি চাকা একটা কাঠের দণ্ড দিয়ে যুক্ত করা হয়। এটাই বহন করে গরুর গাড়ির সব ভার। বাঁশের তৈরি অংশকে বলে চালি। চালির পেছন দিক চওড়া, সামনের দিক চাপা। পুরো চালির দুপাশে থাকে মজবুত দুটি বাঁশের দণ্ড। সামনে এ দুটি দণ্ড একটি কাঠ দিয়ে যুক্ত থাকে, যাকে জোয়াল বলে।

জোয়াল গরুর কাঁধে তুলে দেওয়া হয়। দুপাশে দুটি গরু জোয়াল কাঁধে গাড়ি টেনে নিয়ে যায়। অবশ্য যাত্রীবহনের গাড়িতে নৌকার মতো ছই থাকে। ছইয়ের ভেতরে চালির ওপর পাটি বা বিছানা পেতে যাত্রী বা নাইওরিরা বসে থাকে। আবার কোনো কোনো সময় গরুর গাড়িতে ধানের আঁটি বোঝাই করার পর সেগুলো যাতে চলার সময় পড়ে না যায়, সে জন্য লম্বালম্বিভাবে বাঁশ দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়। এই বাঁশকে বলে আঁটার বাঁশ।

গাড়িতে টানার কাজে ব্যবহৃত গরুর পায়ের খুরে দেওয়া হয় এক ধরনের লোহার পাট্টা। পাট্টা লাগিয়ে দেওয়ার দুটি মৌল কারণ রয়েছে। প্রথমত, লোহার পাট্টা লাগিয়ে দিলে গরু রাস্তায় চলাচলে গায়ে শক্তি পায়। আবার এ ধাতব পাট্টার কারণে পা রাস্তায় তেমন একটা হড়কে যায় না। দ্বিতীয়ত, পায়ে পাট্টা লাগানোর কারণে গরুর পায়ের খুর তেমন একটা ক্ষয় হয় না। অবশ্য স্থায়ীভাবে পাট্টা লাগানো ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার কারণে চার অথবা পাঁচ দিন পর পর গরুর পায়ের খুরে পাট্টা পাল্টিয়ে দিতে হয়। হিসাব করে দেখা গেছে, গরু সুস্থ ও সবল হলে গাড়িতে করে প্রতিবারে প্রায় দু’টন মালামাল বহন করা যায়।

এখন যন্ত্রচালিত যানবাহনের যুগ। মালামাল বহনের জন্য রয়েছে ট্রাক, লরি, ভ্যানগাড়ি। মানুষ যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করে মোটরগাড়ি, রেলগাড়ি, বেবি ট্যাক্সি, রিকশা বা স্থানীয়ভাবে নির্মিত শ্যালো ইঞ্জিনচালিত যান। দূরপাল্লার ভ্রমণে ব্যবহৃত হয় উড়োজাহাজ। স্বাভাবিক নিয়মে আধুনিক যানবাহনের ভিড়ে গরুর গাড়ি হারিয়ে গেছে। বেঁচে থাকার তাগিদে গাড়োয়ানরাও পেশা পাল্টিয়েছে। তারপরও দেশের কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনো গরুর গাড়ি টিকে আছে। তবে মানুষ নিরুপায় না হলে গরুর গাড়ি ব্যবহার করে না। এটার ব্যবহার মালামাল আনা-নেওয়ার মাঝেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে, তা-ও আবার সীমিত পর্যায়ে।

হয়তো বাংলার ঐতিহ্যের অংশ এই গরুর গাড়ি একদিন বইয়ের পাতায় জায়গা করে নেবে। নতুন প্রজন্ম হয়তো গরুর গাড়ির গল্প শুনবে। সন্দেহ নেই ইতিহাস-ঐতিহ্যের অনেক কিছুই আমরা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি অথবা যুগের চাহিদা মেটাতে হারাতে বাধ্য হচ্ছি। পরিকল্পনা অনুসারে এগোতে পারলে ঐতিহ্যের কিছু অংশ হয়তো ধরে রাখা যায়। এজন্য দরকার সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ ও তার বাস্তবায়ন।

মার্কিনিরা তাদের একাধিক অঙ্গরাজ্যে বাষ্পচালিত রেলগাড়ি ফের চালু করেছে এবং হুশ হুশ শব্দ তুলে ছুটে চলা এসব রেলগাড়ি পর্যটকদের মন জয় করে নিয়েছে। মার্কিনিরা তাদের এই উদ্যোগের মাধ্যমে একটা সৃষ্টিশীল মেসেজ রেখেছে। আর তা হচ্ছে গণহারে ঐতিহ্য ধ্বংস হতে দেওয়া উচিত নয়।

বাংলার এক চিরায়ত সাহিত্যে গরুর গাড়ির উপযোগিতা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এভাবে ‘ট্রেন স্টেশনে তখনও পৌঁছেনি, বিশ্বম্ভরপুরের মজুমদার বাবুরা বাড়ি আসছেন। তাই স্টেশনের বাইরে গরুর গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে তাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। বাড়িটা স্টেশন থেকে প্রায় তিন ক্রোশের পথ। সন্ধ্যা হয় হয়। তাই গাড়িয়াল লণ্ঠন জ্বালিয়ে তৈরি হচ্ছে। গরুর গাড়ির ওপরে ছাউনি আঁটা, চালির ওপরে তোশক মতো বিছানা পাতা।’

প্রায় একই ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায় বিভূতিভূষণের ‘জামাই’ গল্পে। কলকাতা থেকে জামাইয়ের ট্রেনে চেপে শ্বশুরবাড়ি ঝিকরগাছা (আজকের যশোর জেলার একটি উপজেলা) যাওয়ার বর্ণনা রয়েছে তাতে।

এটা ঠিক যে, সেকালে পাড়াগাঁয়ের রাস্তাঘাট এখনকার মতো আধুনিক ও পরিকল্পিত ছিল না। আর এখনকার মতো এত গাড়িও ছিল না। তাই সেসব রাস্তায় যাতায়াতের জন্য যানবাহন হিসাবে গরুর গাড়িই ছিল প্রধান যান। এখনও হাওর-বাঁওড়-বিল এলাকায় শুকনো মওসুমে গরু বা মহিষের গাড়ি মালামাল আনা-নেওয়ার কাজে অন্যতম অবলম্বন। বরেন্দ্র ও চলনবিল অঞ্চলে এখনও গরুর গাড়ির প্রচলন রয়েছে। হেমন্তের ক্লান্ত বিকেলে মেঠো ধুলো উড়িয়ে সার বেঁধে গরুর গাড়ি চলার দৃশ্য স্মৃতিকাতরতা বাড়ায়। ওসব এলাকায় কখনও কখনও গরুর গাড়ি চলে রাতভর।

কুড়িগ্রামের চিলমারী বন্দর থেকে একসময় যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের প্রধান বাহন ছিল গরুর গাড়ি। এই এলাকার গাড়োয়ানদের মুখে মুখে যেসব ভাওয়াইয়া গান আকাশ-বাতাস আর ধুলোমাটির পথ মুখরিত করতো, সেসব গীত আমাদের এক অপূর্ব সম্পদ; ঐতিহ্যের অংশ। এসব লোকসম্পদ আমরা হারিয়ে ফেলছি।

এক সময় নৌকাবাইচের মতো এ দেশে গরুর গাড়িরও দৌড়ও হতো নিয়মিত। যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমের কোনো কোনো এলাকায় এখনও হয়। ঘোড়দৌড়, গরুদৌড়ের মতো সেসব প্রতিযোগিতায় আশপাশের গ্রামের গাড়োয়ানরা তাদের গরুর গাড়িসহ অংশ নেন। দূর-দূরান্ত থেকে আগ্রহ নিয়ে ছুটে আসা অগণিত দর্শকের উৎসাহ-চিৎকারে প্রতিযোগিতার মাঠ সরগরম হয়ে ওঠে। বিস্তীর্ণ মাঠের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত রংবেরঙের কাগজ, কাপড় ও জরি দিয়ে সাজানো গরুর গাড়ি হুইসেল বাজানোর পর তীব্রবেগে সামনের দিকে ছুটে যায়।

প্রতিযোগিতায় বিজয়ীরা পান খাসি অথবা নগদ টাকা। একসময় ট্রানজিস্টর (রেডিও) পুরস্কার দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। সেকালে অনেক ক্ষেত্রে এসব প্রতিযোগিতায় পৃষ্ঠপোষকতা করতেন স্থানীয় জমিদার। বিজয়ীকে নিয়ে তার গ্রামে মহাউল্লাস শুরু হয়ে যেত। তাকে নিয়ে গ্রামের মেঠো পথে আনন্দ মিছিল হতো। আর রাতে উপহার হিসাবে পাওয়া গরু-খাসি জবাই করে সবাই মিলে আনন্দ করে খেতেন।

যিশু খ্রিস্টের জন্মের পাঁচ হাজার বছর আগে এবং চাকা আবিষ্কারের অনেক পরে গরুর গাড়ি আবিষ্কৃত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। প্রাথমিকভাবে এই গাড়ি মানুষই টানতো। পরে মানুষ নিজের সুবিধার জন্য চাকার গাড়িতে পশুকে কাজে লাগাতে শেখে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)