যশোর, বাংলাদেশ || শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

চারপাশ

জীবনের ৭০ ভাগ সময় ঘুমিয়ে কাটায় বিড়াল

জিয়াউদ্দিন সাইমুম

, ঢাকা

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর,২০২৬, ১০:০০ এ এম
জীবনের ৭০ ভাগ সময় ঘুমিয়ে কাটায় বিড়াল

পৃথিবীতে নাকি ৩৩ প্রজাতির ৫০ কোটিরও বেশি পোষা বিড়াল রয়েছে। মিসরীয়রা তো বিড়ালেরও মমি বানাতো। তাদের দেখাদেখি গ্রিক আর রোমানরাও বিড়ালভক্ত হয়ে ওঠে। গ্রিক চন্দ্রদেবী ডায়ানা বিড়ালকে ভীষণ পছন্দ করতেন।

অবশ্য কালো বিড়াল নিয়ে নানা কুসংস্কার এখনো সক্রিয়। তবে বিড়ালরা কথা বলতে পারলে সর্বপ্রথম এটাই বলতো, ‘পুরো পঞ্চদশ শতকজুড়ে ইউরোপবাসী মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আমাদেরকে কাতারে কাতারে হত্যা করলেও প্রাণী রক্ষাকারীরা মুখ খোলেনি।’

তখন ইউরোপজুড়ে হঠাৎ প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে। আর এটার সব দায় বিড়ালের ঘাড়ে চাপে। হিটলারি স্টাইলে বিড়াল নিধনযজ্ঞ চলে। অত্যাচার এতটাই চরমে ওঠে যে ইউরোপ বিড়ালশূন্য হওয়ার উপক্রম হয়ে যায়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, পরের শতাব্দীতেই ইউরোপবাসীর বিড়ালপ্রেম উথলে ওঠে।

এনসাইক্লোপেডিয়া অব ক্যাটস মতে, ১৫ শতকে স্পেনের ইনকুইজিশন (বিচার ধর্মসভা) চলাকালে পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট বিড়ালকে দূরাত্মা জ্ঞান করেন। এতে ইউরোপজুড়ে লাখ লাখ বিড়ালকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এই সুযোগে ইঁদুরের উৎপাত বেড়ে যায়। পরের শতকে ইউরোপজুড়ে সংঘটিত ‘ব্ল্যাক ডেথের’ এটাও একটি কারণ। অবশ্য ইউরোপ জুড়ে ব্ল্যাক ডেথ বা প্লেগের প্রকৃত কারণ ইঁদুরও ছিল না। বরং মৃত ইঁদুরের দেহে বিচরণ করা ‘ফ্লি’ নামে মানুষ ও পশুর রক্তপায়ী পাখাহীন এক জাতীয় কীট দায়ী ছিল। ফ্লির জীবাণু মানবদেহে ছড়িয়ে প্লেগ মহামারি সৃষ্টি হয়েছিল। অনেক ইঁদুরও তাতে মারা যায়। তবে ইঁদুরের কারণে এই রোগটি সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়ে।

নিরীহ প্রাণী বিড়াল দিনে ১৬ ঘণ্টা ঘুমিয়েই কাটিয়ে দেয়। এটার শরীরে নাকি মানুষের চেয়ে ৪৪টি হাড় বেশি আছে। মানুষের আছে ২০৬টি। আবার অন্ধকারে এটা মানুষের চেয়ে ছয় গুণ বেশি পরিষ্কার দেখে।

আর পশমযুক্ত তুলতুলে এ প্রাণীটি অহিংস বলেই কি খোকন সোনারা বিড়ালকে ছাড়া শ্বশুরবাড়ি যেতে চায় না?

অভিধানগুলোতে সংস্কৃত ‘বিড়’ ধাতু থেকে বিড়াল শব্দটির উৎপত্তি দেখানো হলেও অধিকাংশ ভাষাবিদ বিড়াল শব্দটিকে অর্বাচীন সংস্কৃত বলেছেন। বিড় মানে আক্রোশ, বিষ্ঠা ও আঁচড়। অর্থ যাই হোক না কেন, হিন্দু দেবী ষষ্ঠীর বাহন হিসেবে পরিচিত বিড়াল মনের আক্রোশের কারণে মাটি আঁচড়ায়। আবার বিষ্ঠা ত্যাগ করে মাটি আঁচড়িয়ে তা ঢেকে দেয়।

সংস্কৃতে বিড়ালের বহুল প্রচলিত প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘মার্জার’। ‘মৃজ’ ধাতু থেকে শব্দটি তৈরি। মৃজ মানে পরিষ্কার বা শোধন করা। আর বিড়াল পরিষ্কার থাকতে পছন্দ করে।
কথাসরিৎসাগর-এ আছে ইন্দ্র ধরা পড়েননি। তিনি ‘মার্জার’-এর রূপ ধারণ করে পালান। গৌতম স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘মার্জার’ চলে গেছে। কথাটি দ্ব্যর্থক। এক অর্থে ‘মৎ-জার’ অর্থাৎ আমার নিষিদ্ধ প্রেমিক, অন্য অর্থে বিড়াল।

পালি, বৈদিক ও প্রাচীন সংস্কৃতে ‘বিড়াল’ শব্দটি নেই। কিন্তু বাংলায় মার্জারের চেয়ে বিড়াল বা বেড়াল শব্দটাই বেশি পরিচিত এবং আদরের।

বাংলায় একটি প্রতিষ্ঠিত প্রবাদ হচ্ছে ‘বিড়ালতপস্বী’। ‘বকধার্মিক’ বা ‘ভণ্ড যোগী’ অর্থে বাংলায় ‘বিড়ালতপস্বী’ শব্দটি চালু রয়েছে (বাপ অসৎকর্মে রত হইয়া নীতি উপদেশ দিলে ছেলে তাহাকে বিড়ালতপস্বী জ্ঞান করিয়া উপহাস করিবে: আলালের ঘরের দুলাল)।

বিড়ালের একটি বিশেষ ধ্যানমগ্ন অবস্থা অনুকরণে ‘বিড়ালতপস্বী’ শব্দটি চালু হয়। বিড়াল ইঁদুরের অপেক্ষায় যখন ওত পেতে বসে থাকে তখন তার বাহ্যিক অবয়ব দেখে এটা মনে হয় যেন অহিংসাই তার পরম ধর্ম। এ প্রসঙ্গ থেকেই ভণ্ড অর্থে ‘বিড়ালতপস্বী’ শব্দটি এসেছে। পঞ্চতন্ত্র ও মহাভারতে বিড়ালের সাধুপনা নিয়ে গল্প রয়েছে।

এক সময় ‘বিড়ালতপস্বী’ অর্থে ‘বিড়ালসন্ন্যাসী’ শব্দটি চালু ছিল (তথা গিয়া উত্তরিল বিড়ালসন্ন্যাসী-কাশীদাসী মহাভারত)। কিন্তু শব্দটি এখন আর চোখে পড়ে না।

অন্ধকারে বিড়ালের চোখ জ্বলজ্বল করে টাপেটামের কারণে। অবশ্য টাপেটাম বিড়ালকে স্বল্প আলোয় ভালোভাবে দেখতে সহায়তা করলেও আরো কিছু বৈশিষ্ট্য প্রাণিটিকে অন্ধকারে চলতে সাহায্য করে। বিড়ালের ঘ্রাণশক্তি ও শ্রবণশক্তি বেশ প্রখর। আর এগুলোই বিড়ালকে অন্ধকারে শিকার খুঁজে নিতে বা নিরাপদে চলাচল করতে অনেকটা সাহায্য করে। তাই পুরোপুরি অন্ধকার রাতেও বিড়াল এসবের ওপর নির্ভর করে পথ চলতে পারে।

বিড়াল ‘বাঘের মাসী’ নামেও পরিচিত। এরা শতাধিক ধরনের শব্দ উচ্চারণ করতে পারে। তবে কুকুরের শব্দভাণ্ডার দশের বেশি নয়।

প্রাচীন মিসরে বিড়ালকে বলা হত ‘মাউ।’ এর মানে, ‘দেখা’। আর বিড়ালের দেবীর নাম ছিল বাস্ট বা বাসটেট। প্রাচীন মিসরের থিবস নগরীর একটি সমাধিসৌধের দেয়ালে বিড়াল-বন্দনা হিসেবে এই কথাগুলো লেখা ছিল...

‘হে মহৎ মার্জার, দেবগণের প্রতিহিংসক তুমি
এবং শব্দসমূহের বিচারক, স্বাধীন নৃপতির অধীশ্বর
এবং পবিত্র চক্রের প্রশাসক
তুমি প্রকৃতই মহৎ মার্জার ...।’

রোমের অধিবাসীরা বিড়ালকে সম্মান করতো। আদর করে ডাকতো ‘ফেলিস’। এর অর্থ, ‘মঙ্গলময় অশুভ ইঙ্গিত’। পরে বিড়ালদেবী বাস্ট রোমান চন্দ্রদেবী ডায়ানার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যান।

কোনো সংকীর্ণ জায়গা দিয়ে যেতে পারবে কিনা, বিড়াল তা নির্ধারণ করে গোঁফের সাহায্যে। বেড়ালের চার সারি গোঁফে মোট ৩২টি লোম থাকে। অন্ধকারে প্রাণীটির মূত্র ঝলঝল করে জ্বলে। আবার লেজের সাহায্যে চমৎকার ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে বলেই অধিকাংশ বিড়াল ৩০ ফুট উঁচু থেকে পড়েও অক্ষত থাকে।

মানুষের আঙুলের ছাপের মতো বিড়ালের নাকের ছাপও একই বৈশিষ্ট্যের। এ কারণে সব বিড়ালের নাকের ছাপ আলাদা। নাকের ছাপ পরীক্ষা করে হারিয়ে যাওয়া বিড়াল শনাক্ত করা যায়।

বিড়াল তার জীবদ্দশার প্রায় ৭০ ভাগ সময় ঘুমিয়ে কাটায়। অর্থাৎ নয় বছরের একটি বিড়াল ছয় বছরের বেশি সময় ঘুমিয়েই পার করে দেয়।

‘হোয়াট ক্যাটস আর মেইড অফ’ গ্রন্থে হ্যানোস পিডিন লিখেছেন ‘নিজের বাসা খুঁজে নিতে বিড়ালের অসাধারণ সামর্থ্য ‘সাই ট্রাভেলিং’ নামে পরিচিত। সূর্যরশ্মির কৌণিক অবস্থান ব্যবহার করে বিড়াল পথ খুঁজে নিতে পারে অথবা বিড়ালের মস্তিষ্কে চুম্বকায়িত যে কোষ রয়েছে তা-ই কম্পাস হিসেবে ব্যবহার করে।

বিশ্বজুড়ে এখন ক্যাট-শো বা বিড়াল মেলা একটি ক্রেজে পরিণত হয়েছে। এটার যাত্রা শুরু হয় ১৮৭১ সালে লন্ডনে।

ফারসিতে একটি মশহুর প্রবাদ হচ্ছে ‘গুরবে কুশতন শবই আউয়াল’। মানে শাদির প্রথম রাতেই বিড়াল মারতে হবে। প্রসঙ্গটি নিয়ে সৈয়দ মুজতবা আলী ‘মার্জার নিধন কাব্য’ নামে একটি সরেস কবিতা লিখেছেন।

আসলে বাসররাতে বিড়াল মারার ইতিহাস নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতপার্থক্য রয়েছে। ‘কাৎসেনশ্লেগার তত্ত্ব’ আমাদের টেনে নেয় খ্রিস্টের জšে§রও বহু আগে, প্রাচীন মিসরে। বহু ফারাও আর ফারাওপত্নীদের পিরামিডে পাওয়া গেছে মৃত বিড়ালের মমি। ধারণা করা হয়, নিজ হাতে খড়্গ দিয়ে একটি কুমারী বিড়ালের শিরশ্ছেদ করে ফারাওরা তাদের বাসরঘরে ঢোকার অধিকার পেতেন। নিজের শৌর্যের প্রমাণ হিসাবেই ফারাওরা বাসররাতে বিড়ালনিধন করতেন।

তবে সালমানকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক হুয়ান মাতাগাতোস মনে করেন, বাসররাতে বিড়াল মারার দায়িত্বটি পুরুষ নয়, নারীর কর্তব্য এবং এই রীতি প্রচলিত ছিল প্রাচীন ইনকাদের মাঝে।

তবে সম্প্রতি ভারতের কটকে আবিষ্কৃত কিছু প্রাচীন ফার্সি পুঁথির পাঠোদ্ধার করে জানা গেছে, বাসর রাতে বিড়াল মারার ব্যাপারটি জনপ্রিয় করেন সম্রাট শেরশাহের অনুচর খুসরাও খাঁ।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)