যশোর, বাংলাদেশ || রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

প্রাণী

পানিতে টানা ৪০ মিনিট দম বন্ধ রাখতে পারে তেলাপোকা

জিয়াউদ্দিন সাইমুম

, ঢাকা

প্রকাশ : শুক্রবার, ৯ অক্টোবর,২০২৬, ১০:০০ এ এম
পানিতে টানা ৪০ মিনিট দম বন্ধ রাখতে পারে তেলাপোকা

উচ্চমাত্রার বিকিরণ ঠেকানোর ক্ষমতা দেখে কোনো কোনো বিজ্ঞানী ধারণা করেন পারমাণবিক যুদ্ধের পরও তেলাপোকা টিকে থাকবে। সব বিজ্ঞানী এই মত পোষণ করেন না। তবে যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে লাখ লাখ বছর ধরে টিকে আছে তেলাপোকা। এরা পানিতে অবিশ্বাস্যভাবে টানা ৪০ মিনিট দম বন্ধ রাখতে পারে।

তেলাপোকা সাধারণত ঘণ্টায় তিন মাইল গতিবেগে দৌড়াতে পারে। এই পতঙ্গটির আকার মানুষের সমান হলে এটা ঘণ্টায় তিনশ’ মাইল গতিবেগে ছুটতে পারতো।

স্পর্শকাতর ও চঞ্চল এই পতঙ্গটি এক সেকেন্ডে ২৫ বার দিক পাল্টাতে পারে। তাই এটাকে পায়ের তলায় পিষে মারা বেশ কঠিন।

তেলাপোকার রক্ত সাদা। খাবার না খেয়ে এরা এক মাস পার করে দিতে পারে। কিন্তু পানি ছাড়া বাঁচতে পারে সপ্তাহখানেক। একবার খেলে পরের বেশ ক’টি দিন খাওয়া লাগে না। তাই এরা গোপন জায়গা থেকে সাধারণত পানি খেতেই বের হয়।

প্রাকৃতিক নিয়মে চামড়া ঝেড়ে ফেলার পর তেলাপোকার দেহ থাকে সাদা রঙের। সাদার মাঝে কালচে খয়েরি চোখজোড়া দেখতে বেশ ভালোই লাগে। কিন্তু চামড়া প্রকৃত রঙ ফিরে পায় মাত্র আট ঘণ্টায়।

কলম্বিয়ায় স্ন্যাকস হিসাবে তেলাপোকা, মাকড়সা, ইঁদুর হচ্ছে সাধারণ খাবার। শুধু কলম্বিয়া নয়, তেলাপোকা বিভিন্ন দেশে বাড়তি খাবার হিসেবে খাওয়া হয়। এতে প্রচুর প্রোটিন আছে। হজমের সমস্যায় অনেক দেশে রসুন দিয়ে তেলে ভাজা তেলাপোকা খাওয়া হয়।

তেলাপোকা অন্ধকার পছন্দ করলেও আলো ভয় পায় না। এরা রসুন খেতে ভালোবাসে। বই বা ডাকটিকিটের আঁঠাও এদের ফেভারিট।

ছয় পায়ে ১৮ হাঁটুওয়ালা এই পতঙ্গটি উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর ভয়াবহ ঠান্ডাতেও বেঁচে থাকে। মানুষের সঙ্গেই তারা কাটিয়ে দিয়েছে লাখো বছর। তাই শিল্পকলা, সাহিত্য, ফিল্মে তেলাপোকা নানাভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।

জার্মান সাহিত্যিক ফ্রাঞ্জ কাফকার কালজয়ী গল্প ‘দি মেটাফরফোসিস’-এর অন্যতম চরিত্র গ্রিগর স্যামসা ঘুম থেকে উঠে বুঝতে পারেন তিনি পরজীবী কীটে পরিণত হয়েছেন। কাফকা এটা পরিষ্কারভাবে বলেননি গ্রিগর কোন কীটে রূপান্তরিত হয়েছেন। কিন্তু কীটটির দৈহিক বর্ণনা যেভাবে দিয়েছেন, তাতে বুঝতে কষ্ট হয় না, গ্রিগর একটি তেলাপোকায় রূপান্তরিত হয়েছেন।

সংস্কৃতে এটার নাম আঁরশোলা। লৌকিক সংস্কৃতে এটা তেলপায়িকা নামেও পরিচিত। কারণ এটা মাটির প্রদীপের তেল পর্যন্ত খেয়ে ফেলে।

তেলাপোকার কঙ্কাল শরীরের বাইরে অবস্থিত। আর বিশ্বে সবচেয়ে বড় তেলাপোকার সাইজ ছয় ইঞ্চি। এদের বসবাস দক্ষিণ আমেরিকায়।

তেলাপোকা মারতে হলে এদের পাকস্থলী ফাটাতে হবে। খেয়াল করবেন, অনেক সময় এদের আঘাত করলে পটাশ করে আওয়াজ হয়, এটাই পাকস্থলী ফাটার আওয়াজ।

চলাফেরায় বেশ চটপটে মনে হলেও আসলে এরা প্রচণ্ড অলস। জীবনের ৭৫ ভাগ সময় এরা বিশ্রামেই কাটিয়ে দেয়।

দুঃসংবাদ হচ্ছে, ঘরের কোণায় কোণায় ঘুরে বেড়ানো এই বিদঘুটে প্রাণীটি মানবদেহে ভয়াবহ হাঁপানি ও অ্যালার্জির জীবাণু ঢুকিয়ে দিতে পারে। ভারতের মুম্বাইয়ের লীলাবতী হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সঞ্জীব মেহতা তার এক নিবন্ধে দাবি করেছেন, তেলাপোকার মাধ্যমে প্রায় ৫০ রকমের জীবাণু মানবদেহে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষত শিশুরা খুব সহজেই এইসব জীবাণুর কবলে পড়ে। তার মতে, শিশুদের হাঁপানির প্রধান কারণ হলো ধুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকা জীবাণু। বাড়ির বিছানা, বালিশ, কার্পেট প্রভৃতিতে এগুলো বাস করে। ভয়াবহতার বিচারে এর পরেই আছে তেলাপোকা। তেলাপোকা ৩৩ রকমের ব্যাকটেরিয়া, ছয় রকমের পরজীবী এবং কম করেও সাত রকমের প্যাথোজেন বহন করে। তেলাপোকার বর্জ্য পদার্থ, লালা ও শরীরের স্পর্শ থেকে এই জীবাণুগুলো ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ডা. মেহতা বলেন, পেটের নানা রকমের পীড়া, আমাশয়, ডায়রিয়া, খাদ্যে বিষক্রিয়া, টাইফয়েড, লিভারের প্রদাহ-জন্ডিস, পোলিও—কত রোগের জীবাণুরই না বাহক তেলাপোকা!

পৃথিবীতে প্রাণীটির আগমন ঘটেছে প্রায় ২৮০ মিলিয়ন বছর আগে। অসম্ভব প্রাণশক্তির অধিকারী এ প্রাণীটি সব পরিবেশে অনায়াসে বসবাস করতে পারে।

পৃথিবীতে প্রায় পাঁচ হাজার প্রজাতির তেলাপোকা আছে। তবে বেশি প্রজাতির তেলাপোকা বাস করে দক্ষিণ আফ্রিকায়। এ অঞ্চলে কমপক্ষে ১৭৫ প্রজাতির তেলাপোকা রয়েছে।

একটি পূর্ণবয়স্ক তেলাপোকা তিন মিটার থেকে ৬৫ মিলিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। আর তেলাপোকার মুখে সব খাবারই সমান। উদরপূর্তি হলেই হলো।

এদের পেটের নিচে আছে দুটি উপাঙ্গ, যা অসংখ্য লোমে আবৃত। এ লোমের সাহায্যে তেলাপোকা বাতাসের পরিবর্তনও সহজে টের পায়। কখনো পায়ের নিচে ফেলে তেলাপোকা মারতে গেলে কিংবা জুতো দিয়ে পিষে ফেলতে চাইলে সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের একটি লো-ফ্রিকোয়েন্সি তরঙ্গ সৃষ্টি হয়। বায়ুর এ সন্দেহজনক পরিবর্তন টের পাওয়া মাত্র তেলাপোকা উড়ে যায় কিংবা দৌড়ে পালায়।

তেলাপোকার শুঁড় অ্যান্টেনার কাজ করে থাকে। এ শুঁড়ের সাহায্যে এরা খাদ্য সংগ্রহ, বিপদসঙ্কেত থেকে শুরু করে সব ধরনের তথ্য পায়। তেলাপোকা শারীরিকভাবেও খুব চাপ সহ্য করার ক্ষমতা রাখে।

তেলাপোকা ছ’পেয়ে প্রাণী। কিন্তু চলাচলের সময় ওরা কমপক্ষে তিনটি পায়ের ওপর ভর করে। এতে তাদের গতি ও স্থিতি অসম্ভব ভালো ও তেমনি সাবলীল হয়ে ওঠে। তেলাপোকার এসব বৈশিষ্ট্য নিয়ে ইসরাইলের তেলআবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আমির আয়ালি ও তার সহযোগীরা গবেষণা চালাচ্ছেন। ড. আয়ালি বলেন, তেলাপোকাকে দেখে উন্নততর রোবোট তৈরির অনুপ্রেরণা পাওয়া গেছে।

তেলাপোকা মূলত সর্বভুক। তবে খাবারের ময়লা-আবর্জনা আর বাথরুমের ময়লাই এদের প্রিয় খাবার। এসব ময়লা-আবর্জনা থেকে এদের গায়ে লেগে যায় নানা জীবাণু। পেটের ভেতরেও ঢুকে যায় অজস্র। তারপর রাতের আঁধারে যখন বসে কোনো খাবারের ওপর, তখন তেলাপোকার পা-পাখা-শরীর থেকে খাবারে লেগে যায় অসংখ্য জীবাণু। তা ছাড়া, খাবারের ওপর ঘোরাফেরা করার সময় খাবার খাওয়ার পাশাপাশি খাবারের ওপর মলত্যাগ আর বমিও করে তেলাপোকা। তেলাপোকার এসব মল আর বমির মাধ্যমেও খাবারে মিশে যায় হাজারো জীবাণু। জীবাণুমিশ্রিত এসব দূষিত খাবার খেলেই হয় নানা অসুখ। এ ছাড়া তেলাপোকার শরীর থেকে খসে যাওয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ আর ঘরের ধুলোবালিতে মিশে থাকা তেলাপোকার শুকনো মলকে বর্তমানে হাঁপানির কারণ ধরা হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের গবেষকরা সম্প্রতি জানিয়েছেন, ভালো খাদ্য উৎসের সন্ধান পেলে তেলাপোকারা নাকি নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতে পারে। তারপর সবগুলো তেলাপোকা একজোট হয়ে খাদ্যবিষয়ক সিদ্ধান্ত নেয়। এ গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে বিহেভিয়ারাল ইকোলজি ও সোসিওবায়োলজি সাময়িকীতে।

শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে তেলাপোকা ‘তার নোংরামি, দুর্গন্ধ আর অসাধারণ অভিযোজন ক্ষমতার’ জন্য নেতিবাচক ধারণার এক বিশাল অবস্থান গড়ে নিয়েছে।

তেলাপোকাকে বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই ঘৃণা করে। অনেকের মাঝে তেলাপোকা-ফোবিয়াও (তেলাপোকা-ভীতি) আছে। তেলাপোকাকে নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে বেশ কিছু কার্টুন, মিথ, গান, মুভিও তৈরি হয়েছে।

একটি কৌতুক দিয়ে শেষ করছি।

সর্দারজি আর তার বন্ধু জয়রামের মধ্যে কথা হচ্ছে:
জয়রাম: পরবর্তী জীবনে তুই কী হতে চাসরে বন্ধু?
সর্দারজি: আমি তেলাপোকা হতে চাই। ভেবে দেখলাম এতেই লাভ।
জয়রাম: বলিস কী রে! সবাই কত কী হতে চায়, আর তুই কিনা তেলাপোকা হতে চাস!
সর্দারজি: কারণ আমার স্ত্রী আমাকে মোটেও ভয় পায় না। সে শুধু তেলাপোকাকেই ভয় পায়!

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)