মাঠে কৃষি ও গবেষণা কর্মকর্তারা, সংগ্রহ করা হয়েছে নমুনা
জাহিদ হাসান
, কুষ্টিয়া
কুষ্টিয়ার মিরপুরে আগাম ফুলকপি ও বাঁধাকপির চাষ করে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। ক্ষেতজুড়ে দেখা দিয়েছে পচন ও পোড়া রোগের উপসর্গ। এতে বাজারে চড়া দাম থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন খরচ তোলা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন চাষিরা।
আবহাওয়াজনিত কারণে রোগের প্রকোপ বেড়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন কৃষি ও গবেষণা কর্মকর্তারা। ইতোমধ্যে আক্রান্ত ক্ষেত পরিদর্শন করে মাটি ও রোগাক্রান্ত গাছের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। নমুনা পরীক্ষার পাশাপাশি রোগের কারণ নির্ণয় ও প্রতিকারে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর।
কৃষি খাতে সমৃদ্ধ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম জেলা কুষ্টিয়া। প্রচলিত ধান ও পাট চাষের পাশাপাশি জেলার কৃষকরা এখন বাণিজ্যিকভাবে উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনে ঝুঁকছেন।
মিরপুর উপজেলার বিভিন্ন মাঠে শীতকালীন সবজি ফুলকপি, বাঁধাকপি ও শিমের পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের চাষ হচ্ছে। অসময়ে উৎপাদিত সবজির বাজারদর তুলনামূলক বেশি থাকায় আগাম চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের। তবে বেশি লাভের সম্ভাবনার সঙ্গে রয়েছে উৎপাদনঝুঁকিও।
উপজেলার সদরপুর ইউনিয়নের বড়বাড়িয়া মাঠে একসময় প্রধানত ধান ও পাটের আবাদ হতো। বর্তমানে সেখানে আগাম শীতকালীন সবজি, মরিচ ও গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের চাষ হচ্ছে। ভালো দাম পাওয়ার আশায় অনেক কৃষক আগাম ফুলকপি ও বাঁধাকপি চাষ করেছেন।
বর্তমানে বাজারে ফুলকপি ও বাঁধাকপি প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু ক্ষেতের ফসলে পচন ও পোড়া রোগ দেখা দেওয়ায় প্রত্যাশিত লাভ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। অনেকের ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ তোলাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বড়বাড়িয়া মাঠপাড়া এলাকার কৃষক রাফিজুল ইসলাম এক বিঘা জমিতে আগাম ফুলকপি চাষ করেছেন। পাশাপাশি করেছেন গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের আবাদ। ফুলকপিতে ফুল আসার আগ পর্যন্ত ভালো ফলনের আশা করছিলেন তিনি। কিন্তু ফুল ধরার পর থেকেই দেখা দিয়েছে পচন। পরিপক্ব হওয়ার আগেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ফুলকপি।
রাফিজুল ইসলাম বলেন, ‘বেশি লাভের আশায় আগাম ফুলকপি চাষ করেছিলাম। আজও কিছু ফুলকপি তুলে প্রতি কেজি ৮০ টাকা দরে বিক্রি করেছি। এক বিঘা জমিতে খরচ হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। আশা ছিল দেড় লাখ টাকার ফুলকপি বিক্রি করবো। কিন্তু কয়েক দিন ধরে পচন দেখা দিয়েছে। কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। এখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচ হাজার টাকার ফুলকপি বিক্রি করতে পেরেছি। বাকি ফসল আর বিক্রি করতে পারব কি না, তা নিয়ে শঙ্কায় আছি। শেষ পর্যন্ত ক্ষেতেই নষ্ট হতে পারে।’
একই এলাকার কৃষক সামসুজ্জোহা জানান, তাদের মাঠে ফুলকপিতে কাণ্ড পচা, ঘাড় পচা, পাতা পচা ও ফুল পচাসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এভাবে রোগ ছড়িয়ে পড়তে থাকলে ভবিষ্যতে ওই মাঠে সবজি চাষ করাই কঠিন হয়ে পড়বে। এ ছাড়া বাঁধাকপিতে পোড়া রোগ দেখা দিয়েছে। এতে পুরো জমির ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
বাঁধাকপি চাষি কলিম উদ্দীন বলেন, ‘গরমকালে কপি চাষ করলে বেশি লাভ হয়। এক বিঘা জমিতে বাঁধাকপি চাষ করতে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। হঠাৎ পোড়া রোগ দেখা দেওয়ায় পুরো জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। এখন এসব ফসল কিনবে কে? পচে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে, গরুও খাবে না। কী কারণে এমন হলো, বুঝতে পারছি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সারের দোকানে গিয়ে যে যা পরামর্শ দিয়েছে, সে অনুযায়ী ওষুধ প্রয়োগ করেছি। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। একজনের পরামর্শে এমিস্টার টপ প্রয়োগের পর গাছ আরও শুকিয়ে গেছে।’ এভাবে চলতে থাকলে কৃষকদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এলাকার কৃষক রাকিবুল ইসলাম প্রথমে মাঠে এ ধরনের রোগের উপসর্গ দেখে উপজেলা কৃষি অফিসকে বিষয়টি জানান। পরে উপজেলা কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের নিয়ে আক্রান্ত জমি পরিদর্শন করেন এবং রোগ দমনে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন।
রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘মাঠে নতুন ধরনের রোগের উপসর্গ দেখে দ্রুত উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে জানাই। তিনি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের নিয়ে জমি পরিদর্শন করেন এবং সমস্যা সমাধানে পরামর্শ দেন।’
কৃষকদের সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সরকারিভাবে কৃষক পর্যায়ে মাটি ও বীজ শোধন সম্পর্কে আরও সচেতনতা তৈরি এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হলে কৃষকরা উপকৃত হবেন। বীজবাহিত রোগের কারণে এভাবে তৈরি ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও কমবে।
মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মতিউর রহমান বলেন, আগাম কপি চাষে কৃষকরা লাভবান হওয়ায় এ চাষের পরিধি বেড়েছে। তবে আবহাওয়াজনিত কারণে আগাম কপিতে কিছু রোগবালাই দেখা দিয়েছে। স্থানীয় কৃষকরা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানানোর পর উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে আক্রান্ত জমি পরিদর্শন করা হয়।
তিনি বলেন, রোগের কারণ নির্ণয় ও প্রতিকারের জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের নিয়ে মাঠ থেকে মাটি ও রোগাক্রান্ত গাছের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে রোগটি বীজ ও মাটিবাহিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। আবহাওয়াজনিত কারণেও এর প্রকোপ বেড়েছে। রোগের বিস্তার রোধ এবং প্রতিকারে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সরেজমিন গবেষণা বিভাগের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কৃষিবিদ মামুন হোসেন বলেন, প্রাথমিকভাবে ফুলকপি ও বাঁধাকপিতে আক্রান্ত রোগের উপসর্গ শনাক্ত করা হয়েছে। মাঠ থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষার জন্য গবেষণাগারে পাঠানো হয়েছে। মাটি ও বীজ শোধন না করা এবং বৃষ্টির কারণে রোগের প্রকোপ দেখা দিয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আগাম উচ্চমূল্যের ফসল চাষে আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ, বীজ ও মাটিবাহিত রোগ প্রতিরোধে বীজ ও মাটি শোধন এবং সঠিক সার ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কৃষকদের সচেতন হতে হবে।
এদিকে, ফসল চাষের আগে মাটি শোধন ও পুষ্টিমান পরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের কুষ্টিয়া আঞ্চলিক গবেষণাগারের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শফিকুল মওলা।
তিনি বলেন, কৃষকরা বাণিজ্যিক ও লাভজনক কৃষির দিকে এগিয়ে এলেও মাটি পরীক্ষার বিষয়ে এখনো যথেষ্ট আগ্রহী নন। চাষের আগে স্বল্প খরচে মাটি পরীক্ষা করে ফল অনুযায়ী সার প্রয়োগ ও চাষাবাদ করলে মাটিবাহিত রোগের কারণে ক্ষতির পরিমাণ কমানো এবং রোগ প্রতিরোধে সহায়তা পাওয়া সম্ভব।