মুকিমুল আহসান
বাংলাদেশে চলতি বছরের উচ্চ মাধ্যমিক বা এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলে দেখা গেছে, পাস করেছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ পরীক্ষার্থী এবং প্রায় অর্ধেক পরীক্ষার্থীই এবার অকৃতকার্য হয়েছে।
দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেন পরীক্ষায়। তাদের মধ্যে পাস করেন ছয় লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন শিক্ষার্থী, আর ফেল করেছেন পাঁচ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন।
এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত ২২ বছরের মধ্যে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় পাশের হার সবচেয়ে কম।
কমেছে জিপিএ-ফাইভ পাওয়ার হারও। এবারের এইচএসসিতে উত্তীর্ণ পরীক্ষাদের মধ্যে জিপিএ-ফাইভ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন পরীক্ষার্থী।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলেও অবনতি ঘটেছিল, ওই বছর পাশের হার কমে ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশে নেমে আসে।
বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে এই হার আরো কমে ৫২ শতাংশে নেমে এসেছে। এবার কেন এই ফল বিপর্যয় হয়েছে সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
শনিবার সকালে সচিবালয়ে ফলাফল ঘোষণা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক বলেছেন, ফলাফল সন্তোষজনক হয়নি, তবে খাতা দেখায় স্বচ্ছতার জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সারাদেশের ১১টি শিক্ষাবোর্ডের মধ্যে সামগ্রিক ফলাফলে পাশের হার ৫২ শতাংশ হলেও যশোর ও বরিশাল বোর্ডে পাশের হার ছিল ৪৫ শতাংশেরও কম।
ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, এবারের পরীক্ষায় খাতা মূল্যায়ন শতভাগ নির্মোহভাবে করা হয়েছে। জিপিএ ফাইভ কিংবা পাশের হার বৃদ্ধির যে একটা কৃত্রিম সংস্কৃতি ছিল সেখান থেকে বেরিয়ে এসে মেধার মূল্যায়ন করা হয়েছে।
তবে সরকারের এই ব্যাখ্যার সঙ্গে ভিন্নমত রয়েছে শিক্ষাবিদদের। তারা বলছেন, এবারের পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়ন কিংবা খাতা মূল্যায়নে সংকট ছিল বলেই এমন ফল বিপর্যয় হয়েছে।
যদিও এবার প্রথমবারের মতো সরকার অকৃতকার্য বা ফেল করা শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন একটি সুযোগ তৈরি করেছে; তা হলো—সর্বোচ্চ দুটি বিষয়ে যারা ফেল করেছে তারা আগামী ডিসেম্বরেই পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাবেন।
এবারের পরীক্ষায় দেশের ২৯৩টি প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও পরীক্ষায় পাস করতে পারেনি। আর শতভাগ পাস করেছে মাত্র ১৩৯ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।
ফল বিপর্যয়ের কারণ কী
এবারের এইচএসসির ফলাফল যে সন্তোষজনক হয়নি সেটি স্বীকার করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন।
ফলাফল ঘোষণাকালে তিনি বলেছেন, ‘এ বছর পাসের হার ও জিপিএ ফাইভ কিছুটা কমেছে। এটি কোনো একটি বিষয়ের ঘাটতির কারণে হয়নি। বরং সামগ্রিক শিখন পদ্ধতি, পাঠ্যবই ও শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের যে ঘাটতি রয়েছে, তা পুনর্মূল্যায়ন করে দূর করতে হবে।’
আর প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, এর আগের সরকারের আমলে ‘কৃত্রিমভাবে’ জিপিএ ফাইভ ও পাশের হার বৃদ্ধির একটি সংস্কৃতি ছিল। বর্তমান সরকার সেখান থেকে বের হয়ে এসেছে।
একই সঙ্গে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথাও উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা।
যদিও বিষয়গুলো একটু ভিন্নভাবেও ব্যাখ্যা করেছেন আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান।
আখতারুজ্জামান বলেছেন, ‘নামকাওয়াস্তে মূল্যায়ন দিয়ে শিক্ষার্থীকে সন্তুষ্ট রাখার যে প্রবণতা ছিল সেটি থেকে বের হয়েছে এসেছে বর্তমান সরকার। আমরা পরীক্ষকদের অতিরিক্ত নম্বর দিতে না করেছি। এবার তাদের বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীরা যেটা পাওয়ার কথা সেটাই যেন পায়।’
সরকারের এই অবস্থানের কারণে কী ফলাফলে বিপর্যয় নেমে এসেছে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, সারা বছর ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম কিংবা শিখন পদ্ধতিতে কোনো ত্রুটি থাকতে পারে, যেগুলো সামগ্রিকভাবে ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে এবারের ফলাফলে এই বিপর্যয়কে শুধু এসব কারণের ভেতর আটকে না রেখে এর পেছনের কারণগুলোও খুঁজছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
মি. আখতারুজ্জামান জানিয়েছেন, যেসব পরীক্ষক এবারের এইচএসসির খাতা দেখেছিলেন, তাদের নম্বরপত্র দেখে এমন কিছু অস্বাভাবিক চিত্রও তাদের কাছে উঠে এসেছে। যে কারণে এমন কিছু শিক্ষককে তারা চিহ্নিতও করেছেন।
তিনি বলেছেন, ‘ইতোমধ্যে আমরা ১০০ জনেরও বেশি পরীক্ষককে চিহ্নিত করে রেখেছি। যে পরিমাণ নম্বরের পার্থক্য থাকলে একজন শিক্ষককে শাস্তির আওতায় আনা যায় সেটি নিয়ে আমরা কাজ করছি।’
তবে, সেই পরীক্ষক কারা কিংবা তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে সেটি নিয়ে খোলাসা করে তিনি কিছু বলেননি।
দুটি বিষয়ে এত বেশি ফেল কেন
চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা সব থেকে বেশি অকৃতকার্য হয়েছেন ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে। প্রকাশিত ফলে বিষয়ভিত্তিক পাসের হারে এই চিত্র দেখা গেছে।
শনিবার ফল প্রকাশের সময় সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে, এর মধ্যে ইংরেজি বিষয়ে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। ইংরেজিতে ফেল করেছেন দুই লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন।
এর পরেই বেশি ফেল করেছে আইসিটিতে। প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, আইসিটি বিষয়ে ফেল করেছে এক লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন।
এই দুই বিষয়ে এত বেশি পরীক্ষার্থী ফেল করার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি সৈয়দ আখতারুজ্জামান বলেন, প্রশ্নপত্র গতানুগতিকই ছিল। ইংরেজিতে এমনিতেই ফেল করার প্রবণতা বেশি থাকে।
আর আইসিটিতে ফেল বেশি করার কারণ হলো সবগুলো প্রতিষ্ঠানে আইসিটির শিক্ষক ওভাবে নিয়োগ দেওয়া নাই। এই বিষয়ের শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। অন্য সাবজেক্টের টিচাররা আইসিটি পড়ায়। যে কারণে এখানে শিখন ঘাটতি আছে।
তিনি এটিও বলেছেন, আইসিটি বিষয়ে পরীক্ষার্থীরা সিলেবাস সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেনি, যেটি ফলাফল বিপর্যয়ের আরেকটি কারণ।
তবে, শিক্ষাবোর্ডের এই কর্মকর্তার সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান। তিনি এর পেছনে দুইটি কারণকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
অধ্যাপক রহমান বলছিলেন, ‘আমাদের দেশে ভালো ইংরেজি শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। অন্য সাবজেক্টের টিচাররা ইংরেজি পড়ান কিংবা আইসিটি পড়ান। যে কারণে এই দুই সাবজেক্টে ফলাফল বিপর্যয় বেশি হয়েছে।’
‘অন্যদিকে, আইসিটিতে বেশি ফেলের আরেকটি কারণ হলো বৈষম্য। ঢাকার বাইরে সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আইসিটি ল্যাব নেই। আবার গ্রাম বা নিম্নবিত্তের যাদের কাছে পয়সা নেই তাদের সন্তানের আইসিটির জন্য ডিভাইস বা কম্পিউটার পায় না। যে কারণে এই সাবজেক্টেও এত ফেল করেছে,’ যোগ করেন তিনি।
দুই বিষয়ে পরীক্ষা ও রেজাল্ট ডিসেম্বরে
বোর্ড পরীক্ষার ক্ষেত্রে এর আগে নিয়ম ছিল এক বছর ফেল করা শিক্ষার্থীরা আবার পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন পরের বছর।
তবে এবার থেকে এই নিয়মে কিছুটা পরিবর্তন এনেছে সরকার। ফেল করা শিক্ষার্থীরা একদিকে যেমন পুনর্মূল্যায়নের জন্য আবেদন করতে পারবেন, অন্যদিকে সর্বাধিক দুটি বিষয়ে যারা ফেল করেছেন তারা আবারো পরীক্ষার সুযোগ পাবেন আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যেই।
যদিও সরকার আরো কয়েকদিন আগেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। শনিবার সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
শিক্ষাবোর্ডের সিদ্ধান্ত আগামী ডিসেম্বরেই এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে এবং এই বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে একটি পূর্নাঙ্গ নীতিমালা বা বিজ্ঞপ্তিও জারি করা হবে দুই একদিনের মধ্যেই।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি সৈয়দ আখতারুজ্জামান বলেন, ‘দুই বিষয়ের বেশি যারা ফেল করেছে তাদের পরবর্তী বছরের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। আর সর্বোচ্চ যারা দুই বিষয়ে ফেল করেছে তাদের পরীক্ষা এবং ফলাফল দুইটিই ডিসেম্বরে মধ্যে আমরা সম্পন্ন করবো। যাতে তাদের একটি বছর নষ্ট না হয়।’
তবে, এজন্য একটি নিদিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিয়ে তারপর নিবন্ধন করতে হবে। নিবন্ধন শেষেই পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাবেন অন্তত দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীরা।
তবে এই নিবন্ধন ফি কত হবে বা কী পরিমাণ হবে সেই বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলেও জানান এই বোর্ড কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, যারা এক সাবজেক্ট পরীক্ষা দেবে তাদের ফি থাকবে এক রকম। যারা দুই সাবজেক্ট পরীক্ষা দেবে তাদের ফি থাকবে আরেকটু বেশি। তবে এটি কী পরিমাণ হবে সেটি এখনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
ঢাকা এগিয়ে, পিছিয়ে বরিশাল
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা গত দোসরা জুলাই থেকে শুরু হয়ে শেষ হয় গত আটই আগস্ট। বন্যার কারণে চট্টগ্রাম বোর্ডের পরীক্ষা পেছানো হয়েছিল।
ফলাফলে দেখা গেছে, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডসহ ১১টি শিক্ষাবোর্ড ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করেছে।
এর মধ্যে পাশ ও জিপিএ ফাইভ প্রাপ্তিতে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষার্থীরা। ঢাকা শিক্ষাবোর্ডে ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। তাদের মধ্যে জিপিএ ফাইভ পেয়েছে ১৬ হাজার ৭১৪ জন।
ঢাকার পরেই পাশের দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশের মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষার্থীরা। মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে পাশের হার ৬১ দশমিক ০৭ শতাংশ, আর জিপিএ ফাইভ পেয়েছে ৩২৫০ জন।
এছাড়া অন্যান্য বোর্ডগুলোর মধ্যে পাসের হার চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৫১ দশমিক ৪৪ শতাংশ, সিলেটে ৫০ দশমিক ৯০ শতাংশ, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে ৪৮ দশমিক ০৪ শতাংশ, দিনাজপুরে ৪৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে ৪৫ দশমিক ০৬ শতাংশ, যশোর শিক্ষা বোর্ডে ৪৪ দশমিক ৯২ শতাংশ।
আর সবচেয়ে পিছিয়ে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে। এই বোর্ডে পাশের হার এবং জিপিএ ফাইভ দুটোই কম। বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। তাদের মধ্যে জিপিএ ফাইভ পেয়েছে মাত্র ৯৫০ জন।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান বলেছেন, রাজধানী বাদে সারাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিত হার অনেক কম থাকে। যারা শুধুই ফরম পূরণ করে পরীক্ষা দেয়, সেক্ষেত্রে তো তাদের পাশের সম্ভাবনাও কমে যায়।
সূত্র: বিবিসি