যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের চমক দেখিয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আসনে জয় পেয়ে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে দলটি।
বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে জয় পেয়েছে দলটি। এর মধ্য দিয়ে বারাক ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদের পর প্রথমবারের মতো কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের কোনো কক্ষেই নিজের দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারলেন না।
ইতিমধ্যে কয়েকজন ডেমোক্র্যাট নেতা এই ফলাফলকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, নির্বাচনি প্রচারে বিরোধীরা তার দলকে ছাড়িয়ে গেছে।
ডেমোক্রাটরা কীভাবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেল এবং এই ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে তারা কী করতে পারে, তা নিয়ে এ প্রতিবেদন।
সিনেটে বড় ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা
সিনেটে বেশ কয়েকটি আসনে রিপাবলিকানদের হারিয়ে জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এর মধ্যে এমন অনেক আসন রয়েছে, যেগুলোতে কয়েক দশক ধরে দলটি জিততে পারেনি।
জেমস তালারিকো, টেক্সাস
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই অঙ্গরাজ্যে ১৪ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জিতেছিলেন ট্রাম্প। তিনি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে সমর্থন দিয়েছিলেন। প্যাক্সটনের বিরুদ্ধে আগে জালিয়াতির অভিযোগে মামলা হয়েছিল এবং অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় একবার অভিশংসিতও হয়েছিলেন তিনি। ৩২ বছরের মধ্যে টেক্সাসে কোনো অঙ্গরাজ্যব্যাপী নির্বাচনে জয়ী হওয়া প্রথম ডেমোক্র্যাট তিনি।
অ্যাডাম হ্যামিলটন, কানসাস
১৯৯৪ সালের পর টেক্সাসে যে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন তালারিকো, কানসাসে তার চেয়েও বড় সাফল্য পেয়েছেন হ্যামিলটন। ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া রিপাবলিকান প্রার্থী রজার মার্শালকে হারিয়েছেন তিনি। কানসাসে সর্বশেষ ১৯৩২ সালে সিনেটের আসনে জয় পেয়েছিল ডেমোক্র্যাটরা।
জশ তুরেক, আইওয়া
২০১৪ সালে আইওয়ায় ১৪ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে এবারের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিনেট নির্বাচনে চার শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন তুরেক।
অ্যানি অ্যান্ড্রুজ, সাউথ ক্যারোলাইনা
২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প এই অঙ্গরাজ্যেও বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন। চলতি বছরের শুরুর দিকে মারা যাওয়া ট্রাম্পের মিত্র ও দীর্ঘদিনের সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের আসন ছিল এটি। নির্বাচনের আগপর্যন্ত ওই আসনে গ্রাহামের বোন ডার্লিনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ট্রাম্পও তাকে জোরালো সমর্থন দিয়েছিলেন। তবে শেষপর্যন্ত অন্তত চার শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন অ্যান্ড্রুজ।
রয় কুপার, নর্থ ক্যারোলাইনা
আগে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা আসনটি ডেমোক্র্যাটদের করে নেওয়ার পাশাপাশি বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছেন কুপার। রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক ওয়াটলিকে প্রায় ২০ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে হারিয়েছেন তিনি।
ট্রয় জ্যাকসন, মেইন
রিপাবলিকানদের দখলে থাকা আসনটি নিজেদের করে নিয়েছেন জ্যাকসন। প্রায় সাত শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে সুসান কলিন্সকে হারিয়েছেন তিনি।
শেরড ব্রাউন, ওহাইও
রিপাবলিকান প্রার্থী জন হুস্টেডকে প্রায় চার শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে হারিয়েছেন ব্রাউন।
আবদুল এল-সায়েদ, মিশিগান
এই আসনটি আগে থেকেই ডেমোক্র্যাটদের দখলে ছিল। এবার ট্রাম্প-সমর্থিত রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন এল-সায়েদ। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর হতে যাচ্ছেন তিনি।
প্রতিনিধি পরিষদেও জয়
এপির তথ্য অনুযায়ী, ৪৩৫ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজনীয় ২১৮টি আসন পেরিয়ে জয় নিশ্চিত করেছে ডেমোক্র্যাটরা। এই জয়ের মধ্যে আগে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির দখলে থাকা কয়েকটি আসনও রয়েছে।
সিনেটে জয়ের ঘোষণা আসার কয়েক ঘণ্টা পর প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের খবর জানায় এপি।
ডেমেক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের ক্ষমতা কতটা?
আইন প্রণয়ন ও সরকারি ব্যয় অনুমোদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট। তবে কোনো কক্ষই এককভাবে সব সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। আবার দুই কক্ষের কিছু ক্ষমতা রয়েছে, যা অন্যটির নেই।
যেমন, প্রেসিডেন্টের শীর্ষ সরকারি পদে মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়োগ অনুমোদনের একক ক্ষমতা সিনেটের। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের মনোনীত রাষ্ট্রদূত, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং ফেডারেল বিচারকদের নিয়োগ আটকে দিতে পারবে। এমনকী সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগও এর আওতায় পড়বে।
ট্রাম্পকে কি জবাবদিহির আওতায় আনা যাবে?
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির গভর্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্স ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো লরা ব্লেসিং মনে করেন, ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস তদন্তের সাংবিধানিক ক্ষমতা সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করবে।
তিনি বলেন, ‘সময় ব্যয় ও সংবাদপত্রের শিরোনামের হিসাবে ডেমোক্র্যাটরা সবচেয়ে বেশি তৎপরতা দেখাবে তদন্তের ক্ষেত্রেই।’
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ করতে পারবে?
আগামী ৩ জানুয়ারির আগে সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হবে না। ফলে, পরবর্তী দুই মাস ইরান যুদ্ধের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ত্রিতা পারসি।
তার আশঙ্কা, মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের প্রতিক্রিয়ায় ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগেই ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও জোরদার করতে পারেন। ‘অপমান ও পরাজয়ের মুখে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন, এমন প্রবণতা আমরা দেখেছি।’
জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে পারবে?
অর্থনীতিবিদ ডিন বেকার মনে করেন, এই উদ্বেগ কমাতে ডেমোক্র্যাটদের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপগুলোর একটি হতে পারে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া।
ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সীমিত করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি ও সার বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ।
বেকারের মতে, যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সিনেটে তদন্ত শুরু হলে যুদ্ধ বন্ধের রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে। এর ফলে জ্বালানি তেলের দাম কমতে পারে এবং পারিবারিক ব্যয়ের ওপর চাপ কিছুটা প্রশমিত হতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিতে পারে
২০২৫ সালে সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা আইন বা অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্টের বর্ধিত ভর্তুকির মেয়াদ শেষ হওয়ায় অনেক মার্কিন নাগরিককে স্বাস্থ্যবিমার জন্য বেশি প্রিমিয়াম দিতে হচ্ছে। ডেমোক্র্যাটরা এসব ভর্তুকি পুনর্বহালের চেষ্টা করতে পারে। পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি মেডিকেইডে করা কাটছাঁটও প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিতে পারে তারা।