যশোর, বাংলাদেশ || রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

যশোর জেনারেল হাসপাতালের তিনশ’ গজের ভেতর ক্লিনিকের ছড়াছড়ি

সৈয়দ শাহ মোস্তফা হাসমী

, যশোর

প্রকাশ : রবিবার, ১৯ এপ্রিল,২০২৬, ১১:০০ এ এম
আপডেট : শনিবার, ১৮ এপ্রিল,২০২৬, ১১:২৯ পিএম
যশোর জেনারেল হাসপাতালের তিনশ’ গজের ভেতর ক্লিনিকের ছড়াছড়ি

যশোর জেনারেল হাসপাতালের সামনের সড়কেই সারিবদ্ধভাবে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

১৯৮২ সালের দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালের তিনশ গজের মধ্যে কোনো বেসরকারি ক্লিনিক বা ল্যাবরেটরি স্থাপন করা বা চালানো নিষিদ্ধ। কিন্তু যশোরে এই আইনের কোনো তোয়াক্কাই করা হচ্ছে না। এমনকী এই সকল প্রতিষ্ঠানের নেই কোনো হালনাগাদ লাইসেন্স। ফলে, এসব প্রতিষ্ঠান সেবার নামে সাধারণ মানুষকে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ফেলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের ঘোপ নওয়াপাড়া রোডের পাঁচশ’ মিটারের মধ্যে হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনেই নিয়ম ভেঙে গড়ে তোলা হয়েছে অন্তত ২০টি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। যার মধ্যে ১৩টিরই কোনো বৈধ লাইসেন্স বা হালনাগাদ কাগজপত্র নেই। যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই বছরের পর বছর এসব প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ঘিঞ্জি পরিবেশে নামমাত্র সুযোগ-সুবিধায় চলছে এসব ক্লিনিক। ‘ইউনিক হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ মাত্র ২৫০ বর্গফুটের এক একটি কক্ষে পাঁচ থেকে ছয়টি করে শয্যা পাতা হয়েছে। একই ভবনের নিচতলায় ‘কমটেক ডায়াগনস্টিক’ এবং পাশের ফ্ল্যাটে ‘অর্থোপেডিক ক্লিনিক’ পরিচালিত হচ্ছে।

বিপজ্জনক চিত্র দেখা গেছে ‘ল্যাবজোন স্পেশালাইজড হসপিটাল, কমটেক ডায়াগনস্টিক’, পাশের ফ্ল্যাটে ‘অর্থোপেডিক ক্লিনিক’ এবং ডিএনএ, পিয়ারলেস ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। সেখানে নেই কোনো প্যাথলজিস্ট, ডিপ্লোমাধারী সেবিকা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য নেই উন্নতমানের যন্ত্রপাতি। এছাড়া ‘পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার’সহ পাশের ভবনগুলোতে গাদাগাদি করে গড়ে তোলা হয়েছে একের পর এক চিকিৎসালয়। যশোর জেনারেল হাসপাতালে আসা অসহায় রোগীদের কেন্দ্র করেই প্রতিষ্ঠানের মালিকরা অর্থ আয়ের জন্য মূলত সরকারি হাসপাতালের সামনেই সারিবদ্ধভাবে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক গড়ে তুলেছেন।

যশোর সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮২ সালের মেডিকেল প্র্যাকটিস, প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ অধ্যাদেশে বেসরকারি হাসপাতাল গঠন এবং পরিচালনার দিক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘সরকারি হাসপাতালের তিনশ গজের মধ্যে কোনো বেসরকারি হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিক থাকতে পারবে না।’ কিন্তু আইন অনুযায়ী যশোর জেনারেল হাসপাতালের সামনের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্থাপন করার ক্ষেত্রে মানা হয়নি কোনো নিয়মনীতি এমনকী সড়কের অজুহাত দিয়ে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ওইসকল প্রতিষ্ঠানকে হালাল করেছেন। বিনিময়ে প্রতিমাসে একটি অংকের খাম প্রতিষ্ঠানে ক্লিনিক মালিকরা দিয়ে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে অভিযোগ উঠেছে, অবৈধভাবে গড়ে ওঠা কমটেক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসাসেবার কোনো পরিবেশ নেই। দালালের ওপর নির্ভর করেই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করা হয়। এছাড়া নিয়োগকৃত দালালরা যশোর জেনারেল হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে রোগী ভাগিয়ে আনার পর ‘গলাকাটা বাণিজ্য’ করে থাকেন। বিশেষজ্ঞ প্যাথলজিস্ট ও ল্যাব টেকনশিয়ান না থাকলেও রোগীদের প্যাথলজি রিপোর্ট হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য উন্নতমানের যন্ত্রপাতিও নেই। মূলত রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করে অর্থ হাতানোর ধান্ধায় ব্যস্ত রয়েছেন কমটেক কর্তৃপক্ষ।

ইউনিক হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধেও অভিযোগের শেষ নেই। আলোচিত এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি নানা অনিয়মের মধ্যে পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া রয়েছে অপচিকিৎসার অভিযোগ। যশোর জেনারেল হাসপাতালের কয়েক চিকিৎসক সরকারি এই হাসপাতাল থেকে হাত-পা ভেঙে যাওয়া রোগীদের গোপনে ইউনিক হসপিটালে পাঠিয়ে দেন বলেও অভিযোগ আছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মচারী জানান, বছরখানেক আগে এখানে ডাক্তার আনসার আলীর অপচিকিৎসায় চৌগাছার মাড়ুয়া গ্রামের দিনমজুর ফজলুর রহমানের ছেলে শামিনুর রহমানের (১০) জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। গরু বিক্রির টাকা দিয়ে ছেলেকে চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হন ফজলুর। এ ঘটনায় তখন রোগীর স্বজনরা ইউনিক হসপিটালে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেন। তখন হাসপাতালের পরিচালক উজ্জ্বল বিশ্বাস জখম হয়েছিলেন। পরে তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানে ওয়ার্ডগুলোতে ছোট ছোট কক্ষে ছয় থেকে আটটি করে শয্যা রয়েছে। মোটা অঙ্কের টাকা ব্যয় করেও আরামদায়ক পরিবেশে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা।

ভুক্তভোগী যশোর সদরের রূপদিয়া আবাদ কচুয়া গ্রামের বাসিন্দা হায়দার আলী, সদর উপজেলার বাহাদুরপুর পার্ক এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন টগরসহ একাধিক রোগীর অভিযোগ, জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অসহায় রোগীদের টার্গেট করে সক্রিয় থাকে একটি শক্তিশালী দালাল চক্র। উন্নত চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের টেনে আনা হয় সামনের এসব নিম্নমানের ক্লিনিকে। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কিংবা আধুনিক সরঞ্জাম না থাকলেও রোগীদের কাছ থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার নামে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। মূলত সরকারি হাসপাতালের রোগীদের জিম্মি করেই এসব প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছে বলে তারা জানিয়েছে। তারা আরও অভিযোগ করেন, কোনো রোগী ওইসকল প্রতিষ্ঠানে যেতে না চাইলে দালালরা রোগীকে মারপিটও করে থাকে। বিশেষ করে ডিএনএ, ইউনিক, পিয়ারলেস, ল্যাবজোন স্পেশালাইজ্ড হসপিটালের দালালরা এ কাজ করে থাকেন।

সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে এবং রোগীদের হয়রানি বন্ধে অবিলম্বে এসব অবৈধ ক্লিনিক উচ্ছেদ করে মানুষের স্বাস্থ্যসেবার মান ফিরিয়ে আনা জন্য প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন ভুক্তভোগীরা।

যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার হুসাইন শাফায়েত সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘হাসপাতালের দালাল রয়েছে, এটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু তারা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। প্রতিবার জেলা আইনশৃঙ্খলার মিটিংয়ে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। তারপরও প্রশাসন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। চিকিৎসক হয়ে তো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব নয়।’

যশোরের সিভিল সার্জন ডক্তার মাসুদ রানা সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিকগুলো নিয়মিত অভিযান শুরু হয়েছে। অচিরেই যশোর শহরে অভিযান পরিচালনা করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, সরকারি নিয়মনীতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে তাদের তালিকা করা হবে। বিশেষ করে বৈধ কাগজপত্রহীন এবং মানহীন ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুতই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)