সুবর্ণভূমি ডেস্ক
চুরির অভিযোগে পিরোজপুরে পুলিশ অফিসার্স মেসের এক অস্থায়ী কেয়ারটেকারের ওপর বর্বর নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এ সময় স্বীকারোক্তিতে বাধ্য করতে অভিযুক্তকে বৈদ্যুতিক শক ও মোম গলিয়ে পুরুষাঙ্গে ঢেলে ঝলসে দেন ডিবির ওসি মো. আরিফুল ইসলাম।
ভুক্তভোগী মো. ইউনুস ফকির (৪০) পিরোজপুর সদর উপজেলার খানাকুনিয়ারি গ্রামের মৃত মোবারক আলী ফকিরের ছেলে। তিনি ওই পুলিশ অফিসার্স মেসে অস্থায়ী কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করতেন। ১৩ এপ্রিল সোমবার এ ঘটনাটি ঘটলেও শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
ভুক্তভোগীর পরিবার জানিয়েছে, পিরোজপুর পুলিশ লাইনস সংলগ্ন একটি ভবনের দ্বিতীয় তলার মেসে থাকেন ডিবির ওসি মো. আরিফুল ইসলাম। তার কক্ষের দুটি চাবির একটি ইউনুসের কাছে ছিল। ওসি আরিফ সোমবার ১৩ এপ্রিল দুপুরে ইউনুসের কাছে থাকা চাবিটি ফেরত চায়। ইউনুস চাবি দিতে ব্যর্থ হলে ওসি আরিফের কক্ষ থেকে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা চুরি হয়েছে বলে জানিয়ে ইউনুসকেই সেই টাকা চুরির জন্য দোষারোপ করা হয়।
টাকা চুরির কথা অস্বীকার করায় তাকে হাতকড়া পরিয়ে শারীরিক নির্যাতন ও বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়। নির্যাতনের সময় ইউনুস চিৎকার করলে তার মুখে লাঠি ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। মেসের রান্নাঘরে নিয়ে গরম মোম গলিয়ে পুরুষাঙ্গে ঢেলে ঝলসে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগে জানানো হয়।
এরপর ডিবি পুলিশের লোকজন ইউনুসকে তার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যায়। তখন পরিবারের সদস্যরা টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য ওই রাত পর্যন্ত সময় চান। এরপর মেসে ফেরত নিয়ে এসে আবারও ইউনুসের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। ঘটনার পর পরিবারের সদস্যরা আরিফকে টাকাগুলো পৌঁছে দেন। টাকা পাওয়ার পর ইউনুসকে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর আহমেদ সিদ্দিকীর কাছে নেওয়া হয়।
পুলিশ সুপার ইউনুসের কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত শোনার পর ওই মেসের ঝাড়ুদার শাকিলকে ডেকে পাঠান। জিজ্ঞাসাবাদে শাকিল টাকা চুরির কথা স্বীকার করে এবং চুরি যাওয়া টাকা ফেরত দেয়। পরে ইউনুসের পরিবারের দেওয়া টাকা তাদের ফেরত দেওয়া হয়।
ইউনুসকে চিকিৎসার জন্য তার পরিবার জেলা সরকারি হাসপাতালে নিতে চাইলে পুলিশ সুপার কার্যালয়ের কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির তাকে শহরের একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে চিকিৎসা করান। নির্যাতনের বিষয়টি জানাজানি হবে, এই ভেবে চিকিৎসকের কাছে ইউনুসের সমস্যার বিষয়ে কিছুই বলতে দেননি তারা।
পরদিন ডিবি পুলিশ ইউনুসকে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেয়। সেখানে ইউনুসকে বলতে বাধ্য করা হয় যে, স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করে সে নিজেই নিজের পুরুষাঙ্গ পুড়িয়ে দিয়েছে এবং পড়ে গিয়ে আঘাত পেয়েছে।
ভুক্তভোগীর ভাই আনিসুর রহমান জানান, এ ঘটনার পর তার ভাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। এছাড়া পুলিশের সঙ্গে পেরে উঠবেন না ভেবে তারা কোথাও কোনো অভিযোগ দেননি। তবে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হবে বলে পুলিশ সুপার ইউনুসের পরিবারকে আশ্বাস দিয়েছেন। বিষয়টি চেপে যাওয়ার জন্য ডিবির পক্ষ থেকে ইউনুসকে একটি কর্মসংস্থানের আশ্বাসও দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত ডিবি ওসি আরিফুল ইসলামের মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বর্তমানে তিনি ছুটিতে আছেন। তবে কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি এ বিষয়টি নিয়ে ‘নিউজ না করার’ জন্য বারবার অনুরোধ জানান এবং প্রয়োজনে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর আহমেদ সিদ্দিকী এ বিষয়ে জানান, ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ডিবির ওসি আরিফুল ইসলামসহ তিনজনকে ক্লোজ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ঘটনার তদন্ত চলছে, সত্যতা পেলে দোষীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সূত্র: যুগান্তর