সরোয়ার হোসেন
, যশোর
গত ২ ফ্রেব্রুয়ারি যশোর সফর করেছিলেন তারেক রহমান। তখন দলীয় প্রধান হিসেবে নির্বাচনি কর্মসূচিতে অংশ নিতে এসেছিলেন। বলেছিলেন, ‘আপনারা বিএনপিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় নিলে যশোরের উন্নয়নে সম্ভাব্য সব কিছু করা হবে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে খনন করা ঐতিহাসিক উলাশী খাল পুনঃখনন করে কৃষির উন্নয়ন ঘটানো হবে। যশোর মেডিকেল কলেজে ৫০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে।’
মাত্র তিন মাসও পূরণ হয়নি। ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয় উপহার দিয়ে দেশবাসী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপিকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছে। তিনি হয়েছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। এরইমধ্যে যশোরবাসীর কাছে দেওয়া নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে যশোর আসছেন তারেক রহমান।
আজ সকাল থেকে তিনি ধারাবাহিক কর্মসূচিতে ব্যস্ত সময় পার করবেন মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা যশোরে। তিন মাসের ব্যবধানে নিজের জীবনের মাত্র দ্বিতীয় সফরে তিনি যশোরবাসীর সামনে উপস্থিত হচ্ছেন ভিন্ন দুই পরিচয়ে-দলীয় ও সরকার প্রধান। প্রথম সফরটি ছিল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি প্রদান করে জনতার ভোট আদায় করা, আর এবারের সফর সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের।
স্বাভাবিকভাবেই তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমনকে ঘিরে উচ্ছ্বসিত যশোরবাসী। তাকে বরণ করে নিতে শহর যশোর থেকে শুরু করে পুরো জেলায় সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। প্রিয় নেতাকে স্বাগত জানিয়ে ব্যানার, ফেস্টুন আর প্লাকার্ডে ছেয়ে গেছে গোটা জনপদ। প্রতিদিন বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনসমূহের বর্ণাঢ্য মিছিলে মুখরিত হয়েছে শহর-গ্রাম। একের পর এক প্রস্তুতি সভায় জনতার ঢল নামাতে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক পরিকল্পনা।
উলাশী খাল পুনঃখনন
সরকারি সফরসূচি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকা জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যশোরের উদ্দেশে যাত্রা করবেন সকাল সাড়ে ৯টায়। তিনি যশোর বিমানবন্দরে পৌঁছুবেন সকাল সোয়া ১০টায়। এখান থেকে সড়কপথে সরাসরি চলে যাবেন শার্শা উপজেলার উলাশী ইউনিয়নে। সেখানে বেলা সাড়ে ১১টায় খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধন করবেন তিনি। এরপর পৃথক দুটি সুধী সমাবেশে বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী।
১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর উলাশী থেকে যদুনাথপুর পর্যন্ত চার কিলোমিটারের খাল খনন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পিতা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল খালের উদ্বোধনও করেছিলেন তিনি।
কিন্তু, ৫০ বছরের বঞ্চনা, অযত্ন, অবহেলায় খালটি এখন মৃতপ্রায়। একদিন এই খাল খননের মধ্যদিয়ে এলাকার কৃষিসহ সার্বিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অভূতপূর্ব জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। এটি খনন করতে এলাকার হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন। স্থানীয়দের কাছে অতি ভালোবাসার ‘জিয়া খাল’ নামে পরিচিত উলাশী খালে প্রাণের জোয়ার আনতে কোদালে মাটি কাটবেন শহীদ রাষ্ট্রপতির ছেলে আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জেলা বিএনপির একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, খাল খনন কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রী মূলত স্থানীয় কৃষকদের নিয়ে সমাবেশে মিলিত হবেন। এটি দলীয় কোনো কর্মসূচি হবে না। তিনি আলাপ করবেন খালপাড়ের মানুষদের সাথে। শুনবেন খননের শুরুর কাহিনি। জানবেন দীর্ঘ ৫০ বছরের বঞ্চনার ইতিহাসও। এটি রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি হলেও রাজনৈতিক উচ্ছ্বাসের কোনো খামতি নেই। ফলে প্রধানমন্ত্রীর প্রতীক্ষায় পুরো শার্শা সেজেছে উঠেছে। রাস্তাঘাট সংস্কার করা হয়েছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে বিস্তীর্ণ এলাকা। ফুটপাথের অবৈধ দখল মুক্ত করা হয়েছে। সার্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে ঐতিহাসিক যশোর রোডকে এদিন নো-পার্কিং জোন ঘোষণা করা হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে।
যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
সফরসূচি অনুযায়ী উলাশী থেকে প্রধানমন্ত্রী যশোরের শংকরপুরে মেডিকেল কলেজের উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন দুপুর সোয়া ১২টায়। এখানে তিনি ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করবেন।
যশোর উন্নয়নের কারিগর হিসেবে পরিচিতি বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির প্রয়াত নেতা ও সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় যশোর মেডিকেল কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় বিএনপি সরকারের আমলে। কাজ শেষে ২০১০ সালে উদ্বোধন হয় যশোর মেডিকেল কলেজ। তবে, প্রতিষ্ঠার ১৬ বছরেও যশোরবাসী একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ পায়নি। অপূর্ণতা রয়ে গেছে ৫০০ শয্যার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল স্থাপিত না হওয়ায়।
মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীসহ যশোরবাসী একের পর এক আন্দোলন সংগ্রাম করেও এই হাসপাতাল নির্মাণ করাতে পারেনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। যে অপূর্ণতা এবার ঘুচতে যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত দিয়ে। তিনি আজ দুপুর সোয়া ১টায় যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করবেন।
ঐতিহ্যবাহী যশোর পাবলিক লাইব্রেরি
ঐতিহ্যবাহী যশোর পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এটির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৮৫১ সালে অর্থাৎ ১৭৫ বছর আগে। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত যশোর পাবলিক লাইব্রেরি উপমহাদেশের প্রাচীনতম পাঠাগারগুলোর মধ্যে অন্যতম। পরবর্তীতে যা স্বাধীন বাংলাশেরও প্রথম ও বৃহৎ বেসরকারি গণ-গ্রন্থাগার। পরবর্তীতে ১৯২৮ সালে যশোর পাবলিক লাইব্রেরি, টাউন ক্লাব ও নিউ আর্য থিয়েটার একীভূত হয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় যশোর ইনস্টিটিউট।
যশোর ইনস্টিটিউটের অধীনে রয়েছে বি সরকার ঘূর্ণায়মান মঞ্চ এবং একটি সিনেমা হল, যা তসবির সিনেমা হল নামে পরিচিত। যশোর ইনস্টিটিউট নাট্যকলা সংসদ একটা সময় ধারাবাহিকভাবে ভালো ভালো নাটক, যাত্রাপালা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপহার দিয়েছে।
এখানে রয়েছে যশোরের আর একটি ঐতিহাসিক স্থান-যশোর টাউন হল ময়দান বা মুনসী মেহেরউল্লা ময়দান। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে দেশের প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা যশোরে ১১ ডিসেম্বর অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই সরকারের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতারা সে জনসভায় বক্তব্য রেখেছিলেন।
এই টাউন হল ময়দানে দেশের অনেক বড় বড় নেতা জনসভায় বক্তব্য প্রদান করেছেন। কিন্তু কোন সরকারপ্রধান কখনো যশোর ইনস্টিটিউট বা পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন করেননি। তারেক রহমানই প্রথম সরকারপ্রধান হিসেবে আজ দুপুর ১টা ৩৫ মিনিটে যশোর ইনস্টিটিউট বা পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন করবেন।
রাজনৈতিক জনসভা
পাবলিক লাইব্রেরি পরিদর্শন শেষে প্রধানমন্ত্রী সার্কিট হাউজে যাবেন ১টা ৫০ মিনিটে। সেখান থেকে ঈদগাহে বিএনপি আয়োজিত জনসভায় যোগদান করবেন বিকেল সাড়ে ৩টায়। এখানে তিনি যশোর তথা দেশবাসীর উদ্দেশ্যে ভাষন দেবেন।
এটা হবে তারেক রহমানের যশোরে দ্বিতীয় সফরে দ্বিতীয় প্রকাশ্য জনসভায় যোগদান। ২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনি জনসভায় তিনি শহরের অনেক বাইরে বক্তব্য রেখে ফিরেছিলেন। এবার তিনি খোদ শহর যশোরের প্রাণকেন্দ্রে জনতার উদ্দেশে বক্তৃতা করবেন। জনসভাসহ যশোরের সার্বিক কর্মসূচি নিয়ে তাই গত কয়েক দিন থেকে চলছে তোড়জোড়।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে যশোরে বরণ করতে প্রস্তুত যশোরবাসী। প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতাকর্মী-সকল ক্ষেত্রেই ব্যাপক কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হয়েছে। শহরের রাস্তাগুলোতে দেওয়া হয়েছে নতুন প্রলেপ।
গলি থেকে রাজপথ-সর্বত্রই প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়ে টাঙানো হয়েছে ব্যানার, ফেস্টুন, প্লাকার্ড, সাটানো হয়েছে পোস্টার। প্রচার মাইক দাপিয়ে বেড়িয়েছে সর্বত্র। সমানতালে চলেছে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর প্রচার মিছিল বা শুভেচ্ছা মিছিল। একইসাথে চলেছে প্রচারণামূলক লিফলেট বিতরণ।
বসে ছিলেন না জেলা, উপজেলার নেতারাও। তারা একের পর এক সমন্বয় সভা করছেন-দলীয় প্রধানের জনসভাকে জনসমুদ্রে পরিণত করতে। যে পালে হাওয়া দিতে খোদ মাঠে ছিলেন দলের খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক নার্গিস বেগম।
যশোর জেলা বিএনপি সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে দলের নেতাকর্মীদের সাথে সাধারণ মানুষও উচ্ছ্বসিত। তার এই আগমন কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়। এর মাধ্যমে যশোরের উন্নয়নের চাকা নতুন করে সচল হবে। যা বিগত ১৭ বছর থমকে গিয়েছিল।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সফল করার জন্য যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, আমরা ইতিমধ্যে এসএসএফ-এর সাথে জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের সমন্বয়ে সকল ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। রাস্তার দু’পাশে যেসব অবৈধ স্থাপনা ছিল মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সেগুলো উচ্ছেদ করা হয়েছে।
এছাড়া বিজিবি, র্যাব, ডিএসবি, ডিজিএফআই ও এনএসআইসহ সকল গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে সকল প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যে রাস্তা দিয়ে যাবেন সেই রাস্তা আমরা নো পার্কিং করে দেবো। যাতে করে জনসাধারণ ও প্রধানমন্ত্রীর সফরে কোনো অসুবিধা না হয়। এছাড়া, ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে প্রতিনিয়ত আনসার, বিজিবি ও র্যাবের টহল চলছে।
মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে জনগণের কাছে দেওয়া নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমনকে তাই উদ্বাহু স্বাগত জানাতে প্রস্তত যশোরবাসী। যশোরে ফের স্বাগত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান