সুবর্ণভূমি ডেস্ক
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ শেষের দিকে দ্রুতই এগিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এই খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে বড় ধরনের পতন দেখা দিলেও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে সোনার দাম। সপ্তাহের ব্যবধানে গুরুত্বপূর্ণ এই দাতুটির দাম বেড়েছে ৩ শতাংশের বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির ইঙ্গিত মিলতেই মার্কিন ডলার ও তেলের দাম কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকছেন সোনার দিকে।
মার্কিন বার্তা সংস্থা সিএনবিসি বলছে, বুধবার স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম ৩ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স চার হাজার ৭০৩ দশমিক ০৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ২৭ এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ। একই সময়ে জুন ডেলিভারির মার্কিন স্বর্ণ ফিউচারও ৩ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে চার হাজার ৭১৪ ডলারে পৌঁছেছে।
বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাক্টিভট্রেডসের বিশেষজ্ঞ রিকার্ডো এভানজেলিস্তা বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিকভাবে জাহাজ চলাচল শুরু হলে মূল্যস্ফীতির চাপ কমবে এবং ২০২৬ সালে সুদের হার কমানোর মতো পরিবেশ তৈরি হতে পারে। ফলে পারস্য উপসাগর অঞ্চলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ডলার দুর্বল হবে এবং বন্ডের সুদহার কমবে- যা সোনার জন্য ইতিবাচক।
এ অবস্থায় বছরের শেষে সোনার দাম পাঁচ হাজার ডলার ছাড়িয়ে পাঁচ হাজার ৫০০ ডলারের কাছাকাছি যেতে পারে বলে জানান তিনি।
অন্যান্য ধাতুর বাজারেও বড় উত্থান দেখা গেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, স্পট রুপার দাম ৫.৭ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৭৬.৯৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। প্লাটিনামের দাম ৩.৪ শতাংশ বেড়ে ২০২০.০৫ ডলারে এবং প্যালাডিয়ামের দাম ৩.৩ শতাংশ বেড়ে ১৫৩৪.৪২ ডলারে পৌঁছেছে।
এদিকে, তেলের দাম কমার প্রত্যাশায় বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন অঞ্চল থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনাই এ প্রবণতার মূল কারণ।
সাধারণত তেলের দাম বেশি থাকলে তা মূল্যস্ফীতি বাড়ায় এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে সুদের হার বাড়ানোর দিকে ঠেলে দেয়। এতে সোনার আকর্ষণ কমে যায়, কারণ উচ্চ সুদে অন্যান্য সম্পদ বেশি লাভজনক হয়ে ওঠে। কিন্তু বর্তমানে তেলের দাম কমার ফলে সেই চাপ কিছুটা কমেছে, যা সোনার জন্য সহায়ক হয়েছে।
ডলার দুর্বল হওয়াও সোনার দামে প্রভাব ফেলেছে। কারণ ডলারে মূল্য নির্ধারিত সোনা অন্যান্য মুদ্রার বিনিয়োগকারীদের জন্য তখন তুলনামূলক সস্তা হয়ে যায়।
এখন বিনিয়োগকারীদের নজর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক তথ্যের দিকে। দিনের পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত হবে বেসরকারি খাতের কর্মসংস্থানের তথ্য, আর সপ্তাহের শেষে আসবে বহুল প্রত্যাশিত নন-ফার্ম পেরোল রিপোর্ট। এসব তথ্যের ওপর নির্ভর করেই ফেডারেল রিজার্ভের ভবিষ্যৎ মুদ্রানীতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
এদিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০১ ডলারে নেমে এসেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডাব্লিওটিআই) ৯.২ শতাংশ কমে ৯২.৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তেলের দামের এই পতনের পাশাপাশি শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এসএন্ডপি ৫০০, ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল এভারেজ এবং নাসডাক কম্পোজিট—এই তিন সূচকের ভবিষ্যৎ বাজার শক্তিশালীভাবে খোলার ইঙ্গিত দিয়েছে। এসএন্ডপি ৫০০ আগের দিনের তুলনায় আজকের লেনদেন নতুন রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়।
ইউরোপেও একই চিত্র দেখা গেছে। লন্ডনের এফটিএসই ১০০, জার্মানির ডিএএক্স এবং প্যারিসের সিএসি ৪০—এই প্রধান সূচকগুলোও ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
এশিয়ার বাজারেও ইতিবাচক ধারা অব্যাহত ছিল। দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি সূচক ৬.৪৫ শতাংশ বেড়েছে। যেখানে স্যামসাংয়ের শেয়ার ১৪.৪ শতাংশ লাফিয়ে উঠে প্রথমবারের মতো কোম্পানিটির বাজারমূল্য ১ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে।
এর আড়ে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ শেষ করতে একটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ফলে শিগগিরই শেষ হতে যাচ্ছে দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধ।
মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে সূত্র জানায়, উপসাগরীয় যুদ্ধ শেষ করতে এক পাতার একটি সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম) নিয়ে আলোচনা প্রায় শেষ পর্যায়ে। আর পাকিস্তানি সূত্রের ভাষায়, ‘আমরা খুব শিগগিরই যুদ্ধ শেষ করতে যাচ্ছি। আমরা খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।’
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বাস করছে যে তারা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে এক পাতার একটি সমঝোতা স্মারকের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। এর আগে হরমুজ প্রণালিতে চলমান মার্কিন নৌ-মিশন ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ সাময়িকভাবে স্থগিত করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
অ্যাক্সিওস জানায়, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইরানের প্রতিক্রিয়া পাওয়ার আশা করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এ বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এবং হোয়াইট হাউস তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।