সুবর্ণভূমি ডেস্ক
অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নেমে বিতর্কের মুখে পড়া মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তার মাদকবিরোধী অভিযানের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এর এক দিন পর রোববার তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হলো।
সরকার-সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, রোববার (১৮ অ্টোবর) বিকেলে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাক হোসেনকে ডেকে পাঠান প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তাকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
রোববার রাত পর্যন্ত এ বিষয়ে সরকারের দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে রাত ১০টা ৩৪ মিনিটে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) এ-সংক্রান্ত একটি স্ক্রল প্রচার করা হয়।
এতে বলা হয়, ‘মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর’।
ইশরাকের অস্ত্র হাতে অভিযানে নামার ঘটনায় বিএনপি ও সরকারের ভেতরে অস্বস্তি ও অসন্তোষ তৈরি হয়। বিএনপি ও সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মাদকবিরোধী উদ্যোগে আপত্তি না থাকলেও একজন প্রতিমন্ত্রীর নিজের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে অভিযানে অংশ নেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।
মাদক দমনে প্রশাসনকে সক্রিয় করার পরিবর্তে তিনি কেন নিজেই অস্ত্র হাতে মাঠে নামলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন রাজধানীর হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসিক এলাকার পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে আকস্মিক পরিদর্শন চালাচ্ছেন, তখন প্রতিমন্ত্রীর এমন কর্মকাণ্ড সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে।
গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির একজন সদস্য বলেন, ঘটনাটি শুধু ইশরাকের ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে থাকেনি; এতে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরাও বিব্রত হয়েছেন। একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন আচরণের দায় মন্ত্রিসভাকেও নিতে হবে।
শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর ১৩টি স্থান আকস্মিক পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি আবাসিক এলাকার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং সেবার মান উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশনা দেন তিনি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিস্থিতির উন্নয়নে সময়সীমাও বেঁধে দেন।
প্রধানমন্ত্রীর এসব পরিদর্শনের দিন বিকেলেই ইশরাকের অস্ত্র হাতে অভিযানের ঘটনা ঘটে। দল ও সরকার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ মনে করছেন, ইশরাকের কর্মকাণ্ডের কারণে প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শন ঘিরে তৈরি হওয়া ইতিবাচক আলোচনা অনেকটাই আড়ালে চলে যায়।
এ পরিস্থিতিতে ইশরাককে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার ঘটনাকে সরকারের সদস্যদের আচরণ ও জবাবদিহির প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
যেভাবে অস্ত্র হাতে অভিযানে নামেন ইশরাক
শনিবার বিকেলে রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুন্টিঘর রেলগেট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে যান ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন।
তার নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে চিৎকার করে তিনি বলছেন, ‘এই ধর ধর ধর...।’ এ সময় তার পাশ থেকে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’
ভিডিওতে আরও দেখা যায়, প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা দেহরক্ষীরা কয়েকজনকে ধরতে দৌড়ে যান। তাদের একজন এক তরুণকে লাথি মারেন। এ সময় কয়েকজনকে বলতে শোনা যায়, ‘স্যার আমি কিছু করিনি। আমি গরিব মানুষ স্যার।’ আরেকটি ভিডিওতে আটক ব্যক্তিদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার দৃশ্য দেখা যায়।
ঘটনাস্থলে ইশরাকের ব্যক্তিগতভাবে নিয়োগ করা দুই দেহরক্ষী তোফাজ্জল হোসেন ও লাভলুর পাশাপাশি একজন সরকারি দেহরক্ষীও উপস্থিত ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে নিয়োগ করা দেহরক্ষীদের হাতেও অস্ত্র ছিল।
ইশরাকের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওর কিছু অংশে তার হাতে থাকা পিস্তলের ছবি অস্পষ্ট করে দেওয়া হয়। তবে ভিডিওর অন্য অংশে আগ্নেয়াস্ত্রটি স্পষ্ট দেখা যায়। গুলি করার হুমকি দেওয়া ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ঘটনার পর একজন প্রতিমন্ত্রী এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে পারেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আত্মরক্ষার জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র বহন ও ব্যবহার করা গেলেও অন্যের মনে ভয় বা বিরক্তি সৃষ্টি হতে পারে, এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না।
ইশরাকের অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। রোববার ডিএমপির গণমাধ্যম কেন্দ্রে সংবাদ সম্মেলনে গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, ঘটনাটি তদন্তের দায়িত্ব ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে দেওয়া হয়েছে।
অভিযানের সময় আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরার দাবি ইশরাকের
অস্ত্র হাতে অভিযানে নামা নিয়ে সমালোচনার মধ্যে রোববার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি বিবৃতি দেন ইশরাক হোসেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নিতে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন।
পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও সামাজিক নেতাদের যৌথ সিদ্ধান্তে ওই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল।
ইশরাকের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকা-৬ আসনের গেন্ডারিয়া এলাকার বিভিন্ন স্থানে মাদক কারবারের অভিযোগ পেয়ে তিনি আগে থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করছিলেন।
মাদকবিরোধী কার্যক্রমে জনবলসংকট দূর করা এবং মাদকের আস্তানার কাছে স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের উদ্যোগও নিয়েছিলেন তিনি। তবে তাতে সমস্যার সমাধান হয়নি।
বিবৃতিতে প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন, অভিযানে যাওয়ার আগে তিনি জানতে পারেন, মাদক কারবারিরা ভবনের ছাদ থেকে গুলি চালাতে পারে। একটি অস্থায়ী মাদকের আস্তানার কাছে পৌঁছানোর পর ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি হইচই করতে করতে তাদের গাড়িবহরের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে এগিয়ে আসেন।
সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় নিজের ও অন্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি এবং তার সরকারি নিরাপত্তারক্ষীরা অল্প সময়ের জন্য অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া হয় বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করেন ইশরাক।