তৌহিদ জামান
সাংবাদিকদের নিয়ে সমাজে নানা রকমের কথা প্রচলিত। অনেকেই গোটা সমাজের অবক্ষয়ের জন্য সাংবাদিকদের অবহেলা বা নিশ্চুপ থাকাকে দায়ী করেন। ভাবটা এমন, যেন সাংবাদিকরা ইচ্ছে করলেই সব অনাচার মুহূর্তেই হাওয়া হয়ে যাবে।
আবার, অনেকের ধারণা, যার কোনো গতি নেই, তিনিই এই পেশায় যুক্ত হন। অর্থাৎ, এই পেশায় সম্পৃক্তদের এক হাত দেখে নেওয়ার একটা বিষয় তাদের মগজে সবসময়ই গিজগিজ করে।
সাংবাদিকদের যেমন প্রশংসা করা হয়, তেমনই তাদের নিয়ে কড়া সমালোচনাও প্রতিভাত হয় এই সমাজে।
কথায় কথায় রেফারেন্স দেওয়া হয়, অমুক এমন জাঁদরেল ছিলেন। তমুক সমাজের অসঙ্গতির নানা খুঁটিনাটি তাদের লেখায় চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছিলেন।
আজকে অবশ্য আমার অবতারণা সেইসব কঠিন বিষয় নয়।
এই জগতে অল্প কিছুদিন ঘোরাফেরায় সাংবাদিকদের নিয়ে কিছু সিরিয়াস কথা, কিছু হাসি-ঠাট্টার অবতারণাই মূল উদ্দেশ্য।
সাংবাদিকদের স্পেস নেওয়ার বিষয়ে এক ভদ্রলোক তার সরেস ভাষায় লিখেছিলেন একটি ঘটনা। সেই ঘটনার সারমর্ম পাঠকের কাছে তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারছি না।
ঘটনাটি এমন—কোনো এক শহরের ব্যস্ততম সড়কে দুর্ঘটনায় একটি মৃত্যুর ঘটনা। আমাদের সমাজে যা হয়, দুর্ঘটনাস্থল লোকজন ঘিরে ধরে, কাউকে উদ্ধার করতে না পারলেও উদ্ধারে যারা যাবেন- তাদের আটকে রাখা হয়। তো সেইখানে একজন সাংবাদিকের আগমন ঘটে এবং পরিচিতরা স্বস্তি পেয়ে বলে ওঠে, ‘যাক! এইবার একটা কজের কাজ হবে, সাংবাদিক সাহেব এসে গেছেন।’
কিন্তু সেই ভীড় ঠেলে ভেতরে ঢুকতে পারছেন না ওই সাংবাদিক। কিন্তু তার তো নির্বোধ হলে চলে না, তাই তিনি চিৎকার করে উঠলেন, ‘ভাইগণ! আপনারা সাইড দেন, যিনি দুর্ঘটনায় কবলিত, তিনি আমার বাবা!’
এই কথা শুনে লোকজন তার দিকে তাকায় এবং জায়গা ফাঁকা করে দেন। সাংবাদিক ভেতরে প্রবেশ করে তাকাতেই তার চোখ ছানাবড়া! গাড়িচাপায় রাস্তায় মরে পড়ে রয়েছে একটি কুকুর!
সারাদিন খাটা-খাটুনি আর চিন্তার এক একটি কারখানা হচ্ছে সাংবাদিক। সারাক্ষণ মাথায় ঘুরঘুর করে নানা আইটেম। কেননা তার কাছে স্পষ্ট, আজকের নিউজপেপার আগামীকাল ডাস্ট পেপার... বাসি কোনো কিছুই তার কাছে কেউই প্রত্যাশা করে না। তাকে থাকতে হয় আপডেটেড!
অবশ্য, দিনশেষে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে তার মূল্যায়ন—‘আপনাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না, অযোগ্য লোক, অকম্মার ঢেঁকি!’
আর বিবাহিত হলে, স্ত্রীর কাছে আপনি একজন ভিখেরিরও অধম। আপনার সঙ্গে সংসার মানে তার ইহকাল-পরকাল সব সাঙ্গ!
তবে, বিদগ্ধজনেরা বলছেন, সাংবাদিকের সঙ্গী হওয়ার নানা সুবিধা। সেগুলো হচ্ছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ, সিনেমার প্রিমিয়ার, খেলাধুলা বা কনসার্টের টিকিট জোগাড় করা তাদের কাছে সহজ। তাদের সঙ্গে জীবন হয় অনেক বেশি বৈচিত্র্যময় ও অভিজ্ঞতায় পূর্ণ।
তবে, এ কথা সত্য যে, একজন সাংবাদিক প্রতিদিনের নানা ঘটনা গল্পের মতো করে উপস্থাপন করেন। তাদের এই সৃজনশীলতা অন্দরমহলেও ছড়িয়ে পড়ে।
সাংবাদিকদের অনেকেই কাটখোট্টা কিংবা অসাড় ভাবতে পছন্দ করে। কিন্তু সত্যি বলতে কী তারাই সবচেয়ে ভালো খোঁজ রাখে শহরের সবচেয়ে আনন্দদায়ক স্পট, সেরা রেস্তোরাঁর বিষয়গুলো। যদিও, সেইসব জায়গায় তাদের সঙ্গীর নিয়ে যাওয়া নিয়ে রয়েছে সংশয়। সেটি অবশ্য আলাদা বিষয়।
সাংবাদিকরা হচ্ছে বাবার মতো, তাদের সব বিষয়ে জ্ঞান থাকতে হয়।
অভিজ্ঞতা হচ্ছে, মাস্টার্সের ক্লাসে একবার একজন প্রফেসর বললেন, ‘আপনারা হলেন বাবার মতো। সন্তান যখন আপনাকে প্রশ্ন করবে, আপনাকে সেই উত্তর দিতেই হবে, তা যেভাবে পারেন।’ অবশ্য তিনি যে প্রেক্ষাপটে এই বিষয়ের অবতারণা করেছিলেন—সাংবাদিকতায় তার সাথে কোনো মিল নেই। সাংবাদিকতায় যেমন তেমন করে বোঝানোর কিছু নেই। আপনাকে সবকিছু জেনে, তথ্য-প্রমাণসহ পাঠককে জানাতে হবে।
সেকারণে দেশ-বিদেশের সাম্প্রতিক সব বিষয়েই তাকে আপডেট থাকতে হয়।
মানুষ সহজেই একজন সাংবাদিককে প্রশ্ন করতে পারে, সেকারণে তাকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সম্যক ধারণা এবং কনভিন্স করার মতো আলোচনা চালিয়ে যেতে হয়।
তারা একইসাথে বোকা আবার স্মার্ট- এই একটা বিষয়ের অপূর্ব মিশেল রয়েছে তাদের মধ্যে। বিশ্বের চারপাশে যা ঘটছে তার খোঁজ তারা স্বাভাবিকভাবেই রাখে। তাদের সঙ্গে কথোপকথনে তাই মজা আছে। কথা অবিরাম কথা বললেও আপনি বিরক্ত হবেন না। কারণ তারা যেকোনো বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারে।
আরেকটি গল্প শোনেন—
একজন বয়োজ্যেষ্ঠের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন একজন সাংবাদিক। তিনি ওই মুরুব্বিকে শুধোলেন, ‘এই বয়সেও আপনি আপনার স্ত্রীকে প্রিয়তমা বলে ডাকেন। এই গভীর ভালোবাসার রহস্য কী?’
বৃদ্ধ বললেন, ‘বাবা, বছর কুড়ি আগে আমি তার (স্ত্রীর) নাম ভুলে গিয়েছিলাম, জিজ্ঞাসা করার সাহস হয়নি, সেকারণে তাকে প্রিয়তমা ডাকি!’
স্মার্টনেসের উদাহরণ যদি দেই, তাহলে বলতে হয়, সম্প্রতি একজন সিনিয়র সাংবাদিককে একটু রূঢ় ভাষায় একজন পাঠক সমালোচনা করেন। তিনি তার জবাবে বলেন, ‘তোমার মতো ইতর লোকের কাছে আমার সাংবাদিকতার প্রমাণ দিতে হবে না ...’
আরেকটি বিষয়, সাংবাদিকরা হলো সরকারের সাথে জনগণের যোগাযোগের একটা বড় মাধ্যম এবং তারাই সাধারণ মানুষের হয়ে নিয়মিত সরকারের উপর পর্যায়ের সমালোচনা করতে পারে।
ধরুন, কোনো সাধারণ লোকের সাথে যদি কখনো সরকারের উপর মহলের কেউ অন্যায় আচরণ করে, তাহলে সেটি সাংবাদিকরাই নিউজের মাধ্যমে তুলে আনে অত্যন্ত সাহসের সাথে। যার ফল সাধারণ মানুষ ভোগ করে।
পাদটীকা: পাত্র হিসেবে সাংবাদিকরা, বিশেষ করে মফস্বলে যারা কাজ করেন তারা মোটেও উপযুক্ত নন পাত্রীপক্ষের কাছে। বিয়ের কথা চলাকালে পাত্রকে হরহামেশা শুনতে হয়, ছেলে সাংবাদিকতার পাশাপাশি আর কী করে?
লেখক: যশোর ব্যুরো প্রধান, দৈনিক যুগান্তর