যশোর, বাংলাদেশ || সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

লালন সাঁইয়ের দর্শন কি শ্রেণিসংগ্রাম

আহসান কবীর

প্রকাশ : সোমবার, ১৯ অক্টোবর,২০২৬, ০২:০০ পিএম
লালন সাঁইয়ের দর্শন কি শ্রেণিসংগ্রাম

বাংলার লোকধর্মের ইতিহাস ধর্মীয় বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক সাধনার। এর বাইরেও লোকধর্মে রয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ও সমাজব্যবস্থার বাইরে গড়ে ওঠা ফকিরি মতের শ্রেষ্ঠ সাধক, দার্শনিক ও গীতিকার লালন সাঁই তার গান ও সাধনার মধ্য দিয়ে জাতপাত, ধর্মীয় বিভাজন এবং সামাজিক মর্যাদার প্রচলিত কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।

লালনকে কেবল মরমি সাধক বা লোকসংগীতের স্রষ্টা হিসেবে দেখলে তার দর্শনের আসল তাৎপর্য অনুধাবন করা যায় না। তার ফকিরি মতের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ, মানবদেহ, আত্মানুসন্ধান ও গুরুর ভূমিকা। তৎকালে (যার ধারা এখনও ক্ষীণ হলেও বহমান) জন্ম, জাত ও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের মর্যাদা নির্ধারণের যে ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল, লালনের মানবকেন্দ্রিক দর্শন তার বিরুদ্ধে বিকল্প চিন্তার পরিসর তৈরি করে।

শ্রেণিসংগ্রাম কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সুসংবদ্ধ সামাজিক-রাজনৈতিক তত্ত্ব। লালন সাঁইয়ের জন্মসাল নিয়ে মতভেদ থাকলেও তার জীবনকাল সাধারণত ১৭৭২/১৭৭৪ থেকে ১৮৯০ সাল পর্যন্ত ধরা হয়; অন্যদিকে মার্কসের জীবনকাল ১৮১৮-১৮৮৩। লালনের সঙ্গে মার্কসের চিন্তার প্রত্যক্ষ যোগাযোগের কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ জানা যায় না। তাই লালনের দর্শনকে মার্কসীয় শ্রেণিসংগ্রামের সচেতন প্রয়োগ হিসেবে দেখার পরিবর্তে, তার গান ও সাধনার সামাজিক তাৎপর্যকে শ্রেণি, জাতপাত ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের আলোকে বিশ্লেষণ করাই যুক্তিযুক্ত।

‘সহজ মানুষ ভজে দেখ না রে মন দিব্যজ্ঞানে’

ঊনিশ শতকের বাংলার সমাজ জমিদারি শোষণ, কৃষকের অনিশ্চিত জীবন, ঋণের বোঝা, জাতপাতের কঠোরতা এবং ধর্মীয় কর্তৃত্বের দ্বারা প্রভাবিত ছিল। সামাজিক মর্যাদা ও ধর্মীয় শুচিতার ধারণা মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি ছাড়াও সামাজিক সম্পর্ক ও সুযোগের ওপর প্রভাব বিস্তার করতো।

এই বাস্তবতায় বাংলার ফকিরি সাধনা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের একচেটিয়া কর্তৃত্বের বাইরে বিকল্প সাধনপরিসর নির্মাণ করে। লালন সাঁইয়ের মতে গুরুর শিক্ষা, ব্যক্তিগত সাধনা, মানবদেহ এবং আত্মিক উপলব্ধি বিশেষ গুরুত্ব পায়।

লালনের কাছে মানুষের প্রকৃত পরিচয় জাত, ধর্ম, পোশাক কিংবা সামাজিক অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আত্মানুসন্ধানের মধ্য দিয়ে মানুষকে উপলব্ধি করতে হয়। ফলে তার সাধনদর্শন কেবল আধ্যাত্মিক মুক্তির পথ নয়; মানুষের ওপর আরোপিত সামাজিক পরিচয় ও মর্যাদার বিধিনিষেধ থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও এর মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে।

‘জাত গেল জাত গেল বলে এ কী আজব কারখানা’

লালন সাঁইয়ের দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জাতপাত ও ধর্মীয় পরিচয়নির্ভর সামাজিক বিভাজন প্রত্যাখ্যান। তার বহুল পরিচিত গান ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’ মানুষের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণের প্রচলিত পদ্ধতিকে প্রশ্ন করে।

জাতপাত কেবল সামাজিক পরিচয়ের পার্থক্য সৃষ্টি করে না; এটি মানুষের মর্যাদা, পেশাগত সুযোগ, সামাজিক সম্পর্ক ও ক্ষমতার বণ্টনকেও প্রভাবিত করে। জন্মের ভিত্তিতে কাউকে উচ্চ বা নীচ বিবেচনা করা হলে সমাজসৃষ্ট বৈষম্য বৈধতা পেতে পারে। ধর্মীয় শুচিতা ও অশুচিতার ধারণাও এই বৈষম্যকে শক্তিশালী করে।

লালনের প্রশ্ন এই ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেয়। মানুষের প্রকৃত সত্তায় যদি জন্মগত জাতের কোনো চিরস্থায়ী চিহ্ন না থাকে, তবে জাতপাতের ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠত্বের দাবি তো অসারই বটে।

লালন কোনো আধুনিক রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মসূচি প্রণয়ন করেননি। কিন্তু তার রচনা প্রচলিত সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসকে স্বাভাবিক ও অনিবার্য বলে মেনে নিতে অস্বীকার করে। এই অবস্থান প্রান্তিক মানুষের আত্মমর্যাদার পক্ষে শক্তিশালী সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ তৈরি করে। জাতপাত ও অর্থনৈতিক শ্রেণি এক বিষয় না হলেও, যখন জাতগত বিভাজন শ্রম, পেশা ও সম্পদের অসম বণ্টনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন এই প্রতিবাদ শ্রেণিগত বৈষম্যের সমালোচনার সঙ্গেও সম্পর্কিত হয়ে ওঠে।

‘আসবার কালে কী জাত ছিলে, এসে তুমি কী জাত হলে, কী জাত হবা যাবার কালে’

মার্কসীয় বিশ্লেষণে শ্রেণিসংগ্রামের ভিত্তি হলো উৎপাদনের উপায়ের মালিকানা, শ্রমের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদিত সম্পদের বণ্টনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দ্বন্দ্ব। ঊনিশ শতকের বাংলায় জমিদারি ক্ষমতা, কৃষিজীবনের অনিশ্চয়তা, মহাজনি ঋণ ও গ্রামীণ উৎপাদনসম্পর্ক সাধারণ মানুষের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতো।

লালনের রচনায় এসব অর্থনৈতিক সম্পর্কের সুসংবদ্ধ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ পাওয়া যায় না। তার প্রধান অনুসন্ধানের বিষয় ছিল মানুষ, আত্মপরিচয়, সাধনা এবং সামাজিক-ধর্মীয় বিভাজনের অসারতা।

তা সত্ত্বেও লালন সাঁইয়ের রচনায় তার ফকিরি মতের শ্রেণিগত তাৎপর্য রয়েছে। কারণ, শ্রেণিশাসন শুধু সম্পদ ও উৎপাদনের ওপর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে টিকে থাকে না; সামাজিক মর্যাদা, সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব ও আত্মপরিচয়ের ধারণাও একে শক্তিশালী করতে পারে। জন্মগত শ্রেষ্ঠত্বের দাবি যখন সামাজিক আধিপত্যকে বৈধতা দেয়, তখন সেই ধারণাকে প্রশ্ন করা বৈষম্য প্রতিরোধের অংশ হয়ে ওঠে।

লালনের মানবকেন্দ্রিক সাধনা বাহ্যিক পরিচয়ের গণ্ডি অতিক্রম করে মানুষকে দেখার আহ্বান জানায়। ফলে তার দর্শনকে প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক শ্রেণিসংগ্রামের কর্মসূচি না বলে সামাজিক আধিপত্য ও বৈষম্যকে প্রশ্ন করার একটি প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক দর্শন হিসেবে বিবেচনা করা অধিক যুক্তিযুক্ত।

‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’

লালনের গানের পঙ্ক্তি ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’ তার মানবকেন্দ্রিক সাধনদর্শনের তাৎপর্য প্রকাশ করে। এখানে মানুষই আত্মানুসন্ধান ও উপলব্ধির প্রধান ক্ষেত্র। ধর্মীয় পরিচয় কিংবা সামাজিক মর্যাদার চেয়ে মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

জাত, পেশা বা অবস্থানের কারণে যে মানুষকে সমাজ অবমূল্যায়ন করে, লালনের দর্শন সেই মানুষকেই সাধনার কেন্দ্রে স্থাপন করে। মানুষের মর্যাদা তখন কেবল সামাজিক অবস্থান বা অন্যের স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল থাকে না।

তবে আধ্যাত্মিক সাম্য ও বাস্তব অর্থনৈতিক সমতা এক নয়। মানুষের অন্তর্নিহিত মর্যাদার স্বীকৃতি নিজে থেকে জমির মালিকানার বৈষম্য, শ্রম শোষণ কিংবা সম্পদের অসম বণ্টন দূর করে না। লালনের দর্শনের শক্তি হলো মানুষকে অবমাননার নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্ন করা। সেই প্রশ্ন নিজে থেকেই পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক পুনর্বণ্টনের কর্মসূচিতে রূপ নেয় না। এটিকে তার দর্শনের সীমাবদ্ধতা হিসেবেও বিবেচনা করা যায়।

‘গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়, তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়’

লালন সাঁইয়ের ফকিরি মতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেহতত্ত্ব। তার সাধনায় মানবদেহ নিছক জড় পদার্থ নয়; এটি আত্মানুসন্ধান ও উপলব্ধির ক্ষেত্র। দেহের মধ্য দিয়েই মানুষ নিজের অস্তিত্ব ও অন্তর্নিহিত সত্যকে অনুসন্ধান করে।

সামাজিক বাস্তবতায় মানুষের শরীরও জাতপাত, লিঙ্গ এবং শুচিতা-অশুচিতার ধারণার ভিত্তিতে শ্রেণিবিন্যাসের শিকার হয়। কার স্পর্শ গ্রহণযোগ্য, কার সঙ্গে আহার করা যাবে—এসব বিধিনিষেধ সামাজিক সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করে।

লালনের দেহকেন্দ্রিক সাধনা বাহ্যিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের মূল্য নির্ধারণের প্রবণতাকে প্রশ্ন করে। তবে দেহতত্ত্বকে শুধু সামাজিক প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে দেখা উচিত নয়; এর নিজস্ব সাধনগত অর্থও রয়েছে। এর সামাজিক তাৎপর্য হলো, মানবদেহের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রচলিত ভেদাভেদ ও কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করা।

‘সর্বসাধন সিদ্ধ হয় তার, মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার’

ফকিরি সাধনায় গুরু আত্মানুসন্ধান ও সাধনার পথনির্দেশক। গুরু-শিষ্যের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে সাধক প্রচলিত সামাজিক পরিচয়ের বাইরে একটি আধ্যাত্মিক পরিচয় অর্জন করেন।

লালনের সাধনপরিসর গান, শিক্ষা, সাধনা ও পারস্পরিক সম্পর্কের একটি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র। এখানে প্রান্তিক মানুষও নতুন পরিচয় ও মর্যাদা অর্জনের সুযোগ পেতে পারেন। এই ধরনের বিকল্প পরিসর বিদ্যমান সমাজের একমাত্রিক পরিচয়ব্যবস্থার বাইরে নতুন মূল্যবোধ ও সম্পর্ক নির্মাণের পথ খুলে দেয়।

তবে বিকল্প সাধনসম্প্রদায় মানেই সম্পূর্ণ শ্রেণিহীন বা কর্তৃত্বমুক্ত সমাজ নয়। গুরু-শিষ্যের সম্পর্কেও ক্ষমতার পার্থক্য থাকতে পারে। কার্যত লালন সাঁইয়ের দর্শন তাই সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠিত করেনি, বরং সেই পথ বাতলে দিয়েছেমাত্র।

‘সুন্নত দিলে হয় মুসলমান, নারীর তবে কী হয় বিধান’

লালনের দর্শন হিন্দু-মুসলমানের প্রচলিত বিভাজনকেও প্রশ্ন করে। তার সাধনায় বিভিন্ন ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের প্রভাব থাকলেও লালন সাঁইকে কোনো একক প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের পরিচয়ে পরিচিত করা যায় না। তার গানে বাহ্যিক ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে মানুষের অন্তর্নিহিত সত্য ও সাধনার গুরুত্ব বেশি।

ধর্মীয় পরিচয় যখন সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা ও পারস্পরিক দূরত্বের ভিত্তি হয়ে ওঠে, তখন তার সমালোচনা বৃহত্তর সামাজিক বিভাজনকেও প্রশ্ন করে। একইভাবে, ধর্মীয় বিভাজন মানুষের অভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থ ও বঞ্চনাকে আড়াল করতে পারে। লালনের মানবকেন্দ্রিক দর্শন এসব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষকে দেখার এবং পারস্পরিক সংহতি গড়ে তোলার সম্ভাবনা সৃষ্টি করে।

তবে ধর্মীয় সম্প্রীতি নিজে থেকে শ্রেণিবৈষম্য দূর করে না। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের পাশাপাশি অর্থনৈতিক শোষণ, সম্পদের অসম বণ্টন ও সামাজিক ক্ষমতার বৈষম্য নিয়েও প্রশ্ন তোলা জরুরি।

‘জাত গেল জাত গেল বলে এ কী আজব কারখানা’

লালনের গানে জমিদারি উচ্ছেদ, ভূমির পুনর্বণ্টন কিংবা উৎপাদনের উপায়ের সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার মতো আধুনিক রাজনৈতিক কর্মসূচি কেন্দ্রীয় বিষয় নয়। তার প্রতিবাদের প্রধান ক্ষেত্র ছিল মানুষের পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা, জাতপাত ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব।

এই প্রতিবাদকে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ বলা যায়। এটি প্রচলিত বৈষম্যকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়ার মানসিকতা ভাঙতে এবং মানুষকে নিজের পরিচয় ও অবস্থান সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।

অন্যদিকে, অর্থনৈতিক শোষণ অবসানের জন্য বস্তুগত সম্পর্কের পরিবর্তন, সংগঠিত উদ্যোগ এবং ক্ষমতা ও সম্পদের বণ্টন নিয়ে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম প্রয়োজন। লালনের দর্শন এসব সংগ্রামের বিকল্প নয়; বরং মানুষের মর্যাদা ও সাম্যের পক্ষে একটি নৈতিক-সাংস্কৃতিক ভিত্তি নির্মাণে সহায়ক।

তাই তার ফকিরি মতকে শ্রেণিসংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এর প্রতিবাদী সম্ভাবনা ও ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতা—দুই দিকই বিবেচনা করা জরুরি।

‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’

লালন সাঁইয়ের তিরোধানের বহু বছর পরও তার দর্শনের মৌলিক প্রশ্নগুলো প্রাসঙ্গিক। বর্তমান সমাজেও ধর্ম, জাতিগত পরিচয়, শ্রেণি, পেশা ও সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে মানুষকে বিচার করার প্রবণতা রয়েছে। অর্থনৈতিক বৈষম্যের পাশাপাশি পরিচয়ভিত্তিক বিভাজন ও সামাজিক অবমাননাও মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে।

এই বাস্তবতায় লালনের দর্শন আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়—কোন পরিচয় মানুষকে মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে, কোন সামাজিক বিধান বৈষম্যকে বৈধতা দেয় এবং মানুষের মর্যাদার প্রকৃত ভিত্তি কী?

তার গানকে কেবল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা বা বিনোদনের উপকরণে সীমাবদ্ধ রাখলে এর প্রতিবাদী তাৎপর্য আড়াল হতে পারে। তার চিন্তা-দর্শন বুঝতে হলে সমকালীন সমাজের বৈষম্য ও ক্ষমতাসম্পর্কের পাশাপাশি তার রচনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে, গানের পাঠ, মৌখিক পরিবেশনার ইতিহাস ও সংকলনের পাঠভেদ যাচাই করে তার দর্শনের ব্যাখ্যা নির্মাণে আরও মনোনিবেশ জরুরি।

‘এমন মানবজনম আর কি হবে’

লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবসে তাকে স্মরণ করার অর্থ কেবল একজন মহান সাধক ও দার্শনিকের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো নয়; তার রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হওয়াও। মানুষ কেন জাতপাতের বিভাজনে আবদ্ধ থাকবে? ধর্মীয় পরিচয় কেন মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করবে? জন্ম ও সামাজিক অবস্থানের কারণে একজন মানুষ অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হবে কেন?

বাংলার লোকধর্মে শ্রেণিসংগ্রামের যে বহুমাত্রিক ধারণা, তার মধ্যে লালনের বিশেষত্ব হলো, তিনি মানুষের সামাজিক পরিচয় ও মর্যাদার প্রচলিত কাঠামোকে প্রশ্ন করেছেন এবং মানবসত্তার অন্তর্নিহিত মূল্যকে সামনে এনেছেন। তার ফকিরি মত জাতপাত, সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও সামাজিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক চেতনার পরিচয় বহন করে।

তবে এই দর্শনকে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক মুক্তির তত্ত্ব হিসেবে না দেখে সামাজিক বৈষম্যের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে প্রশ্ন করার শক্তি হিসেবে মূল্যায়ন করা অধিকতর সংগত। মানুষের আত্মমর্যাদা, সাম্য ও বৈষম্যহীন সম্পর্কের আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে লালনের দর্শন শ্রেণিসংগ্রামের বৃহত্তর আলোচনার অংশ হতে পারে।

লালন সাঁইয়ের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা শুধু তার গান গাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তার প্রশ্নগুলোকে জীবন্ত রাখার মধ্যেই নিহিত। যে সমাজে বিভাজনের চেয়ে মানবিক সম্পর্ক, আধিপত্যের চেয়ে সাম্য এবং পরিচয়ের চেয়ে মানুষের মর্যাদা অধিক মূল্যবান হয়ে উঠবে, সেই সমাজ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষার মধ্যেই লালনের দর্শনের তাৎপর্য নিহিত। তার সাধনদর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সামাজিক মুক্তির যেকোনো কার্যক্রমের কেন্দ্রে থাকতে হবে মানুষ, তার মর্যাদা ও স্বাধীনতা।

লেখক: সাংবাদিক

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)