পাঠপ্রতিক্রিয়া
মশিয়ার রহমান
কবি, লেখক, রাজনীতিবিদ ও স্বনামধন্য আইনজীবী (বর্তমান সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী) মো. আসাদুজ্জামানের লেখা বই ‘শুধু মাধবীর জন্য’। বইটি অন্যপ্রকাশ থেকে ২০২৬-এর একুশে গ্রন্থ মেলায় প্রকাশিত।
প্রচ্ছদ: সাদিতউজজামান
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বুদ্ধদেব গুহ ও নিমাই ভট্টাচার্যের পত্র উপন্যাস পাঠ বিবেচনায় ‘শুধু মাধবীর জন্য’ উপন্যাসের প্রচ্ছদ অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন ও সাবলীল হয়েছে। প্রচ্ছদ যেন ইশারা দিচ্ছে প্রিয় মানুষকে অনেক না বলা কথার গল্প। প্রাসঙ্গিক ও প্রাণবন্ত একটি প্রচ্ছদ। বইটির শিরোনাম ‘শুধু মাধবীর জন্য’ সর্বজননন্দিত হয়েছে। চলমান সমাজ ব্যবস্থার রাজনীতি ও অর্থনীতির ও সমাজ সংস্কৃতির মৌলিক চিত্র ফুটে উঠেছে প্রতিটি পংক্তিতে। মনের ক্যানভাসে ফুটে ওঠা দুর্দান্ত প্রেম-ভালোবাসা, বিরহ ও বেদনার সার্থক প্রকাশ ঘটেছে পাতায় পাতায়।
পাঠক বিবেচনায় আমি একেবারেই অযোগ্য। তাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বইয়ের পাঠপ্রতিক্রিয়া লিখতে যাওয়াটা বেশ খানিকটা দুঃসাহসিকও বটে।
বাংলাদেশে এই বই যারা পাঠ করেছেন তাদের অধিকাংশের জিজ্ঞাসা—মাধবী কে? কী তার রহস্য? এ এক দুর্দান্ত জিজ্ঞাসা। এই প্রশ্নের বহর যত দীর্ঘ হচ্ছে, আমার মনে হয় মাধবীর পরিচয় ছায়াপথের মতোই রহস্যময় হয়ে উঠছে। তাই মোটাদাগে বলা যায়, লেখককে এই একটি প্রশ্নই পাঠকনন্দিত করে তুলেছে এবং পত্র উপন্যাসের সার্থকতা এখানেই নিহিত।
এই পত্র উপন্যাস কোনো কাল্পনিক চিন্তা থেকে উৎসারিত নয়। উপন্যাসটিতে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘দ্যা ওল্ডম্যান অ্যান্ড দি সি’ বইয়ের গল্পের মতোই বাংলার মাধবীদের আটপৌরে জীবনের গল্প প্রতিফলিত হয়েছে। রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির নির্মোহ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমেই বইটির অনবদ্য পথচলা। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গণতন্ত্র চর্চা (বিশেষ করে পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক রাজনীতির) এমন বিচার বিশ্লেষণ প্রায় অসম্ভবই বলা যায়।
এই উপন্যাসে লেখক মাধবীকে দুটি সত্তায় পাঠকের মনে উপস্থাপন করেছেন। প্রথম সত্তা: মাধবীকে একটি স্বাধীন দেশের সবুজ মানচিত্র হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে।
লেখক মাধবীকে ‘জনতার দেশ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং মাধবীর সবুজ বুকের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, ন্যায়-অন্যায়ের জীবন্ত রূপ চিত্রিত করেছেন। লেখকের মাধবী বাংলাদেশ। তাই তিনি মাধবীকে নিয়ে যেমন উদ্বিগ্ন তেমনি বাংলাদেশ নিয়েও উদ্বিগ্ন আর অস্থির। বাংলাদেশের মানুষ নিয়ে, বাংলাদেশে যে রাজনীতি চলছে তা নিয়ে, বাংলাদেশ নামের মাধবী মোটেই নিরাপদ নয়। মাধবী উপেক্ষিত ও শৃঙ্খলিত। গণতান্ত্রিক রাজনীতির আড়ালে মাধবীর বুকে ভোটের অপরাজনীতি চলছে। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির নামে নৈরাজ্য, দুর্নীতি, লুটপাট, ছিনতাই, রাহাজানি ও হত্যাযজ্ঞ চলছে। কর্পোরেট শোষণ, সাংবিধানিক সংকট, উদ্দেশ্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা, বিচার ও শাসন ব্যবস্থায় দৃশ্যমান প্রহসন বাংলাদেশের মানচিত্রের রেখায় রেখায় লেখক অত্যন্ত সাবলীল ও সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। লেখক মাধবীকে শুনিয়েছেন তারই বুকে লেপ্টে থাকা দীর্ঘ ১৭ বছরের একটা অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরশাসক, ফ্যাসিস্ট, লুটেরা তথা মাফিয়া চক্রের অপরাজনীতির ইতিকথা। শুনিয়েছেন, ইতিহাসের কথা। গ্রিক সভ্যতা ও গ্রিকদের জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার সোনালি ঐতিহ্যের গল্প, রোমান সভ্যতা, মঙ্গোলীয় সভ্যতার ইতিহাস, চেঙ্গিস খান ও তৈমুর লঙের রাজ্যজয়ের ইতিহাস, জুলিয়াস সিজার ও সর্বকালের সেরা সুন্দরী ক্লিওপেট্রার ইতিহাস। লেখক বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তথা দেশ, দেশের জনগণ, সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম, অর্থনীতি, রাজনীনৈতিক জীবনযাত্রা স্বাভাবিক ও মানবিক করে তুলতে মার্টিন নিম্যোলার বিখ্যাত কবিতার উদ্ধৃতি টেনে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের করণীয় তুলে ধরেছেন। এক কথায় এই উপন্যাসে যা অনবদ্য মাধুর্যে ফুটে উঠেছে।
দ্বিতীয় সত্তা: মাধবীকে লেখক নিজের অন্তরসত্তা হিসেবে কল্পনা করেছেন। প্রেমিকা হিসেবে কল্পনা করেছেন—এটুকু বললে মনে হয় অনেক কম বলা হয়। লেখক উদ্ধৃতিতে বলেন, ‘জীবন এত ছোট যে তোমার চলার দিকে তাকিয়েই এটা পার করে দেয়া যায়।’ আরেক পৃষ্ঠায় বলেন, ‘আমার বরফেরা জমাটবদ্ধ হয়ে এন্টার্কটিকার বরফের শিলা হবে,গলবে না আর কখনও। সেই বরফের শিলার মাঝে একটি হৃৎপিণ্ড রয়ে যাবে শুধু মাধবীর জন্য, কেউ দেখবে না সেই কুঠরে থাকা মাধবী, যেখানে প্রতিদিন আমি নির্জন নিরালায় অঞ্জলি দেব, প্রণত হব, আমার মাধবীর সাথে খুনসুটি করবো, আরও কত কি...।’ আরও লিখেছেন, ‘সেই কতশত বছর হলো তোমার শহর ছেড়ে পড়েছিলাম এক লোকালয়ে, তোমার নিশ্বাসের গন্ধময় শহরের বেলাভূমিতে দাঁড়িয়ে অক্সিজেন নেওয়ার জন্য।’ লেখক বলেছেন, ‘প্রতিদিন নিযুত শ্মশানের নির্জনতায় বসে তোমার ধ্যানে মগ্ন থাকি তোমার হৃদয়ের প্রতিবেশী হয়ে।’ বলেছেন, মৌলিক ভালোবাসার এক দুর্লভ উপাখ্যান।
বইয়ের শেষ পৃষ্ঠায় ভালোবাসার কাঙাল লেখক জগজিৎ সিংয়ের অমর সংগীত ‘মুখের কথায় হয় যে গান তুমি যদি গাও, বেদনা মধুর হয়ে যায় তুমি যদি দাও’ বিধৃত করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আসলে প্রেম এমনই, প্রেয়সী যদি মনের মতন হয়, সে সৃষ্টির প্রেরণা হয়ে ওঠে, সৃষ্টির সুখের উল্লাস হয়। মাঝখানে যে খুটখাট, মান-অভিমান, ঝগড়াঝাঁটি, খুনসুটি তা সৃষ্টির প্রসববেদনা মাত্র।’
লেখক স্বপ্নের আরাধ্য মাধবীকে জীবনের বেদীতে প্রেমের নৈবেদ্য নিবেদন করার অভিলাষে শুনিয়েছেন লাইলি-মজনু, শিরি-ফরহাদ, রাধা-কৃষ্ণ, সক্রেটিস-ডায়োটমি ও নেহেরু-এডউইন জুটির প্লেটনিক প্রেমের ইতিহাস।
লেখক বইয়ে বিশ্ববরেণ্য কবি, লেখক, সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক, শিল্পী, দার্শনিক, বিজ্ঞানী ও রাজনীতিবিদগণের রাজনৈতিক কার্যকলাপ, লেখা, গান, কবিতা, যুক্তি ও উদ্ধৃতির সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন অত্যন্ত সাবলীলভাবে।
উপন্যাসের পাতায় লেখকের অনুভূতির যে প্রাণবন্ত অভিব্যক্তি তা পাঠকের আবেগ ও চেতনার নীল আকাশে মিটমিট করে অনন্তকাল জ্বলতে থাকবে।
সবচেয়ে ব্যতিক্রমধর্মী হয়েছে দেশ-বিদেশের পৌরাণিক ও মিথিক্যাল চরিত্রের উপস্থাপন। এইসব কাহিনির কাঙ্ক্ষিত বর্ণনায় ‘শুধু মাধবীর জন্য’ পত্র উপন্যাসে নতুন মাত্রা এনেছে। পেয়েছে নতুন পথ, পেয়েছে ডাইনামিক গতি।
পরিশেষে বলবো, শুধু মাধবীর জন্য লেখকের আকুতি, মিনতি, নিবেদন, কামনা, বাসনা ও আকাঙ্ক্ষার ব্যঞ্জনাময় ব্যাপ্তি ছিলো মূল প্রতিপাদ্য। বিশ্বাস ভাঙার বেদনার গল্পে আকাশ ছোঁয়া সোনালি সাফল্য লেখকের অনাদি হাতেই তুলে দিলাম।
লেখক: শিক্ষক