যশোর, বাংলাদেশ || রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

কিশোরেরা ফিরুক আলোর পথে

মেহেদী হাসান শিমুল

প্রকাশ : রবিবার, ১৮ অক্টোবর,২০২৬, ০১:০০ এ এম
কিশোরেরা ফিরুক আলোর পথে

একটি সমাজের প্রকৃত পরিচয় শুধু তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অবকাঠামো কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে প্রকাশ পায় না; মানুষের আচরণ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, নৈতিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার মধ্যেই আসল পরিচয় নিহিত। অথচ আমাদের চারপাশে এমন কিছু পরিবর্তন দৃশ্যমান হচ্ছে, যা সুস্থ ও সুন্দর সমাজব্যবস্থার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হওয়া, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, মাদক ও অপরাধের বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এবং কিশোরদের মধ্যে সংঘবদ্ধ উচ্ছৃঙ্খলতার প্রবণতা—সব মিলিয়ে সামাজিক অবক্ষয় এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সংকট।

বিশেষ করে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্য বড় একটি সতর্কবার্তা। অল্পবয়সী কিছু কিশোর দলবদ্ধ হয়ে শক্তি প্রদর্শন, ভয় সৃষ্টি, মারামারি, চাঁদাবাজি, মাদকসহ নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের ‘হিরো’ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা তাদের আরও উৎসাহিত করছে। গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়াকে কেউ কেউ বন্ধুত্ব, আধিপত্য কিংবা জনপ্রিয়তার প্রতীক মনে করছে। অথচ এই পথ তাদের শিক্ষা, ভবিষ্যৎ এবং স্বাভাবিক জীবনকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

সমস্যার শিকড় কোথায়

সামাজিক অবক্ষয়ের পেছনে একক কোনো কারণ নেই। পরিবার হলো শিশুর প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু অনেক পরিবারেই সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া, তার বন্ধু-বান্ধব, চলাফেরা ও মানসিক পরিবর্তনের দিকে নজর রাখার সুযোগ বা আগ্রহ কমে যাচ্ছে। সন্তান কী দেখছে, কার সঙ্গে মিশছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী ধরনের বিষয়বস্তু অনুসরণ করছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকের সচেতনতা অনেক ক্ষেত্রেই যথেষ্ট নয়।

অন্যদিকে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বও শুধু পরীক্ষার ফলাফল ও অ্যাকাডেমিক সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। একজন শিক্ষার্থীকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে নৈতিক শিক্ষা, শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার শিক্ষা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মাঠ ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে কিশোরদের দূরে সরে যাওয়াও উদ্বেগের বিষয়।

প্রযুক্তি নিজে কোনো সমস্যা নয়; বরং এর সঠিক ব্যবহার জ্ঞান ও সৃজনশীলতার অসাধারণ সুযোগ তৈরি করে। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সময় অপচয়, হিংসা, বিদ্বেষ, গুজব, অনুকরণ কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রচারের মাধ্যম হয়ে ওঠে। ভার্চুয়াল জগতে জনপ্রিয়তা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা কখনো কখনো বাস্তব জীবনের আচরণকেও বিপজ্জনকভাবে প্রভাবিত করে।

কিশোরকে অপরাধী নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে

কিশোর গ্যাং মোকাবিলায় শুধু কঠোর আইন প্রয়োগ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। অপরাধ করলে আইন অবশ্যই নিজস্ব পথে চলবে। তবে তার আগেই আমাদের ভাবতে হবে, একজন কিশোর কেন এই পথে যাচ্ছে?

যে কিশোরটি আজ একটি অপরাধী দলের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে, সঠিক পরিবেশ পেলে সে-ই আগামী দিনের উদ্যোক্তা, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, ক্রীড়াবিদ কিংবা সমাজনেতা হতে পারে। তাই তাদের প্রতি ঘৃণা নয়; প্রয়োজন নিয়ন্ত্রণ, কাউন্সেলিং, পারিবারিক সহায়তা, শিক্ষা এবং ইতিবাচক সামাজিক সম্পৃক্ততা।

প্রতিটি এলাকায় খেলাধুলার মাঠ, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্ক, বিজ্ঞানচর্চা ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। তরুণদের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। তাদের শক্তিকে দমন না করে সঠিক পথে পরিচালিত করতে হবে।

সমাধানের শুরু পরিবার থেকেই

সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। শুধু ‘কোথায় যাচ্ছ?’ বা ‘কখন ফিরবে?’—এ ধরনের প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। সন্তান কী ভাবছে, কী নিয়ে উদ্বিগ্ন, কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে, তার স্বপ্ন কী—এসব জানারও চেষ্টা করতে হবে।

একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কোনো কিশোর বিপথে যাওয়ার আগেই তাকে চিহ্নিত করে পরামর্শ ও সহায়তার আওতায় আনতে হবে।

এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অপরাধকে রোমাঞ্চকর করে উপস্থাপন না করে এর ক্ষতিকর দিক, ভুক্তভোগীর ক্ষতি এবং সামাজিক পরিণতি তুলে ধরতে হবে। সফল তরুণ, ক্রীড়াবিদ, উদ্যোক্তা, বিজ্ঞানী ও সমাজসেবীদের ইতিবাচক গল্প সামনে আনতে হবে, যাতে নতুন প্রজন্মের সামনে অনুকরণের জন্য ভালো উদাহরণ তৈরি হয়।

আইন প্রয়োগের পাশাপাশি চাই সামাজিক প্রতিরোধ

কিশোর গ্যাং বা অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা অবশ্যই থাকতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে সামাজিক অবক্ষয় নির্মূল করা সম্ভব নয়। যে পরিবেশে অপরাধের সুযোগ তৈরি হয়, সেই পরিবেশও পরিবর্তন করতে হবে।

মাদক, অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও অপরাধী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি কিশোরদের জন্য নিরাপদ সামাজিক পরিসর তৈরি করতে হবে। পাড়া-মহল্লায় নিয়মিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পাঠচক্র ও সামাজিক কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। একটি ব্যস্ত, সৃজনশীল ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত কিশোর সাধারণত অপরাধী গোষ্ঠীর সহজ টার্গেটে পরিণত হয় না।

আমাদের প্রত্যাশা

সামাজিক অবক্ষয় কোনো একদিনে তৈরি হয়নি, তাই একদিনে এর সমাধানও হবে না। পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সম্মিলিত উদ্যোগ। সন্তানকে শুধু ভালো ফলাফল করার জন্য নয়, ভালো মানুষ হওয়ার জন্যও শিক্ষা দিতে হবে। তাকে বুঝতে হবে, শক্তি মানে অন্যকে ভয় দেখানো নয়; প্রকৃত শক্তি হলো নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা, অন্যকে সম্মান করা এবং সমাজের জন্য কিছু করা।

আজকের কিশোররাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। তাদের হাতে যদি বই, খেলাধুলার সরঞ্জাম, সৃজনশীলতার সুযোগ ও মানবিক মূল্যবোধ তুলে দিতে পারি, তাহলে সেই হাতই একদিন দেশ গড়বে। আর যদি তাদের অবহেলা করি, সেই শূন্যস্থান দখল করবে অপরাধ, মাদক ও অসুস্থ সংস্কৃতি।

তাই এখনই সময় কিশোরকে ভয় নয়, ভালোবাসা দিয়ে কাছে টানার; শাসনের পাশাপাশি বোঝার; অপরাধের আগে প্রতিরোধ করার এবং প্রতিটি তরুণকে একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখানোর।

সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ নয়, এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র একসঙ্গে এগিয়ে এলে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির অন্ধকার থেকে আমাদের নতুন প্রজন্মকে ফিরিয়ে এনে একটি মানবিক, নিরাপদ ও মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
আজকের সচেতনতা, আগামী দিনের নিরাপদ সমাজ।

লেখক: সুবর্ণভূমির প্রশাসনিক কর্মকর্তা

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)