যশোর, বাংলাদেশ || রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

সম্পাদকীয়

রেলক্রসিংয়ে মৃত্যুফাঁদ, দায় এড়ানোর সংস্কৃতি বন্ধ হোক

প্রকাশ : রবিবার, ১৮ অক্টোবর,২০২৬, ০৯:০০ এ এম
রেলক্রসিংয়ে মৃত্যুফাঁদ, দায় এড়ানোর সংস্কৃতি বন্ধ হোক

রেলপথ ও সড়কপথ যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দুটি মাধ্যম। মানুষের যাতায়াত, পণ্য পরিবহন এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে এ দুই পথের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন, অপর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতায় এই যোগাযোগব্যবস্থাই যখন মানুষের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে, তখন তা গভীর উদ্বেগের বিষয়। সুবর্ণভূমির এক প্রতিবেদনে যশোর জেলার রেলক্রসিংগুলোর যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল একটি জেলার সমস্যা নয়; বরং দেশের রেলপথ নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতারও প্রতিফলন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যশোর জেলার ১৭৭টি রেলক্রসিংয়ের মধ্যে ৯৯টিই অবৈধ বা অননুমোদিত। বৈধ ৭৮টি ক্রসিংয়ের ৩৪টিতে নেই গেটম্যান। অর্থাৎ, যেসব স্থানে রেললাইন ও সড়কের সংযোগ রয়েছে, সেসব স্থানের বড় একটি অংশেই নিরাপদ পারাপারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। গত এক দশকে এ অঞ্চলে ৪৫টি দুর্ঘটনায় অন্তত ৭৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। চলতি বছরেও একাধিক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এসব পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে, রেলক্রসিংয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন আর উপেক্ষা করার মতো বিষয় নয়।

বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসংলগ্ন অরক্ষিত ক্রসিংগুলো শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। যশোর শহরের খড়কি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তিন শতাধিক শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন এমন একটি ক্রসিং পার হয়ে যাতায়াত করতে হয়, যেখানে নেই প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা। শিশুদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতও যদি জীবনের ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়, তবে উন্নয়ন পরিকল্পনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। মানুষের চলাচলের প্রয়োজন বিবেচনায় না নিয়ে সড়ক নির্মাণ কিংবা রেলক্রসিংয়ের নিরাপত্তা উপেক্ষা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এই পরিস্থিতির পেছনে বাংলাদেশ রেলওয়ের সাথে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদের সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট। রেল বিভাগের দাবি, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অনুমোদন ছাড়াই ক্রসিং তৈরি করছে। অন্যদিকে, এলজিইডির বক্তব্য, জরিপ করে তথ্য পাঠানো এবং গেটম্যান নিয়োগের বিষয়ে চিঠি দেওয়ার পরও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। দুই পক্ষের বক্তব্যে নিজ নিজ অবস্থানের ব্যাখ্যা থাকলেও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দৃশ্যমান অগ্রগতি কতটা হয়েছে, সেটিই হওয়া উচিত মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড। পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি দূর করা সম্ভব নয়।

এ ক্ষেত্রে প্রথমেই জেলার সব রেলক্রসিংয়ের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে সেগুলোর বৈধতা, ব্যবহার, ঝুঁকি ও প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ক্রসিং বন্ধ করতে হবে পরিকল্পিতভাবে, তবে বিকল্প নিরাপদ পথ নিশ্চিত না করে জনসাধারণের চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ বন্ধ করা যাবে না। যেসব ক্রসিং অপরিহার্য, সেখানে গেটবার, গেটম্যান, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, স্পষ্ট সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড এবং কার্যকর সংকেতব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যালয়, বাজার ও জনবহুল এলাকার ক্রসিংগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

একই সঙ্গে রেলওয়ে, এলজিইডি, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, পৌরসভা এবং জেলা প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা জরুরি। নিয়মিত যৌথ পরিদর্শন, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ক্রসিং সংস্কার এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ফোননির্ভর যোগাযোগের ওপর নির্ভর না করে আধুনিক ও নির্ভরযোগ্য সংকেতব্যবস্থা গড়ে তোলাও অপরিহার্য।

মানুষের জীবন রক্ষার চেয়ে বড় কোনো উন্নয়ন লক্ষ্য হতে পারে না। দুর্ঘটনার পর তদন্ত, শোক প্রকাশ কিংবা অন্য দপ্তরের ঘাড়ে দায় ঠেলে দেওয়ার চেয়ে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া অনেক বেশি জরুরি। রেলক্রসিংগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অবৈধ ক্রসিং নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তাব্যবস্থা স্থাপন এবং দায়িত্বে অবহেলার জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে প্রাণহানির ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। রেললাইন ও সড়ক মানুষের জীবনকে সহজ করবে—মৃত্যুফাঁদে পরিণত হবে না; এ নিশ্চয়তা দেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরই।

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)