সম্পাদকীয়
মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু মনীষীর আবির্ভাব ঘটে, যারা তাদের জীবন, দর্শন ও সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে দেশ, কাল ও সম্প্রদায়ের সীমানা অতিক্রম করে মানবতার চিরন্তন বাণী প্রচার করেন। প্রখ্যাত সাধক ফকির লালন শাহ তাদেরই একজন। তিনি কেবল বাংলার আধ্যাত্মিক, মরমি ও লোকজ সঙ্গীতের উজ্জ্বল নক্ষত্র নন, বরং অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবপ্রেম, সাম্য ও আত্মানুসন্ধানের এক অনন্য দার্শনিক। তিরোধান দিবসে তাকে স্মরণ করার অর্থ শুধু তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন নয়; বরং তার জীবনদর্শনকে ধারণ করে বর্তমান সমাজের সংকট ও বিভাজন থেকে উত্তরণের পথ অনুসন্ধান করা।
লালন ফকিরের জন্ম ও জীবন সম্পর্কে নানা মত প্রচলিত থাকলেও তার দর্শন ও সংগীতের প্রভাব নিয়ে কোনো সংশয় নেই। ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলায় যখন জাতপাত, ধর্মীয় গোঁড়ামি, সামাজিক বৈষম্য ও কুসংস্কার মানুষের জীবনকে সংকীর্ণ করে রেখেছিল, তখন লালন তার গান, মানবপ্রেম ও সাধনার মধ্য দিয়ে এসব বিভেদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি মানুষের পরিচয়কে ধর্মীয় কিংবা সামাজিক পরিচয়ের গণ্ডিতে আবদ্ধ না রেখে ‘মানুষ’ হিসেবেই তার প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারণ করতে চেয়েছেন। তার কালজয়ী প্রশ্ন—‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’—আজও আমাদের সমাজবাস্তবতায় সমান প্রাসঙ্গিক।
লালনের দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘মানুষ’। তার বাণী—‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। তার কাছে মানুষের চেয়ে বড় কোনো পরিচয় নেই। জাত-ধর্ম, বর্ণ কিংবা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে মানুষকে বিভক্ত করার প্রবণতাকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার গানে দেহতত্ত্ব, আত্মতত্ত্ব ও পরম সত্তার অনুসন্ধান থাকলেও এর গভীরে রয়েছে মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা। তিনি শিখিয়েছেন, বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের প্রদর্শন নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, প্রেম ও মানবিকতাই সত্য উপলব্ধির পথ। এই দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ধর্মের প্রকৃত তাৎপর্য মানুষে মানুষে ভালোবাসা ও সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠার মধ্যেই নিহিত।
বর্তমান বিশ্বে ধর্মীয় উগ্রতা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, সামাজিক অসহিষ্ণুতা ও বৈষম্য যখন নানা সংকটের জন্ম দিচ্ছে, তখন লালনের মানবতাবাদী দর্শন আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সত্ত্বেও মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতার ঘাটতি উদ্বেগজনক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষ ছড়ানো, ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে হেয় করার প্রবণতা আমাদের সামাজিক সম্প্রীতিকে দুর্বল করে। এমন বাস্তবতায় লালনের গান ও জীবনদর্শন আমাদের আত্মসমালোচনা করতে শেখায়। তিনি যেন স্মরণ করিয়ে দেন, মানুষকে না চিনে, মানুষের মর্যাদা স্বীকার না করে কোনো মহৎ সমাজ নির্মাণ সম্ভব নয়, এমনকী সৃষ্টিকর্তাকেও পাওয়া সম্ভব নয়। তাই তিনি বলেন, ‘বেদে নাই যার রূপরেখা, পাবে সামান্যে কি তার দেখা!’
লালন ফকিরের স্মৃতি সংরক্ষণে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় তার আখড়া আজও গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। প্রতিবছর তার তিরোধান দিবসে সেখানে সাধক, শিল্পী, গবেষক ও ভক্তদের সমাগম ঘটে। এবারের স্মরণোৎসব এখন চলছে। তবে পরিতাপের বিষয় হলো, লালনের প্রকৃত অনুসারী সাধু-গুরুরা এই অনুষ্ঠানে কার্যত অপাংক্তেয়। এখন অনুষ্ঠান চলে প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতায়; যার সঙ্গে লালনের চিন্তার তেমন কোনো সংশ্রব নেই।
লালনসংগীতের চর্চা, গবেষণা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তার দর্শন পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে শুধু উৎসব আয়োজন, গান পরিবেশন কিংবা আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্যেই তার প্রতি দায়িত্ব সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। তার গান ও দর্শনের যথাযথ সংরক্ষণ, নির্ভরযোগ্য গবেষণা, শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে মানবতাবাদী চিন্তার প্রসার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে প্রয়োজন, লালন স্মরণোৎসব তার অনুসারীদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া।
লালন ফকিরের তিরোধান দিবস প্রকৃতপক্ষে আত্মজিজ্ঞাসা ও নবজাগরণের উপলক্ষ। তার জীবন ও সাধনা আমাদের শেখায়, বিভেদের দেয়াল ভেঙে ভালোবাসা, সাম্য ও সম্প্রীতির সমাজ গড়াই মানুষের শ্রেষ্ঠ সাধনা। লালনকে সত্যিকার অর্থে শ্রদ্ধা জানাতে হলে তার গান কণ্ঠে ধারণ করার পাশাপাশি তার মানবিক আদর্শকে জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মানুষে মানুষে ভেদাভেদহীন, সহনশীল ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের মধ্য দিয়েই এই মহান সাধকের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা সার্থক হয়ে উঠবে।