যশোর, বাংলাদেশ || মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬
Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi Subornovumi
Ad for sale 870 x 80 Position (1)
Position (1)
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

এমপি আতাউরের স্বজনপ্রীতিতে নড়াইলে ইমেজসংকটে জামায়াত

দলীয় নেতা-কর্মীরা চরম ক্ষুব্ধ

রূপক মুখার্জি

, লোহাগড়া (নড়াইল)

প্রকাশ : সোমবার, ৬ জুলাই,২০২৬, ০৯:৫৭ পিএম
আপডেট : সোমবার, ৬ জুলাই,২০২৬, ১০:৪৯ পিএম
এমপি আতাউরের স্বজনপ্রীতিতে নড়াইলে ইমেজসংকটে জামায়াত

নড়াইল-২ আসনের এমপি, জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির আতাউর রহমানের (বাচ্চু) মেয়ের নামে এমপির ঐচ্ছিক তহবিলের অনুদান মঞ্জুরিকাণ্ডে দলটি চরম ইমেজ সংকটে পড়েছে। 

যদিও ভাইরাল হওয়া এমপির অনুদানের ওই  মঞ্জুরিপত্রে মেয়ের নাম থাকার দায়ে এমপি তার ব্যক্তিগত সহকারীকে  (পিএস) বরখাস্ত করে পিএস-এর ওপর দায় চাপাচ্ছেন, কিন্তু এখানে এমপির দায় এড়ানোর সুযোগ নেই বলে দলমতনির্বিশেষে অভিমত ব্যক্ত করে এই নীতিবহির্ভূত কাজ জামায়াতে ইসলামীর ন্যায়নিষ্ঠা-সততার রাজনীতির মূলে কুঠারাঘাত বলেই মনে করছেন। অজশ্র ঘাম-রক্ত-শ্রমের বিনিময়ে তিলে তিলে গড়া জামায়াতের জনসর্মন জেলা প্রধানের এমন দায়িত্বহীনতায় ধুলায় মিশে যাওয়ায় দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীর মাঝে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। 

নেতা-কর্মীদের অনেকে এ ঘটনার পর রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী বহু বছর পিছিয়ে গেছে অভিযোগ করে আমিরের ওপর দায় চাপাচ্ছেন। তবে দলের কেউ কেউ এ ব্যাপারে এমপির দেয়া ব্যাখা বিবৃতির ওপর আস্থাশীল বলেও জানা গেছে। 

১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ ছাত্রশিবিরে সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে ইসলামি মতাদর্শিক পরিবারে বেড়ে ওঠা আতাউর রহমানের (বাচ্চু) রাজনৈতিক জীবনের পথচলা শুরু। সেই থেকে তিনি নড়াইল জেলা ছাত্রশিবির, লেখাপড়ার সুবাদে খুলনা বিএল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, খুলনা মহানগর, কেন্দ্রীয় ছাত্র শিবিরসহ পর্যায়ক্রমে শিবিরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসীন হন। দলের নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে ২০১৩ সালে ছাত্ররাজনীতি থেকে বাচ্চুর নড়াইল জামায়াতে ইসলামীতে ডাক পড়ে, তাকে সদর উপজেলা আমীরের দায়িত্ব দেওয়া হয়, পরে জেলা সেক্রেটারি এবং ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অদ্যাবধি নড়াইল জেলা আমিরের দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। আতাউর রহমান বাচ্চুর পঞ্চম ভাই অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান খুলনা মহানগর জামায়াতের আমির, তিনি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে খুলনা ৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পারাজিত হন। ষষ্ঠ ভাই শামসুর রহমান ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বহু হামলা মামলা কারাবরণসহ দলে আতাউর রহমান বাচ্চুর অপরিসীম ত্যাগের মূল্যায়ন হিসেবে দল তাকে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী করে।

বিএনপির আভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফলে তার জয়ের পথ সুগম হয়।

বাচ্চুর তেমন কোনো আয়ের উৎস নেই, দল থেকে দেওয়া সম্মানীর ওপর নির্ভরশীল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। নির্বাচনি হলফনামায় তার পেশা ‘ব্যবসা’ উল্লেখ করে সেখানে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়েছেন। যদিও ওই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

এদিকে, আতাউর রহমান বাচ্চু এমপি নির্বাচিত হবার পরে ক্রমান্বয়ে তার মাঝে অহমিকা ভর করতে থাকে, তার এ আচারণকে পীর সাহেবের সঙ্গে তুলনা করে দলীয় একটি সূত্র বলছে, যে বা যারা এমপি সাহেবের মোসাহেবি করে তারাই তার আস্থাভাজন, তারাই পছন্দের; এমপির কাছে অন্যদের কোন মূল্যায়ন নেই। আগামী বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জনপ্রিয়তার বিচারে নয় এমপির পছন্দের বিচারে জমায়াতের প্রার্থিতা চূড়ান্ত হতে পারে বলে ধারণা তাদের।

সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে গিয়ে এমপি  জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার বিষয়টিও কখনো কখনো ভুলে যান বলেও অভিযোগ নেতাকর্মীদের। এদিকে এমপির কাছে কোনো সমস্য বা অভিযোগ নিয়ে গেলে মানুষ তেমন কোনো সমাধান পায় না, অমীমাংসিত পড়ে থাকে। জামায়াত নেতা সাইফুল আবদারের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, টাকাপয়সা হাতানোর নানা অভিযোগ এমপির কাছে উত্থাপিত হলেও সেসব ব্যাপারে তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এমপির মেয়ের নাম সম্বলিত সরকারি অনুদানের মঞ্জুরিপত্র প্রকাশ হওয়ারে আগ পর্যন্ত এমপি আতাউর রহমান বাচ্চু দলমতনির্বিশেষে সবার কাছে সততা, ন্যায়নিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। লজ্জাজনক এ ঘটনাটি মানুষের সেই আস্থা-বিশ্বাসকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

যদিও এমপিকে না জানিয়ে পিএস এমপির মেয়ের নাম তলিকায় ঢুকানোর দায়ে আবু সালেহ মোহাম্মদ গোফরানকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ বলছে, এমপির ঐচ্ছিক বরাদ্দ থেকে নড়াইল-২ আসনে হতদরিদ্রদের যে তালিকা ভাইরাল হয়েছে সেখানে, ১ ও ৮ নম্বরে এমপি সাহেবের মেয়ের নাম, সাত নম্বরে এমপির ক্যামেরাম্যানের নাম, ১১ ও ১৭ নম্বরে এমপির শ্যালকের দুই মেয়ের নাম, ১২ নম্বরে এমপির শ্যালকের নাম রয়েছে। সেখানে পিএস-এর কোনো আত্মীয়-স্বজনের নাম না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে এমপি সাহেব নিজের দুর্নীতি ঢাকতে পিএস-এর ওপর দায় চাপাচ্ছেন।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের অর্থ শাখা ২ এর সিনিয়র সহকারী সচিব রাখী আহমেদ স্বাক্ষরিত ১৮ জুনের এক পত্রে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নড়াইল-২ আসনের এমপির ঐচ্ছিক তহবিলের এক লাখ ৮৩ হাজার ৫০০ টাকা নির্বাচনি এলাকার মোট ২১ জনের মাঝে বণ্টনের জন্য মঞ্জুরি অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই তালিকার দুই জায়গায় এমপির মেয়ে ফাইজার নামসহ অধিকাংশ আত্মীয়-স্বজনের নাম থাকায় এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

এ বিষয়ে এমপি আতাউর রহমান নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় ব্যাখা দিতে গিয়ে জানান, ‘সময় স্বল্পতার কারণে মাত্র একদিনের মধ্যে সংসদ সচিবালয়ে অনুদান গ্রহীতাদের তালিকা জমা দিতে হয়েছে। তিনি নির্বাচনি এলাকায় ব্যস্ত থাকায় ঢাকা থেকে ব্যক্তিগত সহকারী বিষয়টি জানালে তাকে এলাকা থেকে নাম সংগ্রহ করে জমা দিতে বলেন। পরে এমপির পূর্ব স্বাক্ষরিত প্যাডে ব্যক্তিগত সহকারী তালিকা প্রস্তুত করে জমা দেন। সেখানে কাদের নাম দেওয়া হয়েছে এমপি তা দেখার সুযোগ পাননি বলে জানান। 

পরে ফেসবুকে তালিকায় মেয়ের নাম দেখে ব্যক্তিগত সহকারীর কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘তাড়াহুড়ো করে যাচাই-বাছাই ছাড়া যার তার নামে বরাদ্দ এনে পরে সে যদি অনুদানের প্রকৃত হকদার না হয় তাকে বরাদ্দকৃত টাকা না দেওয়া গেলে সমালোচনা হবে এইজন্য আমার পরিবারের সদস্যদের নাম দিয়েছে। অনুদানের অর্থ প্রকৃত যাদের প্রাপ্য ইতিমধ্যেই তালিকা সম্পন্ন হয়েছে তাদের হাতেই অনুদান তুলে দেওয়া হবে।’

এ বিষয়ে, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সদস্য, নড়াইল জেলার সাবেক আমির মাওলানা মীর্জা আশেক এলাহী বলেন, ‘এমপি যে বিবৃতি দিয়েছেন আমরা তাতেই আস্থাশীল, তবে কেউ যদি তা না মানতে চায় জোর করে মানানো যাবেনা। ঘটনা ঘটলে তার কিছু ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া থাকবে। সেক্ষেত্রে কী আর করা! তবে এটা ঘোরতর কোনো অপরাধ নয়, সময়ে সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে বলেও ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন জামায়াতের এই প্রবীণ নেতা।

এসব বিষয়ে আতাউর রহমান (বাচ্চু) বলেন, যারা অতি উৎসাহী হয়ে বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছেন তারা নিজেরাও মন থেকে বিশ্বাস করেন না আমার দ্বারা নিজের মেয়ের নামে অনুদান তুলে ভোগ করা সম্ভব। 

নিজের আয়ের উৎস সম্পর্কে তিনি জানান, বিগত দিনে জমি কেনাবেচা ও বিভিন্ন মৌসুমে নানা ফসলের ব্যবসা ছিল। এখন সময়ের অভাবে সেসব ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হয়েছে, বর্তমানে নড়াইল শহরে ‘পাঞ্জাবী হাউজ’ নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত আছেন। সংগঠন থেকে কখনো কখনো সম্মানী পেয়ে থাকেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। 

এমপি আরও বলেন, ‘এলাকার উন্নয়নে জনসাধারণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সবার সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রেখে কাজ করে যাচ্ছি। দলের সবাই আমার কাছে সমান গ্রহণযোগ্য, বিশেষ কারো প্রতি সুদৃষ্টির কোনো অবকাশ নেই। কোনো প্রকার অনৈতিক কাজে জড়িত কারোরই আমার কাছে কোনো স্থান নেই ‘

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)