‘কাজকাম বাদ দিয়ে গতকাল সারাদিনটা আমি সার খুঁজতেছি, টাকা দিয়েও কোথাও পাঁচ কেজি সার আমি পাইনি, এখন আমার অবস্থাটা কী হবে?’
এভাবেই বলছিলেন কুড়িগ্রামের মোঘলবাসা ইউনিয়নের কৃষক ছবির উদ্দিন।
আমন মৌসুমে চাহিদা অনুযায়ী সার না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন তার মতো অনেকেই।
‘কয়দিন আগে ডিজেল নিয়ে ঝামেলায় পড়িছিলাম, এবার সার নিয়ে পড়িছি। কি যে একটা যন্ত্রণা শুরু হইছে। বেশি টাকা দিয়ে সার কিনলি কি পুষাবে?,’ এই প্রশ্ন মাগুরার কৃষক প্রহ্লাদ দাসের।
রাজশাহী, নীলফামারী, ঝিনাইদহ এবং যশোর জেলার বেশ কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে সার নিয়ে সংকটের এমন চিত্রই পাওয়া গেছে।
কোথাও সার পাওয়া যাচ্ছে না, কোথাও দাম বেশি আবার কোথাও সার পেতে দীর্ঘ ভোগান্তি। অথচ সরকারি হিসেবে সারের কোনো সংকট নেই। বরং প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে।
কৃষিমন্ত্রী জানিয়েছেন, গত বছর একই সময়ে সরকারিভাবে সারের মজুত ছিল ১২ লাখ মেট্রিক টন, যা বর্তমানে ১৩ লাখ মেট্রিক টনের কাছাকাছি।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে বাংলাদেশে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিইপি এবং অ্যামোনিয়া সারের মোট চাহিদা ৫৮ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন।
এছাড়া প্রায় ১৬ লাখ মেট্রিক টন সার নিরাপত্তা মজুত হিসেবে রাখা হয়েছে। যা সরবরাহ পরিস্থিতি ঠিক রাখা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ব্যবহার হয়।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সৌদি আরব, মরক্কো, কানাডা এবং রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সার আমদানি চুক্তি রয়েছে। এছাড়া তিউনিশিয়া, চীন এবং মিশরের সঙ্গেও চুক্তি হচ্ছে।
প্রতিমাসে যে পরিমাণ সার বরাদ্দ দেওয়ার কথা তা সরকারের কাছে মজুত আছে। এমনকি তিন থেকে চার মাসের আগাম মজুত রয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।
তাহলে, মাঠ পর্যায়ে কৃষকের চাহিদা মিটছে না কেন? আর কেনইবা সড়ক আটকে বিক্ষোভ কিংবা ডিলার গোডাউনে লুটপাটের ঘটনা ঘটছে?
স্থানীয় পর্যায়ে কৃষক, ডিলার, জেলা প্রশাসন এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে সার নিয়ে চলমান অস্থিরতার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা গেছে।
জরুরি কৃষি পণ্য হিসেবে বাংলাদেশে সার উৎপাদন, আমদানি এবং বিতরণের বিষয়টি সরকারি পর্যায়ে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
সার বিতরণ পর্যায়ে সাধারণত দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে দুইজন মাস্টার ডিলার এবং তাদের অধীনে নয় থেকে ১৬ জন পর্যন্ত সাব-ডিলার কাজ করেন।
সম্প্রতি সারের ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত যে নীতিমালা বর্তমান সরকার প্রণয়ন করেছে সেখানে ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে অভিযুক্ত ডিলারদের তালিকা তৈরি করছে সরকার। নীতিমালা ভঙ্গ করা ডিলারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
সার নিয়ে বর্তমান সংকটের পেছনে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া কিছু ডিলারের কারসাজি রয়েছে বলেও সংসদে অভিযোগ তোলা হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে সার নিয়ে বর্তমানে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে তার পেছনে ডিলার নিয়োগের এই নতুন নিয়ম ভূমিকা রাখছে বলেই মনে করছেন অনেকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারের ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত এই নীতিমালা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেই তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে যেখানে বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে বর্তমান সরকার।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্য ছিল, অফ পিক সিজন অর্থাৎ যখন সারের চাহিদা কিছুটা কম থাকে তখন এই নীতিমালা বাস্তবায়ন করে নতুন করে ডিলার নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।
কিন্তু নীতিমালার বেশ কিছু জায়গায় পুনরায় পরিবর্তন ও সংশোধনের পর এটি সময়মতো বাস্তবায়ন করা যায়নি।
ফলে এমন একটি সময়ে সরকার এটি বাস্তবায়ন শুরু করে যখন ইতোমধ্যে আমন মৌসুমের বাড়তি চাহিদা শুরু হয়ে গেছে এবং রবি মৌসুমের চাহিদাও আসন্ন।
বর্তমানে সার নিয়ে যে সংকট চলছে তার পেছনে ডিলার নিয়োগের এই দীর্ঘসূত্রতা একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে।
রাজনৈতিক আধিপত্য
সম্প্রতি কুড়িগ্রাম জেলায় একাধিক স্থানে ডিলার গোডাউন থেকে সার লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। সার না পেয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভও করেছেন কৃষকরা।
এসব ঘটনার পেছনে কৃষকদের ক্ষোভ যেমন রয়েছে তেমনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলেও মনে করা হচ্ছে।
একদিকে যেমন সরকারবিরোধীদের উসকানি কিংবা কারসাজির অভিযোগ উঠছে, তেমনি নতুন একটি গ্রুপ সারের বিতরণ ব্যবস্থার দখল নিতে মরিয়া বলেও দাবি করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুড়িগ্রামের একাধিক গণমাধ্যমকর্মী বলছেন, নতুন করে ডিলার নিয়োগ না হওয়ায় জেলার সার বিতরণ ব্যবস্থা এখনও পুরনো ডিলারদের হাতেই রয়েছে।
ফলে তাদের ওপর ছড়ি ঘোরানোর চেষ্টা করছে নতুন একটি দল। এছাড়া পুরনো অনেক ডিলার বর্তমানে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে একটি বোঝাপড়ার জায়গাও তৈরি করেছেন।
অনেক ক্ষেত্রে, প্রকৃত ডিলারের কাছ থেকে সার নিয়ে খুচরা বাজারে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে সার বিতরণ ব্যবস্থা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে এক ধরনের জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে; যা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন।
কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলছেন, গত বছর যে চাহিদা ছিল তার তুলনায় এবার বেশি সার দেওয়া হলেও কিছু অসাধু ব্যক্তির কারণে পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে।
‘প্রতিটি খুচরা ডিলার যার লাইসেন্স নাই, টাকা জমা দেয়নি বা এবার হবে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য তাদেরকেও আমরা একটু একটু করে সার দিচ্ছি, আরও এক্সট্রা সার আনাচ্ছি। তারপরও এখানে চাহিদা থেকেই যাচ্ছে,’ বলেন তিনি।
এছাড়া নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে পুরনো ডিলারদের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে সেখানেও রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করে কিনা, এমন শঙ্কাও করছেন কেউ কেউ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুড়িগ্রাম অঞ্চলের একজন সার ডিলার দাবি করেন, প্রভাবশালী একটি মহল সার বিতরণ ব্যবস্থা প্রভাবিত করছে।
‘সার গুদামে আসার পর নির্দিষ্ট সংখ্যক বস্তা তাদেরকে দিতে হচ্ছে, তারা নিয়ে বেশি দামে বিক্রি করছে। না দিয়ে উপায় নেই। কিন্তু সরকারি হিসেবে অনিয়ম করছি আমি,’ বলেন তিনি।
আরও যেসব কারণ
ডিলার নিয়োগ নিয়ে জটিলতা কিংবা রাজনৈতিক আধিপত্য ছাড়াও বেশ কয়েকটি কারণ সার সংকটের পেছনে ভূমিকা রাখছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন রাজশাহী জেলার সচিব মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতি মাসে জেলাভিত্তিক সার বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে অনেক কৃষকের মধ্যে আসন্ন রবি মৌসুমের জন্য আগাম সার সংগ্রহের প্রবণতা রয়েছে।
এছাড়া কৃষি মন্ত্রণালয় যে হিসেবে সার সরবরাহ করছে সেখানেও গলদ রয়েছে বলে মনে করেন মি. রহমান।
তিনি বলছেন, ‘কেবল রাজশাহী জেলায় প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর জমিতে মৎস্য চাষ হয়, সেখানেও তো কিছু সার যায়, যেটা সরকারের গুণতিতে নাই।’
এছাড়া ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে নির্দেশিত মাত্রার অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করছেন অনেক কৃষক, যার ফলে সারের চাহিদাও বেশি হচ্ছে।
‘সরকারিভাবে নির্দেশনা দেওয়া ফসল ভেদে ২০ থেকে ৩০ কেজি সার দেওয়ার, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ডাবল দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে সার নষ্ট হচ্ছে এবং জমিও নষ্ট হচ্ছে,’ বলেন মি. রহমান।
বর্তমানে আমন মৌসুমের জন্য সারের চাহিদা চলছে। অক্টোবর মাস থেকেই শুরু হবে রবি মৌসুমের সারের চাহিদা।
কৃষি মন্ত্রণালয় সাধারণত নির্দিষ্ট মাসের যে সারের চাহিদা রয়েছে সেটি মাস শুরুর ১৫ দিন আগেই বরাদ্দ দেয়।
অর্থাৎ অক্টোবর মাসে দেশের কোনো জেলায় যে পরিমাণ সারের চাহিদা রয়েছে সেটি সেপ্টেম্বর মাসের ১৫ তারিখের মধ্যেই বরাদ্দ দেওয়া হয়।
আর এই সার চাহিদা অনুযায়ী ডিলারদের কাছে উপ-বরাদ্দ দেন জেলা পর্যায়ে সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির প্রধান অর্থাৎ জেলা প্রশাসক।
যার ভিত্তিতে কোন ডিলার কত সার উত্তোলন করবেন মাস শুরুর আগেই সেটি নির্ধারণ হয়, ডিলারদের কাছে সার পৌঁছে যায়।
এক্ষেত্রে সার বিতরণ ব্যবস্থার তদারকিতে ঘাটতি দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, মাঠ পর্যায়ে সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় যারা দায়িত্বে রয়েছেন তাদেরও উদাসীনতা রয়েছে।
ডিলার পর্যায়ে সার বিতরণ ঠিক মতো হচ্ছে কিনা সেটি দেখভালের দায়িত্ব সাধারণত ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু দেশের একটি ইউনিয়নে সাধারণত তিনজন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা এই দায়িত্ব পালন করেন।
কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইদুর রহমান বলছেন, মজুত আছে কিন্তু বিতরণে সমস্যা, এটি বলে সরকারের পার পাওয়ার সুযোগ নেই।
‘যদি রাস্তা থেকে সার লুট করে কেউ নিয়ে যেত তাহলে না হয় বলা যেত এটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কিন্তু এটা যদি না হয় তাহলে যাদের মাধ্যমে বিতরণটা হয় তারা তো এমন নয় যে, বিরোধীদল! ব্যবস্থাপনার প্রটোকলটাও তো আমাদের জানা,’ বলেন তিনি।
পাশাপাশি গ্যাস সংকটের কারণে কারখানা বন্ধ থাকার বিষয়টিও সার নিয়ে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছে বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, বাংলাদেশে যে সংখ্যক কারখানা রয়েছে, সেগুলো নিয়মিত চালু রাখা গেলে সেখান থেকে উৎপাদিত ইউরিয়া দিয়েই মোট চাহিদা পূরণ সম্ভব।
কিন্তু বর্তমানে গ্যাস সংকটে দেশের বেশিরভাগ সার কারখানা বন্ধ থাকায় ইউরিয়ার মোট চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে অভ্যন্তরীণভাবে।
এছাড়া টিএসপি এবং ডিইপি সারের যে দুটি কারখানা বাংলাদেশে করা হয়েছে। এগুলো কখনই তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
সূত্র: বিবিসি