শাহারুল ইসলাম ফারদিন
প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে পাঠানোর কথা বলে যশোরের বেনাপোল কাস্টমস হাউসের গোডাউনে সংরক্ষিত কোটি টাকার উচ্চ শুল্কের ভারতীয় পণ্য পাচার চেষ্টার ঘটনাটি ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) অভিযান চালিয়ে একটি কাভার্ডভ্যান বোঝাই পণ্য জব্দ করার পর ঘটনার সঙ্গে কাস্টমস কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে এসেছে।
এ ঘটনায় কাস্টমসের দুই সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) ও তিন সিপাহিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সীমান্ত এলাকা থেকে বিভিন্ন সময়ে উদ্ধার করা এবং বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্টে যাত্রীদের কাছ থেকে জব্দ করা ভারতীয় বিভিন্ন পণ্য কাস্টমসের গোডাউনে সংরক্ষিত ছিল। বিধি অনুযায়ী এসব পণ্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছিল।
অভিযোগ উঠেছে, সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি সংঘবদ্ধ চক্র ত্রাণ তহবিলের পণ্যের আড়ালে উচ্চ শুল্কের বাণিজ্যিক মালামাল গোডাউন থেকে বের করে পাচারের চেষ্টা করে।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রোববার দিনগত রাত প্রায় তিনটার দিকে বেনাপোল বাজার এলাকায় অভিযান চালান বেনাপোল বিজিবি কোম্পানির সদস্যরা। ওই সময় একটি কাভার্ডভ্যান (ঢাকা মেট্রো-ট ২৪-৫৬২১) আটক করা হয়। ওই গাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় পণ্য উদ্ধার করা হয়। অভিযানের সময় কাস্টমসের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী (৩৮), কাভার্ডভ্যানের চালক মো. মহসিন আলী (৩৪) এবং হেলপার মো. জাহিদ হাসানকে (২১) আটক করা হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া চালানটিতে উচ্চ শুল্কের ভারতীয় শাড়ি, থ্রিপিস, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কসমেটিকস এবং আমদানিনিষিদ্ধ ভারতীয় ওষুধ ছিল। এসব পণ্যের বাজারমূল্য প্রায় এক কোটি ১৫ লাখ টাকা। তবে, পণ্যের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ ও সিজারমূল্য নির্ধারণে কাজ চলছে।
বিজিবি সূত্র জানায়, জব্দকৃত পণ্যগুলোর তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং কীভাবে সেগুলো কাস্টমসের সংরক্ষিত গোডাউন থেকে বের করা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে এটি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কাজ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যশোর-৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে কাভার্ডভ্যানসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত মালামালের হিসাব ও সিজারমূল্য নির্ধারণের কাজ চলছে। পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
ঘটনার পর বেনাপোলের ব্যবসায়ী মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ইমদাদুল হক লতা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের নাম ব্যবহার করে যদি কেউ পণ্য পাচারের চেষ্টা করেন, তা গুরুতর অপরাধ। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায়, বেনাপোল বন্দরের সুনাম ক্ষুণ্ন হবে এবং বৈধ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান হবি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বেনাপোলে একের পর এক পণ্য চুরি, শুল্ক ফাঁকি, মিথ্যা ঘোষণা ও জালিয়াতির ঘটনা সামনে আসছে। এবার ত্রাণ তহবিলের আড়ালে পণ্য পাচারের অভিযোগ উঠেছে। এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কর্মকাণ্ড বলে মনে হচ্ছে।
সাম্প্রতিককালে বেনাপোল বন্দরে বেশকিছু অনিয়মের ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। সম্প্রতি বন্দরের ৩৭ নম্বর শেড থেকে কাস্টমসের জব্দ করা প্রায় ছয় কোটি টাকা মূল্যের ভারতীয় পণ্য উধাও হওয়ার ঘটনায় মামলা হয়েছে। এছাড়া ৪১ নম্বর শেড থেকে প্রায় ২৫ টন আমদানিকৃত পণ্য নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগেও তদন্ত চলছে। এর আগে ২৬ নম্বর শেড থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের ঘোষণাবহির্ভূত ভারতীয় শাড়ি ও কসমেটিকস জব্দ করা হয়। ফলে, নতুন এই ঘটনা বন্দরের নিরাপত্তা ও তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে আরও বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে দুইজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) এবং তিনজন সিপাহিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বিভাগীয় তদন্ত চলছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।